বৈদেশিক খাতে গতি ফিরলেও মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং সঙ্কটে অর্থনীতি

বিশেষ সংবাদদাতা

Advertisement

প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি, রিজার্ভে কিছুটা গতি এবং কৃষিঋণ বিতরণে ইতিবাচক পরিবর্তনের ভরসায় এগোচ্ছে দেশের অর্থনীতি। তবে এর বিপরীত পিঠে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের খরা, রেকর্ড খেলাপি ঋণ, শিল্পঋণের অস্থিরতা এবং রফতানি আয়ে স্থবিরতা এক বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক গতকাল প্রকাশিত ‘উইকলি সিলেক্টেড ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস’ প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির এই দ্বিমুখী চিত্র ফুটে উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয়ের প্রাক্কলিত পরিমাণ ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৭.৩৪ শতাংশ বেশি। বিপরীতে, এই সময়ে রফতানি আয়  প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪৩.৮৬ বিলিয়ন ডলার-যা আগের বছরের তুলনায় ০.২৫ শতাংশ কম। অর্থাৎ, বৈদেশিক মুদ্রার জোগানে রেমিট্যান্স বড় চালিকাশক্তি হলেও মূল রফতানি খাত মন্থর হয়ে পড়েছে।
এ দিকে ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের অনুপাত লাফিয়ে ৩২.৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে। বিপুল এই খেলাপির বোঝায় ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা সার্বিক ঋণের সক্ষমতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে তলানিতে নিয়ে ঠেকিয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও আমদানির ভারসাম্য
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬  হিসাব পদ্ধতির নানা পরিসংখ্যান প্রতিবেদনটিতে স্থান পেয়েছে।
তবে শুধু রিজার্ভের পরিমাণ দেখে স্থায়িত্ব বিচার করা যাবে না; বরং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ, জ্বালানি আমদানির দায় মেটানো এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের ওপরই এর প্রকৃত স্থায়িত্ব নির্ভর করছে।
আমদানি ব্যয়ের পূর্বাভাস : ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সিএফ  ভিত্তিতে আমদানি ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৭৫.২৪ বিলিয়ন ডলার (প্রবৃদ্ধি ১০.০৭ শতাংশ)। আর এফওবি  ভিত্তিতে এই প্রাক্কলন ৭১.১৪ বিলিয়ন ডলার (১০.৫৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি)।
আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হলো অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও জ্বালানি খাতে ডলারের চাহিদা বাড়ছে। আমদানিকৃত এই পণ্য যদি শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি হয়, তবে তা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক গতি ফেরাবে। কিন্তু ভোগ্যপণ্যনির্ভর আমদানি দীর্ঘমেয়াদে রিজার্ভকে আরো চাপে ফেলবে।
রেমিট্যান্সে স্বস্তি, রফতানিতে কেন এই খরা?
প্রবাসী আয় ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার প্রাক্কলন দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ভারসাম্যের জন্য একটি বড় আশীর্বাদ। ১৭.৩৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ফলে ব্যাংকগুলোতে ডলার সরবরাহ সহজ হচ্ছে, যা আমদানি বিল মেটানো এবং টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখছে। 
মূল্যস্ফীতিতে ধীরগতির পতন, তবু দিশেহারা মধ্যবিত্ত
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বারো মাসের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৬৫ শতাংশে এবং পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৩৪ শতাংশে। আগের বছর একই সময়ে যা ছিল যথাক্রমে ৯.৪৫ শতাংশ ও ৮.৩৬ শতাংশ। গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাস্তব বাজারে এর স্বস্তি মিলছে না। কারণ- মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে থাকা মানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে চলা।
খেলাপি ঋণ : ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ
বাংলাদেশের আর্থিক খাতের অন্যতম গুরুতর সমস্যা উচ্চ খেলাপি ঋণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গতকাল শনিবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট ঋণের মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত ২০২৪ সালের জুনে ১২.৫৬ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬ সালের জুনে ৩২.৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে নিট শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত ৩.৬৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫.২২ শতাংশে পৌঁছেছে।
২০২৫ সালের জুনে মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩৪.৪০ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বর শেষে ৩৫.৭৩ শতাংশে উন্নীত হয়। যদিও ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা কমে ৩০.৬০ শতাংশে নেমেছিল, তবে ২০২৬ সালের মার্চে তা আবার বেড়ে ৩২.২৬ শতাংশ এবং জুনে ৩২.৭৮ শতাংশে গিয়ে ঠেকে।
এই পরিসংখ্যান ব্যাংকিং খাতের ঋণের মান নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। তবে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে নতুন ঋণখেলাপি হওয়ার পাশাপাশি পূর্বে পুনঃতফসিল করা ঋণের পুনঃশ্রেণিকরণ, প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ এবং মোট ঋণের পরিমাণের পরিবর্তনও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সঠিক কারণ উদঘাটনে বিস্তারিত ঋণভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ জরুরি।
এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঋণ অনুমোদনে যথাযথ যাচাই-বাছাই, ঋণ আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা, ব্যাংকের পরিচালনা ও তদারকিতে জবাবদিহি এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ অপরিহার্য।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে দুর্বলতা
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৪.৭৫ শতাংশ এবং মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ১১.৩৪ শতাংশ দেখানো হয়েছে। একই সময়ে সরকারি খাতে নিট ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৬.৪০ শতাংশ, বিপরীতে অন্যান্য সরকারি খাতের ঋণ ৮.০৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
এই উপাত্তে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য দৃশ্যমান- মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়লেও বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক বেশ কম। 
শিল্পঋণে মিশ্র চিত্র ও এসএমই খাতের অনিশ্চয়তা
২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্পমেয়াদি ঋণের বিতরণ ছিল ৯৯,৭৯৫.৭৪ কোটি টাকা (পূর্ববর্তী অর্থবছরে যা ছিল ৯৭,১৩৮.৪৭ কোটি টাকা)। অর্থাৎ বার্ষিক হিসাবে বিতরণ বাড়লেও ত্রৈমাসিক বিশ্লেষণে বড় ওঠানামা লক্ষ্য করা যায়। যেমন- ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে শিল্প ঋণ বিতরণ ছিল ২০,০২৮.৮৬ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকের (২৩,৭৪৮.২৬ কোটি টাকা) চেয়ে কম।
অন্য দিকে এসএমই খাতে প্রথম তিন প্রান্তিকে মোট ১,৭০,৪২২.৭১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। তবে কেবল ঋণ বিতরণের অংক দিয়ে নতুন বিনিয়োগের প্রকৃত চিত্র মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। কারণ ঋণ বিতরণ বাড়লেও যদি উৎপাদন ও কর্মসংস্থান না বাড়ে, তবে তার অর্থনৈতিক সুফল সীমিতই থেকে যায়।
কৃষিঋণে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি
কৃষি ও অকৃষি পল্লী ঋণ বিতরণে একটি ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই-আগস্ট সময়ে এ খাতে ৬,৮৫৭.৯৫ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪২.১০ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ঋণ আদায়ও বেড়েছে ২২.১৬ শতাংশ। কৃষি খাতের এই প্রবৃদ্ধি গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ালেও এর মূল সুফল নির্ভর করবে কৃষকের কাছে সময়মতো ঋণ পৌঁছানো, উৎপাদন উপকরণের ন্যায্যমূল্য এবং উৎপাদিত পণ্যের সঠিক বাজারদর নিশ্চিত করার ওপর।
সঞ্চয়পত্র, রাজস্ব ও শেয়ারবাজারের গতিপ্রকৃতি
 জাতীয় সঞ্চয়পত্র : নিট বিক্রির পরিমাণ ৪৩৬.০৬ কোটি টাকা এবং মোট স্থিতি তিন লাখ ৩৪ হাজার ২.৩৫ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ইতিবাচক থাকা মানে নগদায়নের চেয়ে বিক্রির পরিমাণ বেশি; তবে এর মাধ্যমে পরিবারগুলোর সামগ্রিক সঞ্চয় প্রবণতা সরাসরি পরিমাপ করা যায় না।
 রাজস্ব আয় : ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরের কর রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২.২৩ শতাংশ। অর্থনীতির আকার ও সরকারের ব্যয়ের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন এবং কর ফাঁকি রোধে আরো জোর দেয়া প্রয়োজন।
 শেয়ারবাজার : ডিএসই ও সিএসই সূচকে সামান্য ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলেও বাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব সম্পূর্ণ নির্ভর করে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সুশাসন, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ
২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ৪.১৪ শতাংশ ধরা হয়েছে (পূর্ববর্তী অর্থবছরে যা ছিল ৩.৪৯ শতাংশ)। তবে এই প্রবৃদ্ধির সুফল যদি সমাজের সব স্তরে না পৌঁছায়, তবে আয়বৈষম্য ও মূল্যস্ফীতির চাপ থেকেই যাবে।
১. বৈদেশিক খাত : রফতানি আয় না বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও লেনদেনের ভারসাম্যে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
২. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ : মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও বাজারদর সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা জরুরি।
৩. ব্যাংকিং খাতের সুশাসন : খেলাপি ঋণ কঠোরহস্তে দমন করে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।
৪. বেসরকারি বিনিয়োগ : ব্যবসায়িক আস্থার সঙ্কট দূর করে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়ানো।
৫. রাজস্ব সংস্কার : কর আহরণ বাড়িয়ে সরকারি ব্যয়ের অর্থায়ন টেকসই করা।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে সম্ভাবনা ও ঝুঁকির এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ও কৃষি খাতের গতিশীলতা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও রপ্তানির স্থবিরতা, বেসরকারি খাতের মন্থর ঋণপ্রবাহ এবং উচ্চ খেলাপি ঋণ বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। অর্থনীতিকে টেকসই ও মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে সামষ্টিক সূচকের উন্নতির পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুসংহত ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন জরুরি।