কক্সবাজারে অনুমোদন ছাড়াই চলছে অধিকাংশ হোটেল রিসোর্ট
  • অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র নেই অধিকাংশের
  • ব্যবসা রমরমা হলেও পরিবেশ-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আগ্রহ কম

দেশের পর্যটন রাজধানী খ্যাত কক্সবাজারে হাজারো হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট ও কটেজের রমরমা ব্যবসা চলে। প্রতি বছর প্রায় কোটি পর্যটকের ভিড় নামে এই শহরে। কিন্তু এসব হোটেল এসব হোটেল-মোটেল-রিসোর্টের মধ্যে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের(কউক) ছাড়পত্র আছে মাত্র ৭০টির। এর মধ্যে আবার মেরিন ড্রাইভ সড়কের ইসিএ (এনভায়রনমেন্টালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া) ভুক্ত এলাকায় গড়ে ওঠা সব হোটেল-রিসোর্টই কউকের অনুমোদন ছাড়া গড়ে উঠেছে। মেরিন ড্রাইভের কয়েক শ’ হোটেল-রিসোর্টের মধ্যে শুধু একটির পরিবেশগত ছাড়পত্র আছে, বাকিদের নেই। এ ছাড়া কক্সবাজার সি-বিচ-কেন্দ্রিক হোটেল-মোটেল জোনের অধিকাংশই পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই নিজেদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে আইনকানুনের তোয়াক্কা না করেই। আবার অগ্নিনিরাপত্তার যথাযথ ব্যবস্থাও নেই এসব হোটেল-রিসোর্টের। সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর অনুমোদন ছাড়াই ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া এসব হোটেল-রিসোর্টে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজারে মাত্র ৭০টি হোটেলের কউকের অনুমোদন থাকলেও সেখানে ব্যবসা করছে হাজারো হোটেল-রিসোর্ট ও কটেজ। এর মধ্যে কক্সবাজার শহরেই রয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ শ’ হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট ও কটেজ। আর মেরিন ড্রাইভ সড়কে অনুমোদনবিহীনভাবেই গড়ে উঠেছে আড়াই শতাধিক হোটেল ও রিসোর্ট। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, হাজারো হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসা চালিয়ে গেলেও অগ্নিনিরাপত্তা সনদ রয়েছে শ’খানেক হোটেল-রিসোর্টের। আর পরিবেশগত ছাড়পত্রের অবস্থা একেবারেই নাজুক, অর্ধশতেরও কম হোটেল-রিসোর্টের রয়েছে এই ছাড়পত্র। এ ক্ষেত্রে সুয়্যারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা এসটিপির শর্ত পূরণেই ব্যর্থ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান।  
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগে আগ্রহ নেই 
পরিবেশ অধিদফতরের তথ্যানুযাযী হোটেল-্িরসোর্টগুলোর ব্যবসা জমজমাট হলেও পরিবেশগত নীতিমালা অনুসরণ বিশেষ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগে আগ্রহী নন অধিকাংশ হোটেল-রিসোর্ট মালিক। সংস্থাটি বলছে, কক্সবাজারে অনেকেই পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেছে, কিন্তু তাদের এসটিপি নেই। ফলে ছাড়পত্রও মেলে না। তবে অন্য একটি সূত্র দাবি করেছে হোটেল-রিসোর্ট মালিকরা মূলত ছাড়পত্রের আবেদনকে একটি অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে মাত্র। বাস্তবে তারা জানে যে এসটিপি ছাড়া ছাড়পত্র মিলবে না, কিন্তু তাতে বিনিয়োগ না করেই আবেদন করে। কক্সবাজারে ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের প্ররিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে বলেও সূত্র জানায়।  
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, বিশেষ করে মেরিন ড্রাইভ রোডে কউকের অনুমোদিত হোটেল-রিসোর্টের সংখ্যা শূন্য। আমাদের আগে যখন পৌরসভার এখতিয়ারে তখন কিছু অনুমোদন থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠান হওয়ার পরে ২০১৩ সালের একটা আরবার ডেভেলপমেন্ট মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী মেরিন ড্রাইভ সড়কে সি-শোর থেকে ৫০০ মিটার পর্যন্ত নো ডেভেলপমেন্ট জোন ডিক্লেয়ার করা আছে। যদিও নতুন মাস্টারপ্ল্যান হচ্ছে, তখন হয়তো আমরা অনুমোদন দিতে পারব। মেরিন ড্রাইভ রোড ছাড়াও কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল জোনেও অননুমোদিত হোটেল আছে জানিয়ে তিনি বলেন, টোটাল কক্সবাজারে কউকের জুরিসডিকশন এলাকায় ৭০টি হোটেল রিসোর্টের অনুমোদন আছে। বাকিগুলো অনুমোদন ছাড়া ব্যবসা করছে। আমরা এরই মধ্যে অনেককে নোটিশ করেছি। আমরা প্রতি মাসে ও প্রতি সপ্তাহে আমাদের পরিদর্শন টিম নোটিশ দিয়ে থাকেন। নোটিশের তিনটি পর্যায় আছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রথমবার তাদের বৈধ অনুমোদন আছে কি না ড্রইং শো করার জন্য, তা করতে না পারলে দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয় এবং সর্বশেষ কারণ দশানোর জবাবে সন্তুষ্ট না হলে চুড়ান্তভাবে স্থাপনা অপসারণের নোটিশ দেয়া হয়। অপসারণ করতে ব্যর্থ হলে আমরা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অপসারণ প্রক্রিয়া শুরু করি। ইতোমধ্যে দু’টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে এবং একটা ভবন অপসারণ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। এ ছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে জারিমানা করা হয়েছে। প্রায় ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে নির্মাণে বিধিনিষেধ থাকায় কউক অনুমোদন দিতে পারছে না। কিন্তু স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। অবৈধভাবে নির্মিত দেড় শতাধিক স্থাপনাকে নোটিশ দেয়া হয়েছে। আরো স্থাপনা সরেজমিন দেখে তালিকা করা হবে। পাটুয়ার টেকের রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কউকের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়াও মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে সব হোটেল-রিসোর্ট পরির্দশন করে তাদের অবৈধভাবে পরিচালিত ব্যবসা বন্ধের জন্য বলা হয়েছে কউকের পক্ষ থেকে; নইলে অভিযান চালিয়ে স্থাপনা অপসারণ করার কথাও তাদের জানানো হয়েছে। গতকাল সোমবারও কউকের ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এমন ঘোষণা দেয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।  
পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক মোহাম্মদ জমির উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা ছাড়পত্র নেয়ার জন্য নোটিশ করি, না নিলে এনফোর্সমেন্ট মামলা করি বা আদালতে মামলা করি। আবার অনেকে ছাড়পত্রের আবেদন করলেও আমরা দিতে পারি না কারণ এসটিপি (সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) লাগে। অনেকে আবেদন করেছে, কিন্তু এসটিপি না থাকায় আমরা ছাড়পত্র দেইনি। তিনি জানান, পৌরসভা একটা সেন্ট্রাল এসটিপি করেছে, অনেককে পৌরসভার সেন্ট্রাল এসটিপির সাথে চুক্তিবদ্ধ হলে ছাড়পত্র দেয়ার কথা জানানো হয়েছে। এর বাইরে মেরিন ড্রাইভ সড়কে ইসিএ এলাকা হওয়ায় অনেকে আবেদন করলেও আমরা ছাড়পত্র দেইনি। আইনগতভাবে সেখানে ছাড়পত্র দেয়ার সুযোগ নাই। একমাত্র সি পার্ল বিচ রিসোর্টের ছাড়পত্র আছে জানিয়ে তিনি বলেন, মেরিন ড্রাইভ সড়কে আর কারো ছাড়পত্র নেই। আমরা মামলা, এনফোর্সমেন্ট, জরিমানা আদায় ইত্যাদি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু তবু কাজ হচ্ছে না। তিনি জানান, গত এক বছরে ৫৫টি হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁকে মোট এক কোটি ২৭ লাখ ৩৪ হাজার ১৫৮ টাকা পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে। ২৮টি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।  
প্রসঙ্গত, গত শনিবার সকালে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন পাটুয়ার টেক এলাকার ‘টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’- রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের করুণ মৃত্যুর পর কক্সবাজারের হোটেল-রিসোর্টে পর্যটকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশাসনের টনক নড়েছে। কউক, পরিবেশ অধিদফতর, জেলা প্রশাসন ও ফায়ার ব্রিগেডের তৎপরতা বেড়েছে।

Advertisement