
এনডিটিভি
চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সঙ্কট, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও জন-অসন্তোষের জেরে গণবিক্ষোভের তীব্র ঢেউ আছড়ে পড়েছে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, ইতালি, আলবেনিয়া, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা, তুরস্কসহ একাধিক রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষ নানা দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছেন। কোথাও জীবনযাত্রার চড়া ব্যয় ও আকাশচুম্বী বাড়িভাড়া, কোথাও শিক্ষাক্ষেত্রে বাজেট হ্রাসের প্রতিবাদ, আবার কোথাও কর্মসংস্থান ও পেনশন সঙ্কটের মতো বিষয়গুলো তীব্র গণবিক্ষোভের রূপ নিয়েছে। দেশভিত্তিক দাবিগুলোর ভিন্নতা থাকলেও এসব আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছে কিছু মৌলিক ও অভিন্ন ক্ষোভ। মুদ্রাস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, আবাসন ব্যবস্থার চড়া খরচ, সরকারি সেবামূলক খাতে ব্যয় সঙ্কোচন এবং নীতিনির্ধারকদের প্রতি তীব্র অনাস্থা মানুষকে রাজপথে নামাতে বাধ্য করেছে। বিশেষ করে ফ্রান্স ও আলবেনিয়ার চলমান আন্দোলন সরকারগুলোর ওপর প্রবল রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। বহু স্থানে এসব প্রতিবাদ সহিংস সংঘাতে রূপ নেয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক প্রতিবাদ
ফরাসি ভূখণ্ডে সাম্প্রতিক অসন্তোষের মূলে রয়েছে মূলত দুটি প্রধান সঙ্কট। এর একটি হলো জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট জনদুর্ভোগ, আর অন্যটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বেহাল দশা ও শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের যৌথ আন্দোলন। আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর নীতি ও রাজনৈতিক উত্তরসূরিদের কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক চরম আকার ধারণ করেছে। সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী ম্যাক্রোঁ আগামীতে আর প্রার্থী হতে পারছেন না, যা রাজনৈতিক সমীকরণকে আরো জটিল করেছে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন গত মাসে প্যারিসে ক্ষুদ্র পরিসরে শুরু হলেও তা দ্রুত সারা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত অর্থবরাদ্দ ও শিক্ষার মানোন্নয়নের দাবিতে শুরু হওয়া এ বিক্ষোভে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। পরবর্তীতে এর সাথে যুক্ত হয় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ ‘ফ্রান্স ২৪’ কে নিশ্চিত করেছেন যে, জীবনযাত্রার ব্যয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রতিবাদে দেশজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। এর মধ্যে শুধু রাজধানী প্যারিসেই অংশ নেন এক লাখ ১০ হাজারের বেশি নাগরিক।
বেলজিয়ামে ব্যয় সঙ্কোচন নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ফুসফুস
বেলজিয়ামে পারিবারিক খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি খাতে ব্যয় কমানোর নীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের নিবন্ধন ফি মাত্রাতিরিক্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হলে শিক্ষার্থীরা ফুঁসে ওঠেন। পরবর্তীতে এ অসন্তোষ সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির বিরুদ্ধে বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নেয়। গত শুক্রবার ব্রাসেলস ও লিয়েজ শহরে বিক্ষোভকারীদের সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ চড়াও হয়ে জলকামান ব্যবহার করে। বেলজিয়ামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্টিন বিক্ষোভকারীদের এ কর্মতৎপরতাকে ‘সমাজকে অস্থিতিশীল করার সুপরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের ‘দাঙ্গাকারী’ বলে অভিহিত করেছেন।
পর্তুগালে আবাসন সঙ্কট ও চড়া বাড়ি ভাড়ার বিরুদ্ধে ক্ষোভ
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার বর্ধিত ব্যয়, স্বল্প মজুরি এবং সাশ্রয়ী বাসস্থানের চরম সঙ্কটের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। ২০১৭ সাল থেকে লিসবনসহ দেশটির প্রধান শহরগুলোতে আবাসিক সম্পত্তির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে নতুন চুক্তিতে বাড়ি ভাড়ার হারও আকাশছোঁয়া হয়েছে। এর ফলে তরুণ চাকরিজীবী ও স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো মারাত্মক আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে। অনেকের কাছে আবাসন সঙ্কট কেবল ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়া নয়, বরং ভাড়াবাসায় টিকে থাকাও দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ফরাসি আন্দোলনের সাথে পর্তুগালের এ প্রতিবাদের ভিন্নতা রয়েছে; এখানে আন্দোলন প্রধানত মজুরি বৃদ্ধি, আবাসন ব্যবস্থার সুরাহা এবং দৈনন্দিন ব্যয় সামলানোর দাবির মাঝেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
ইতালিতে হ্রাস পাচ্ছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা
ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো ইতালিতেও জীবনযাত্রার মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় এবং নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমেছেন। স্থবির মজুরির হার, মুদ্রাস্ফীতি ও দৈনন্দিন চলাচলের খরচ মেটানোর তীব্র অনিশ্চয়তার জেরে মিলানে বিক্ষোভকারীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। যদিও ইতালির এ আন্দোলনের পরিধি ফ্রান্সের তুলনায় কিছুটা সীমিত, তবুও লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও আয়ের সাথে ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান ব্যবধান নিয়ে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আলবেনিয়ায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ
আলবেনিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বেহাল অবকাঠামো, উচ্চশিক্ষার আকাশচুম্বী ব্যয়, আর্থিক প্রণোদনার অভাব এবং শিক্ষাজীবন শেষে বেকারত্বের চরম অনিশ্চয়তা নিয়ে তরুণ সমাজের ক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত ১৩ অক্টোবর রাজধানী তিরানায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভ চলাকালে তা সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা ভবনটি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও কংক্রিটের টুকরা নিক্ষেপ করলে পুলিশ চড়াও হয়ে অভিযান চালায়। পরবর্তীতে এ প্রতিবাদের পরিধি আরো বিস্তৃত হয় এবং এর সাথে বৈষম্য দূরীকরণ, বেকারত্ব হ্রাস এবং ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমানোর দাবিও যুক্ত হয়। স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতি তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে কি না, তা নিয়ে তরুণ প্রজন্মের মাঝে গভীর হতাশা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে, যা সরকারের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ
ভারতে ভোটার তালিকা বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ এনে জোরদার প্রতিবাদ চালাচ্ছে বিরোধী দলগুলো। এ আন্দোলনে তাদের সাথে সংহতি প্রকাশ করেছে নতুন রাজনৈতিক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। বিদেশী শিক্ষায় শিক্ষিত এক জনসংযোগ পেশাজীবীর নেতৃত্বে গঠিত এ গোষ্ঠীর বেশ কয়েকজন সদস্য এর আগে কংগ্রেস ও শীর্ষনেতা রাহুল গান্ধীর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। এ ছাড়া এর পূর্বে মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষার (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে দেশব্যাপী ছাত্র বিক্ষোভেও অংশ নিয়েছিল এ গোষ্ঠীটি। ওই সময়কার তীব্র বিতর্কের মুখে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ভারতের নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধনসংক্রান্ত সমস্ত অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পবিরোধী ‘নো কিংস’ সমাবেশ
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির তীব্র বিরোধিতা করে ‘নো কিংস’ নেটওয়ার্কের ব্যানারে দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের শহর ও জনপদে প্রতিবাদী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণ মানুষকে আগাম ভোটদানে উৎসাহিত করা এ কর্মসূচির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। যদিও আয়োজকদের পক্ষ থেকে এ সমাবেশগুলোকে পুরোপুরি দলনিরপেক্ষ বলে দাবি করা হচ্ছে, তবুও ট্রাম্পের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন নিয়ে ক্ষুব্ধ জনগণের গত দুই বছর ধরে চলা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা থেকেই এসব কর্মসূচি মূলত শক্তি সঞ্চয় করছে।
আর্জেন্টিনায় উচ্চশিক্ষায় বাজেট কমানোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ
আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসে প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই সরকারের উচ্চশিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দ কমানোর নীতির বিরুদ্ধে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়কর্মী, ট্রেড ইউনিয়ন সদস্য ও বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীরা রাজপথে নেমেছেন। সংসদ ভবনের সামনে মূল বিক্ষোভটি শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হলেও, সেখান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মুখোশধারী কিছু আন্দোলনকারী পুলিশের দিকে পাথর ও বিভিন্ন বস্তু ছুড়লে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। ২০২৩ সালের শেষভাগে মিলেই ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাখাতে বাজেট কাটছাঁটের প্রতিবাদে এটি পঞ্চম বৃহত্তম বিক্ষোভ। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০২৫ সালের একটি বিশেষ আইন কার্যকর করার ব্যাপারে আদালত একাধিকবার রায় দিলেও সরকারের বাজেট হ্রাসের নীতির কারণে প্রশাসনের সাথে এ দ্বন্দ্ব অব্যাহত রয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








