
মিডলইস্ট মনিটর
গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধে প্রায় ৬০ হাজার শিশু তাদের মা-বাবা কিংবা যেকোনো একজনকে হারিয়েছে। জাতিসঙ্ঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ‘জাতিসঙ্ঘ আন্তর্জাতিক জরুরি শিশু তহবিল’ (ইউনিসেফ) এই তথ্য জানিয়ে শিশুদের মারাত্মক মানসিক ও মানবিক সঙ্কটের বিষয়ে সতর্ক করেছে।
জেনেভার প্যালেস দেশ নেশনসে এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার যোগাযোগ কর্মকর্তা ও উপ-মুখপাত্র রিকার্ডো পিরেস এসব তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, গাজায় এখনো প্রায় আট লাখ শিশু বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে। এদের বেশিরভাগই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁবুতে কিংবা ভাঙাচোরা ঘরবাড়িতে জিন্দেগি কাটাচ্ছে। যুদ্ধের ভয়াবহ ট্রমা বা মানসিক আঘাত থেকে উত্তরণের জন্য এই বাস্তুচ্যুত শিশুদের প্রায় সবারই মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন। পিরেস আরো জানান, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকেও গাজায় ৩৪০ জনের বেশি শিশু নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো শত শত শিশু। শীতে বাস্তুচ্যুত এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত ভিড়, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও জীবনযাত্রার মান অবনতির কারণে শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে।
তবে এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় মানবিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক সরবরাহ বেড়েছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তায় খানিকটা উন্নতি হয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষায় ফেরানোর কাজও শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে পাঁচ লাখ ৬০ হাজারের বেশি শিশু লেখাপড়ায় ফিরেছে। এর মধ্যে ইউনিসেফ পরিচালিত ২০০টিরও বেশি কেন্দ্রও রয়েছে। অন্যদিকে গাজার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। বর্তমানে সেখানে ছয়টি বর্জ্য শোধনাগারই অচল। ফলে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি সাগরে গিয়ে পড়ছে। এই অপরিশোধিত বর্জ্য পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি তৈরি করছে। ইউনিসেফ জোর দিয়ে বলেছে, ত্রাণ ও শিক্ষা কার্যক্রম কিছুটা এগোলেও অব্যাহত বাস্তুচ্যুতি, অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি আর আসন্ন শীত গাজার শিশুদের মানবিক সঙ্কটকে আরো গভীর করে তুলছে।
তহবিল সঙ্কটে খাদ্যসহায়তা এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস
এদিকে আনাদোলু জানায়, আসন্ন শীতের মুখে গাজায় বেঁচে থাকার লড়াই আরো কঠিন হয়ে উঠছে। তীব্র অর্থসঙ্কটে পড়ে গাজা উপত্যকায় নিজেদের খাদ্যসহায়তা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। ফলে শীত শুরুর আগেই প্রায় পাঁচ লাখ ফিলিস্তিনি জরুরি খাদ্যসহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন। গতকাল সোমবারে দেয়া এক বিবৃতিতে সংস্থাটি এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়। ডব্লিউএফপি গত মাসেও গাজার ১৬ লাখ অসহায় মানুষকে সহায়তা দিয়েছিল। তবে চলতি মাসে সহায়তা পাওয়া মানুষের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখে। একইসাথে খাদ্যসামগ্রীর বরাদ্দও অর্ধেক করা হয়েছে। খাদ্যসহায়তা পাওয়া পরিবারগুলো এখন দু’টি পার্সেলের জায়গায় পাবে একটি। সাথে মিলবে ছোট আকারের একটি গমের আটার বস্তা।
রান্না করা খাবার ও নগদ সহায়তায় টান
ডব্লিউএফপির সরবরাহ করা দৈনিক গরম খাবারের সংখ্যা আড়াই লাখ থেকে কমে এখন দেড় লাখে নেমে এসেছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা ঝুঁকিপূর্ণ সীমানা এলাকার কাছাকাছি থাকা পরিবারগুলো আগে প্রতিদিন রান্না করা খাবার পেত। এখন তাদের একদিন পর পর খাবার দেয়া হবে। এ ছাড়া ৭৫ হাজার পরিবারের জন্য বরাদ্দ নগদ সহায়তার পরিমাণও কমিয়ে দিয়েছে সংস্থাটি।
দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে লাখ লাখ মানুষ
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, গাজার মোট জনসংখ্যার ৬৭ শতাংশ বা প্রায় ১৪ লাখ মানুষ বর্তমানে মারাত্মক খাদ্যসঙ্কটে ভুগছেন। এদের মধ্যে প্রায় দুই লাখ মানুষের অবস্থা চরম সঙ্কটজনক। অনাহার থেকে প্রাণ বাঁচাতে তাদের অবিলম্বে খাদ্যসহায়তা প্রয়োজন। গাজায় শিশুদের পুষ্টিচিত্রও বেশ করুণ। প্রতি পাঁচজনে মাত্র একজন শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পায়। এলাকাটিতে বেকারত্বের হার ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে কিনে খাওয়া একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ডব্লিউএফপি সতর্ক করে বলেছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির পর খাদ্য পরিস্থিতিতে যে ‘সামান্য’ উন্নতি হয়েছিল, তা এখনো বেশ ভঙ্গুর। সাহায্য আরো কমলে পরিস্থিতি দ্রুত আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। একই অর্থসঙ্কটের কারণে দখলকৃত পশ্চিম তীরেও সাহায্যপ্রার্থীর সংখ্যা চার লাখ থেকে কমিয়ে দুই লাখে নামিয়ে আনা হয়েছে। গাজা ও পশ্চিম তীরে আগামী ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত কার্যক্রম চালু রাখতে জরুরি ভিত্তিতে ৪৫ কোটি ডলার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ডব্লিউএফপি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








