জুলিয়ান মুরের প্রশংসায় জেসি আইজেনবার্গের ‘দ্য ডেবিউ’
জুলিয়ান মুরের প্রশংসায় জেসি আইজেনবার্গের ‘দ্য ডেবিউ’।

সাকিবুল হাসান
জেসি আইজেনবার্গ পরিচালিত মিউজিক্যাল কমেডি চলচ্চিত্র ‘দ্য ডেবিউ’ দিয়ে পর্দা নেমেছে ৭০তম বিএফআই লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবের। ১৮ অক্টোবর রাতে লন্ডনের রয়্যাল ফেস্টিভ্যাল হলে ছবিটির সমাপনী প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন পরিচালক জেসি আইজেনবার্গ ও অভিনেত্রী জুলিয়ান মুর। এ সময় দুজনই একে অপরের কাজের প্রশংসা করেন। ছবিটির চিত্রনাট্যকে নিজের জীবনে পড়া অন্যতম সেরা বলে অভিহিত করেছেন মুর।
মঞ্চে উঠে জেসি আইজেনবার্গ বলেন, ‘এই ছবিতে অভিনয় করেছেন আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ জুলিয়ান মুর। তবে মজার বিষয় হলো- অদ্ভুতভাবে এটি আমার নিজের জীবনের গল্পও।’
আইজেনবার্গের লেখা ও পরিচালনায় নির্মিত ‘দ্য ডেবিউ’ ছবিতে মোনা ফ্রিডম্যান নামের এক লাজুক গৃহবধূর চরিত্রে অভিনয় করেছেন জুলিয়ান মুর। নিউ জার্সিতে বসবাসকারী মোনা স্থানীয় একটি থিয়েটারে ‘নোসি নেইবার্স’ নামের কাল্পনিক মিউজিক্যালের জন্য অডিশন দিতে যান। সেখানে নির্বাচিত হয়ে তিনি মিস ড্যানিয়েল নামের একটি পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। কিন্তু ধীরে ধীরে চরিত্রটির প্রতি তার আসক্তি বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে নাটকটির পরিচালক জেরি ব্ল্যাঙ্কেনবুহলারের (পল জিয়ামাট্টি) প্রভাবেও তিনি আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এতে মোনার ব্যক্তিগত জীবনে দেখা দেয় নানা জটিলতা। ছবিটির গল্পের সাথে নিজের জীবনের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আইজেনবার্গ জানান, মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি কমিউনিটি থিয়েটারে অভিনয় শুরু করেন। শৈশবে সেই অভিজ্ঞতা তার কাছে সুখকর ছিল না। তবে সময়ের সাথে থিয়েটার তার জীবন বদলে দেয়।
আইজেনবার্গ বলেন, ‘আমি জীবনের সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পুরো বিষয়টি কল্পনা করতে গিয়ে বারবার শুধু জুলিয়ানকেই দেখতে পাচ্ছিলাম। এমনকি চিত্রনাট্য লেখার সময়ও তিনিই আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন।’
জুলিয়ান মুরের অভিনয় নিয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করে তিনি আরো বলেন, ‘দুই বছর ধরে তার অভিনয় দেখা এবং সেই ফুটেজ সম্পাদনা করা আমার জন্য সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।’ পরিচালকের প্রশংসার জবাবে জুলিয়ান মুরও ছবিটি নিয়ে নিজের মুগ্ধতার কথা তুলে ধরেন। কালো রঙের মার্জিত পোশাকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত এই অভিনেত্রী ‘দ্য ডেবিউ’কে নিজের জন্য ‘অসাধারণ উপহার’ বলে বর্ণনা করেন।
চিত্রনাট্যটি হাতে পাওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে মুর বলেন, ‘এটি পাওয়া আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের। আর প্রতিদিন সেটে গিয়ে এত অসাধারণ একটি চরিত্রে এমন প্রতিভাবান অভিনেতাদের সাথে কাজ করার সুযোগ পাওয়া ছিল দারুণ আনন্দের।’
আইজেনবার্গের লেখালেখি ও পরিচালনার প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘তিনি অসাধারণ একজন লেখক, আদর্শস্থানীয় পরিচালক এবং নিঃসন্দেহে দারুণ প্রতিভাবান।’
চিত্রনাট্য সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন জানাতে গিয়ে মুর আরো বলেন, ‘এটি আমার পুরো জীবনে পড়া অন্যতম সেরা চিত্রনাট্য।’
মুরের এমন প্রশংসার জবাবে রসিকতা করে আইজেনবার্গ বলেন, ‘আমি শুধু একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই- আমাকে সুন্দর বলা হয় একমাত্র তখনই, যখন সেটি আমার লেখালেখি সম্পর্কে বলা হয়।’
যুক্তরাজ্যে ছবিটির প্রিমিয়ারকে স্মরণীয় করে তুলতে আয়োজকরা বিশেষ ব্যবস্থাও করেন। রয়্যাল ফেস্টিভ্যাল হলে দর্শকদের আসনে রাখা হয়েছিল কাল্পনিক মিউজিক্যাল ‘নোসি নেইবার্স’-এর আদলে তৈরি প্লেবিল বা নাট্যপ্রযোজনার অনুষ্ঠানপত্র। প্রদর্শনী চলাকালে দর্শকদের হাসি ও করতালিতে প্রেক্ষাগৃহ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে জুলিয়ান মুরের কিছু নাটকীয় ও কৌতুকনির্ভর অভিনয়ের দৃশ্যে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ছিল উল্লেখযোগ্য।
ছবির অন্যতম অভিনেতা পল জিয়ামাট্টি অসুস্থতার কারণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি। আইজেনবার্গ জানান, জিয়ামাট্টি কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন। তার অনুপস্থিতিতে আক্ষেপ প্রকাশ করে পরিচালক বলেন, ‘তিনি এখানে থাকতে পারলে খুব ভালো লাগত। তিনি অসাধারণ একজন মানুষ, আর তার কথা শুনলে আপনাদেরও ভালো লাগত।’
নিজের অভিনয় জীবনে জিয়ামাট্টি ও মুরের প্রভাবের কথা তুলে ধরে আইজেনবার্গ জানান, ছোটবেলা থেকেই জিয়ামাট্টি তার প্রিয় অভিনেতাদের একজন এবং মুর তার প্রিয় অভিনেত্রী। শৈশবের দুই প্রিয় অভিনয় শিল্পীর সাথে একই ছবিতে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে তিনি জীবনের অন্যতম রোমাঞ্চকর ঘটনা বলে উল্লেøখ করেন। তবে সেই অভিজ্ঞতা তাকে কিছুটা অপ্রস্তুতও করে দিয়েছিল।
রসিকতার ছলে আইজেনবার্গ বলেন, ‘আমি তাদের অভিনয়ে এতটাই মুগ্ধ হয়ে থাকতাম যে, পরে যখন তারা বললেন, ‘এই নাও, এবার বলটা তুমি খেলে’, তখন আমি বুঝতেই পারছিলাম না, এই জিনিসটা দিয়ে কী করতে হয়!’
তিনি আরো বলেন, ‘অভিজ্ঞতাটা এতটাই মনোযোগ-বিক্ষিপ্ত করার মতো ছিল যে আশা করি, তাদের সাথে আর কখনো অভিনয় করতে হবে না। তখন আমি নিজের সবচেয়ে খারাপ রূপে ছিলাম।’
জুলিয়ান মুর ও পল জিয়ামাট্টির পাশাপাশি ‘দ্য ডেবিউ’ ছবিতে অভিনয় করেছেন জেসি আইজেনবার্গ, হ্যালি বেইলি, কল্টন রায়ান ও বনি মিলিগান। এ ছাড়া ছবিটিতে রয়েছেন বার্নাডেট পিটার্স, লিলি কুপার, মৌলিক পাঞ্চোলি ও হাভানা রোজ লিউ।
লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনীর আগেই গত মাসে টেলুরাইড চলচ্চিত্র উৎসবে ‘দ্য ডেবিউ’-এর প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ছবিটি ইতিবাচক সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়া পায়। বিশেষ করে জুলিয়ান মুরের অভিনয়কে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য অস্কার মনোনয়ন নিয়েও আলোচনা শুরু হয়।
চলচ্চিত্রবিষয়ক সাময়িকী ‘ভ্যারাইটি’র প্রধান চলচ্চিত্র সমালোচক ওয়েন গ্লাইবারম্যান তার পর্যালোচনায় ছবিটিকে ছোট শহরের থিয়েটারকে ঘিরে নির্মিত এমন এক কমেডি হিসেবে বর্ণনা করেন, যার অন্তর্নিহিত ভাবনা গভীর এবং উপস্থাপনা একই সাথে হাস্যরসাত্মক ও মানসিকভাবে আকর্ষণীয়। তার ভাষ্যে- ছবিটি যেন ‘ওয়েটিং ফর গাফম্যান’ চলচ্চিত্রটি কোয়েন ভ্রাতৃদ্বয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও উন্মত্ত নির্মাণশৈলীতে তৈরি করা হয়েছে। এ২৪ পরিবেশিত ‘দ্য ডেবিউ’ আগামী ১১ ডিসেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে। লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবের সমাপনী প্রদর্শনীতে দর্শকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং জুলিয়ান মুরের অভিনয় ঘিরে বাড়তে থাকা আলোচনা ছবিটির মুক্তির আগে প্রত্যাশা আরো বাড়িয়েছে।

Advertisement