ছুটির আগে পুঁজিবাজারে আলোর ঝলকানি

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সূচকের ধারাবাহিক পতনের পর লেনদেন খরায় ধুঁকতে থাকা পুঁজিবাজারে ফের আলোর ঝলকানি দেখা গেল গতকাল। দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সূচকের উন্নতির পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে লেনদেনও। বরাবরই বড় কোনো সরকারি ছুটির আগে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে গেলেও গতকাল উল্টো আচরণ করেছে বাজারগুলো। সাম্প্রতিক সময়ের বাজার আচরণ দেখে বিনিয়োগকারীরা যখন হাল ছেড়ে দিতে বসেছিল ঠিক সেই মুহুর্তে পূজার ছুটির আগের দিন ঘুরে দাঁড়াল পুঁজিবাজার। দিনের বাজার আচরণ দেখে বাজার সংশ্লিষ্টরা বললেন, পুঁজিবাজার এমন একটি জায়গা যেখানে আগে থেকে কিছু বলা যায়না।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ২৭ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। ৫ হাজার ৪২২ দশমিক ৬৭ পয়েন্ট থেকে সোমবার সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি ওইদিন লেনদেনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৪৫০ দশমিক ৬২ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিসইে শরিয়াহ’র উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১৭ দশমিক ৬২ ও ১ দশমিক ৭৪ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক গতকাল ৭৪ দশমিক ৮৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৫৭ দশমিক ৪৯ ও ৪৫ দশমিক ৭১ পয়েন্ট। 
সপ্তাহের প্রথম দুই কর্মদিবসে দুই পুঁজিবাজারের লেনদেনের পরিমাণ যেখানে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি করে প্রচণ্ড হতাশা, সেখানে গতকাল বাজারগুলোর নিষ্পত্তি হওয়া লেনদেন তাদের নতুন করে আশাবাদী করে তোলে। দুই বাজারেই সূচকের সাবলিল উন্নতির ফলে বৃদ্ধি পায় বাজারগুলোর লেনদেনও। গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজার ৫০২ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে। এর আগে দু’টি কর্মদিবস শনিবার ও রবিবার ডিএসইর লেনদেন ছিল যথাক্রমে ৩১৭ কোটি ও ৩৬৫ কোটি টাকা। একইভাবে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেন গতকাল পৌঁছে যায় ২১ কোটি টাকায়। আগের দু’দিন সিএসইর লেনদেন ছিল যথাক্রমে সাত ও আট কোটি টাকা। 
এ দিকে পুঁজিবাজারের হঠাৎ করে ঘুরে দাড়ানোর পেছনে বড় ভূমিকাটি ছিল ব্যাংকিং খাতের। বেশ কিছুদিন অনেকটা স্থবিরতার মধ্য দিয়ে পার করা খাতটি গতকাল দাপট দেখাল। এ খাতের বেশ কয়েকটি ভালো কোম্পানি গতকাল দুই বাজারের লেনদেনে ব্যাপকভাবে এগিয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশে খাতটির কোনো কোম্পানিকে খুব একটা দেখা না গেলেও গতকাল কমপক্ষে তিনটি কোম্পানি উঠে আসে এ তালিকায়। লেনদেনের পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর শেয়ারের মূল্যস্তরেরও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে। ফলে দিনের সূচকেও এর ভালো প্রভাব ছিল। 
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে চলতে থাকা নানা অব্যবস্থার মধ্যেও বেশ কয়েকটি ব্যাংক ভালো পারফর্ম করে চলেছে। কিন্তু বাজারের নেতিবাচক আচরণের কারণে মূল্যস্তর এখনো অনেক কম। তাই ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এ খাতে বিনিয়োগ সম্ভাবনা দেখছেন। হঠাৎ করে ব্যাংকের প্রতি তাই তাদের আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তাছাড়া বর্তমানে শিল্প ও সেবা খাতকে বেশকিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হলেও ব্যাংকিং খাতে এ ধরনের কোনো সমস্যা নেই। ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলোর বেশির ভাগ তাদের তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক বিবরণী প্রকাশের জন্য পর্ষদ সভার তারিখ ঘোষণা করেছে। এর আগে প্রকাশ করা দ্বিতীয় প্রান্তিকে ভালো ব্যাংকগুলোর বেশির ভাগই পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ভালো মুনাফা করেছে। ফলে সামনে প্রকাশিতব্য তৃতীয় প্রান্তিকেও তাদের পারফর্মেন্স আরো ভালো করার কথা। তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক বিবরণী প্রকাশকে সামনে রেখেই এ খাতে বিনিয়োগ বাড়তে পারে, এমনটিই মনে করছেন তারা। 
ডিএসইতে গতকাল লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল ব্যাংকিং খাতের প্রাইম ব্যাংক। ২৭ কোটি ৯০ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৯৭ লাখ ৫০ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২৩ কোটি ১০ লাখ টাকায় ৩৪ লাখ ১৮ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল ব্র্যাক ব্যাংক। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস, সিটি ব্যাংক, সায়হাম টেক্সটাইলস, সোনালি আঁশ, মতিন স্পিনিং, আইপিডিসি ফিন্যান্স, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ ও শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ। 
ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে গতকাল মিউচুয়াল ফান্ডের সুষ্পষ্ট প্রাধান্য ছিল। মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ সিকিউরিটিজের পাঁচটিই ছিল মিউচুয়াল ফান্ড। এদের মধ্যে ৮ দশমিক ৮৬ শথাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে দিনের শীর্ষে উঠে আসে আইসিবি সোনালী ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড। ৭ দশমিক ৪০ শতাংশ দর বৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে ছিল এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ ১০ সিকিউরিটিজের অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আইসিবি এমপ্লয়িজ মিউচুয়াল ফান্ড, কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজ, পুরবি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, কে অ্যান্ড কিউ, মতিন স্পিনিং, চার্টার্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স, প্রাইম আইসিবি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। 
ডিএসইতে দিনের দরপতনের শীর্ষে ছিল টেক্সটাইলস খাতের কোম্পানি শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ। এদিন কোম্পানিটি ১১ দশমিক ৮১ শতাংশ দর হারায়। গতকাল কোম্পানিটি বিগত অর্থবছরের জন্য কোনো লভ্যাংশ না দেয়ার ঘোষণা দেয়। ফলশ্রুতিতে কোম্পানিটিকে বিদ্যমান ‘বি’ গ্রুপ থেকে ‘জেড’ গ্রুপে স্থানান্তরিত করা হয় যা আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে কার্যকর হবে। ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় ছিল প্রিমিয়ার লিজিং। দরপতনে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এমএল ডাইং, ফ্যামিলিটেক্স, সোনালি আঁশ, ফার ইস্ট নিটিং, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন্স, তুং হাই টেক্সটাইলস, দেশ গার্মেন্টস ও আমান ফিডস।
আইপিও ছাড়াই পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তির  
সুযোগ, প্রজ্ঞাপন জারি
প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও ছাড়াই দেশের পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ সম্প্রসারণ করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এতদিন এ পদ্ধতিতে কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তির সুযোগ থাকলেও নতুন বিধানের আওতায় আরো কয়েক ধরনের কোম্পানি এ সুযোগ পাবে।
এ বিষয়ে রোববার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবে-

Advertisement
  • সম্পূর্ণ সরকারি মালিকানাধীন অথবা সরকারের অন্তত ৫১ শতাংশ মালিকানাধীন কোম্পানি;
  •  যেসব কোম্পানিতে সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মালিকানা রয়েছে এবং পরিশোধিত মূলধনে সরকারের অংশ অন্তত ১০ শতাংশ;
  •  সম্পূর্ণ বিদেশী মালিকানাধীন অথবা বিদেশীদের অন্তত ৫১ শতাংশ মালিকানাধীন কোম্পানি;
  •  সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী অন্তত ৫০০ কোটি টাকা নিট সম্পদমূল্যের তফসিলি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানি;
  •  বছরে অন্তত এক হাজার কোটি টাকা টার্নওভার রয়েছে- এমন কোম্পানি;
  •  কমিশনে নিবন্ধিত স্টক এক্সচেঞ্জ, ডিপোজিটরি এবং ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট কোম্পানি এবং
     কমিশন কর্তৃক যোগ্য হিসেবে ঘোষিত কোম্পানি।


আগে কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির সুযোগ ছিল
২০০৬ সালে সরাসরি তালিকাভুক্তির পদ্ধতি চালুর পর এ প্রক্রিয়ায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত ও পাঁচটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ডেসকো, পাওয়ার গ্রিড, যমুনা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও তিতাস গ্যাস। অন্য দিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- শাইনপুকুর সিরামিকস, এসিআই ফর্মুলেশনস, নাভানা সিএনজি, ওশান কনটেইনারস ও খুলনা পাওয়ার কোম্পানি।
তবে ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেয়, সরাসরি তালিকাভুক্তির এ পদ্ধতিতে কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোই শেয়ার ছাড়তে পারবে।
ওই সিদ্ধান্তের আগে আবেদন করায় ওশান কনটেইনারস ও খুলনা পাওয়ার কোম্পানি ২০১০ সালে সরাসরি তালিকাভুক্তির অনুমোদন পায়।
এর পর থেকে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ কার্যত রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেই পরিধি আবার সম্প্রসারিত হলো।