
দেশের কোথাও না কোথাও প্রতিদিনই জ্বলছে আগুন। কখনো কারখানায়, কখনো বস্তিতে, কখনো বাণিজ্যিক ভবন কিংবা রাসায়নিকের গুদামে। একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি, কোটি কোটি টাকার সম্পদহানি এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা- সব মিলিয়ে সারা দেশে সৃষ্টি হয়েছে আগুনের আতঙ্ক। অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে নানা উদ্যোগ ও প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, দাহ্য পদার্থের অনিরাপদ মজুদ এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব পরিস্থিতিকে আরো উদ্বেগজনক করে তুলছে।
ফায়ার সার্ভিসের হিসাবে, ২০২৫ সালে সারা দেশে গড়ে প্রতিদিন ৭৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৮৫ জন, আহত ২৬৭ জন। এর আগের বছর, ২০২৪ সালে, মোট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ছিল ২৬ হাজার ৬৫৯টি। এসব ঘটনায় প্রাণ হারান ১৪০ জন। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৪৬ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২৭ হাজার ৬২৪টি, নিহত হন ১০২ জন।
অর্থাৎ, অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে না। প্রাণহানি ও সম্পদহানির পাশাপাশি এসব ঘটনা শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জননিরাপত্তার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ১৯ হাজার ৮৪৬টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৪৫৩ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি।
অধিদফতরের তথ্য বলছে, অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বাড়ে। এ সময় আবহাওয়া শুষ্ক থাকে। তীব্র গরমে সামান্য স্ফুলিঙ্গ থেকেও আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। শীতকালে হিটারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও সৃষ্টি হয়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আবু নাইম মো: শহিদউল্লাহ বলেন, দেশের উন্নয়নের সাথে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বাড়ছে। প্রতি বছর বিদ্যুৎ ও রাসায়নিকের ব্যবহার বাড়ছে। এর সাথে দাহ্য পদার্থের মজুদ ও ব্যবহারও বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। ভবনগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা পর্যাপ্তভাবে বাড়ানো হয়নি।
তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে হলে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এর একটি দিক হলো ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা, অন্যটি হলো ফার্স্ট রেসপন্ডার বা প্রাথমিকভাবে সাড়া দেয়ার সক্ষমতা। একই সাথে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী করতে হবে।
তার ভাষায়, কোথাও আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগতে পারে। এই সময়টুকুই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়লে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেড়ে যায়। তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও ভবন ব্যবহারকারীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ব্যবহার করে আগুনের প্রাথমিক পর্যায়েই তা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতে পারেন।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: মাহমুদুল হাসান বলেন, আইন ও বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবনে যেসব অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা উচিত, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো নিশ্চিত করা হয় না। কাগজে-কলমে অনেক ব্যবস্থা দেখানো হলেও বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি থেকে যায়।
আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিস দেরিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়- এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আগুনের খবর পাওয়ার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে স্টেশন থেকে বের হওয়া তাদের স্বাভাবিক কার্যপদ্ধতি। এ নিয়ম যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করা হয় এবং স্টেশনেও এর রেকর্ড থাকে।
ধ্বংস হচ্ছে ওষুধ ও গার্মেন্টশিল্প
দেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাত তৈরী পোশাকশিল্প এবং দ্রুত বিকাশমান ওষুধশিল্প এখন অগ্নিঝুঁকির বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। দাহ্য সুতা, কাপড়, প্যাকেজিংসামগ্রী, রাসায়নিক ও সলভেন্টের উপস্থিতি এসব কারখানায় সামান্য আগুনকেও ভয়াবহ বিপর্যয়ে রূপ দিতে পারে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে রাজধানীর মিরপুরে একটি গার্মেন্ট কারখানা ও রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকাণ্ডে বহু প্রাণহানির ঘটনা এই ঝুঁকির সাম্প্রতিক উদাহরণ। একটি কারখানায় আগুন লাগার অর্থ শুধু ভবন বা যন্ত্রপাতি পুড়ে যাওয়া নয়; এর সাথে জড়িয়ে থাকে শত শত শ্রমিকের জীবিকা, বিদেশী ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের সময়সীমা এবং দেশের শিল্প খাতের ভাবমর্যাদা।
ওষুধশিল্পের ক্ষেত্রে সঙ্কট আরো বহুমাত্রিক। কারখানায় কাঁচামাল, প্রস্তুত ওষুধ, রাসায়নিক ও প্যাকেজিংসামগ্রী মজুত থাকে। অগ্নিকাণ্ডে এসব পুড়ে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, বাজারে সরবরাহে বিঘœ ঘটে এবং আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট উদ্বেগও সৃষ্টি হতে পারে।
চলতি বছরের অক্টোবরে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের সফিপুরে ইবনে সিনা ওষুধ কারখানার ছয়তলা ভবনের নিচতলার হারবাল সেকশন ও স্টোরেজ এলাকায় আগুন লাগে। সেখানে বিপুল পরিমাণ ওষুধ, রাসায়নিক ও প্লাস্টিকসামগ্রী মজুদ ছিল। ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি ইউনিটের প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন লাগার পর শ্রমিকেরা দ্রুত বেরিয়ে আসায় বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়।
এর আগে গত ১৪ অক্টোবর বুধবার সকালে গাজীপুরের টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায় ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ওষুধ কারখানায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ২০টির বেশি ইউনিট, সেনাবাহিনী ও বিজিবির সদস্যদের সম্মিলিত চেষ্টায় পৌনে চার ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামে তৈরি কারখানাটির ভবনে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে যায়, অসুস্থ হয়ে পড়েন কয়েকজন ফায়ার সার্ভিসকর্মী। পরদিন কারখানার ফটকে নোটিশ টানিয়ে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
এসব ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, শিল্পকারখানায় শুধু অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম স্থাপন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। দাহ্য পদার্থের নিরাপদ সংরক্ষণ, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার নিয়মিত পরীক্ষা, জরুরি বহির্গমনপথ সচল রাখা এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই সর্বনাশ
আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেক ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সড়কে যানজট, সরু ও দখল হয়ে যাওয়া রাস্তা, পানির উৎসের অভাব এবং দূরবর্তী ফায়ার স্টেশন- এসব কারণে উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
চলতি অক্টোবরে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটোয়ারটেক সৈকতে কাঠের তৈরি তিনতলা টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটক নিহত হন। এ ঘটনায় দগ্ধ হন আরো ছয়জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন ছিলেন।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, লাশ পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে নমুনা পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটিতে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, অগ্নিসঙ্কেতব্যবস্থা কিংবা হোস পাইপ ছিল না। ঘটনার পর রিসোর্টের লোকজন সরে যান বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এ ঘটনায় রিসোর্টের মালিক তানভীর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। হোটেলটির ব্যবস্থাপককে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
এ ঘটনা শুধু একটি রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি নয়; পর্যটনকেন্দ্রে পরিচালিত আবাসিক স্থাপনাগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা তদারকির দুর্বলতাও সামনে এনেছে। কাঠের তৈরি স্থাপনা, দাহ্য নির্মাণসামগ্রী, অগ্নিসঙ্কেতব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং নিরাপদে বের হওয়ার পথ না থাকলে ছোট আগুনও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
এর আরেকটি উদাহরণ চট্টগ্রামের চকবাজারে একটি ভবনে অগ্নিকাণ্ড। ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা টানা ৩৭ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন সম্পূর্ণ নেভাতে সক্ষম হন। ততক্ষণে আগুনে পুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ভবনটিতে প্রসাধনসামগ্রী বা প্রশাসনিক কার্যক্রমসংশ্লিষ্ট স্থাপনা ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, টঙ্গীতে ওষুধ কারখানায় আগুন লাগার পরও তা নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগেছে। অর্থাৎ, অগ্নিকা-ের ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে আগুন লাগার কারণের পাশাপাশি ভবনের ধরন, ভেতরে থাকা দাহ্য পদার্থ, প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা এবং উদ্ধারকাজের বাস্তব পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।
গড়ে উঠছে অনুমোদনহীন কারখানা
আবাসিক ভবনে কারখানা, ভাড়া বাড়িতে গুদাম, নকশাবহির্ভূত অতিরিক্ত তলা, তালাবদ্ধ জরুরি সিঁড়ি এবং প্রশিক্ষণহীন কর্মী- এসব চিত্র দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের ফায়ার লাইসেন্স নেই, আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অগ্নিকাণ্ডের প্রায় ৩৪ শতাংশের কারণ ছিল বৈদ্যুতিক গোলযোগ। এরপর ছিল বিড়ি-সিগারেটের টুকরা, যা থেকে ১৫ দশমিক ৫২ শতাংশ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এ ছাড়া চুলা ও গ্যাসলাইনের ত্রুটিও আগুন লাগার উল্লেখযোগ্য কারণ।
এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট, অগ্নিকাণ্ডের একটি বড় অংশ প্রতিরোধযোগ্য। বৈদ্যুতিক সংযোগের নিয়মিত পরীক্ষা, ত্রুটিপূর্ণ তার ও সরঞ্জাম পরিবর্তন, গ্যাসলাইনের রক্ষণাবেক্ষণ, ধূমপানের ক্ষেত্রে সতর্কতা এবং দাহ্য পদার্থের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কারখানার অবস্থান, ভবনের ব্যবহার, দাহ্য পদার্থের মজুদ এবং জরুরি বহির্গমনপথের উপযোগিতা বিবেচনা না করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে অগ্নিকাণ্ডের সময় শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা বেড়ে যায়।
শুধু লাইসেন্স দেয়া বা ভবনের নকশা অনুমোদন করাই যথেষ্ট নয়। অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করা হয়েছে কি না, অগ্নিনিরাপত্তার সরঞ্জাম সচল আছে কি না এবং জরুরি বহির্গমনপথ ব্যবহারযোগ্য কি না- এসব বিষয় নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় আনতে হবে।
রাসায়নিকমুক্ত হচ্ছে না পুরান ঢাকা
পুরান ঢাকার নিমতলীতে ২০১০ সালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জন এবং ২০১৯ সালে চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৭০ জনের মৃত্যুর পর আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পুরান ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক ভবনের নিচতলায় রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থ মজুদ রাখার অভিযোগ রয়ে গেছে।
সরু গলি, ঘনবসতি, ঝুলন্ত বৈদ্যুতিক তার এবং পাশাপাশি থাকা আবাসিক ভবন ও বাণিজ্যিক স্থাপনা এলাকাটিকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে রেখেছে। কোথাও আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি দ্রুত প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আগুন ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের ভবনেও তা দ্রুত ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।
বিকল্প শিল্পাঞ্চলে রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা স্থানান্তরের উদ্যোগে ধীরগতি এবং বারবার সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় সমস্যা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ফলে পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের জন্য অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়।
রাসায়নিকের গুদাম স্থানান্তরের ক্ষেত্রে শুধু নতুন জায়গা নির্ধারণ করলেই হবে না। নিরাপদ পরিবহন, সংরক্ষণব্যবস্থা, পরিবেশগত মানদণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনও নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে আবাসিক ভবনে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক মজুতের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ জরুরি।
রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ চরম ঝুঁকিতে
ইনানীর অগ্নিকাণ্ড দেখিয়ে দিয়েছে, পর্যটনকেন্দ্রের রিসোর্ট ও আবাসিক স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে। সমুদ্রসৈকতের বাতাসে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। অথচ কোনো স্থাপনায় অগ্নিসঙ্কেতব্যবস্থা, কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম কিংবা নিরাপদ বহির্গমনপথ না থাকলে পর্যটকদের জীবন মুহূর্তেই বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে।
রাজধানীর রেস্তোরাঁ ও বহুতল ভবনেও ঝুঁকির বিভিন্ন উৎস রয়েছে। রান্নাঘরের গ্যাসলাইন, অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক লোড, ত্রুটিপূর্ণ তার এবং অপর্যাপ্ত বহির্গমনপথ এসব স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ায়। বেইলি রোডের একটি ভবনে প্রাণহানির ঘটনা এ ধরনের ঝুঁকির ভয়াবহতা সামনে এনেছিল।
রেস্তোরাঁ, হোটেল ও রিসোর্টে প্রতিদিন বহু মানুষ যাতায়াত করেন। তাদের বেশির ভাগই ভবনের অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে জানেন না। আগুন লাগলে কোন পথে বের হতে হবে, জরুরি দরজা কোথায় কিংবা অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম কিভাবে ব্যবহার করতে হয়- এসব তথ্য জানা না থাকায় আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা বাড়তে পারে।
তাই এসব স্থাপনার জন্য অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি সরাসরি জননিরাপত্তার প্রশ্ন। ভবনের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী বহির্গমনপথ, সচল অগ্নিসঙ্কেতব্যবস্থা, উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং নিয়মিত মহড়া নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিরোধে ঘাটতি, জবাবদিহি জরুরি
অগ্নিনিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কারখানা ও বাণিজ্যিক ভবনের বৈদ্যুতিক সংযোগের নিয়মিত নিরীক্ষা, ফায়ার লাইসেন্স ছাড়া প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁয় বাধ্যতামূলক অগ্নিনিরাপত্তা, নিয়মিত মহড়া এবং পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। একই সাথে ফায়ার সার্ভিসের জনবল, সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
প্রতিটি বড় অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্ত কমিটি গঠন ও সুপারিশ প্রণয়নের নজির রয়েছে। কিন্তু সুপারিশ বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতার অভাব থাকলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটতেই থাকবে। কোনো প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি শনাক্ত হলে তা নিরসনে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, পুনরায় পরিদর্শন এবং প্রয়োজনে কার্যক্রম বন্ধের মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।
একই সাথে অগ্নিকাণ্ডের প্রাথমিক পর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য ভবন ব্যবহারকারী, কারখানার শ্রমিক, নিরাপত্তাকর্মী ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। জরুরি বহির্গমনপথ সব সময় খোলা রাখা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম সচল রাখা এবং নিয়মিত মহড়া পরিচালনা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
দেশে শিল্পায়ন ও নগরায়ণ যত বাড়বে, ততই বাড়বে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও রাসায়নিকের ব্যবহার। কিন্তু সেই উন্নয়নের সাথে অগ্নিনিরাপত্তার মান বাড়ানো না গেলে প্রতিটি নতুন কারখানা, বাণিজ্যিক ভবন কিংবা পর্যটনকেন্দ্র সম্ভাব্য বিপর্যয়ের ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।
আগুন লাগার পর উদ্ধার অভিযান ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলা জরুরি। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আগুন লাগার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা, নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর করা এবং আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কারণ, অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া সম্পদ হয়তো কোনোভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব, কিন্তু হারানো প্রাণ ফিরিয়ে আনা যায় না।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








