
মধুপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা
টাঙ্গাইলের মধুপুরের ফুসফুস ও প্রাকৃতিক অক্সিজেনের কারখানা হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক শাল-গজারির বন আজ অস্তিত্বসঙ্কটে পড়েছে। এক সময়ের সমৃদ্ধ এই প্রাকৃতিক বনে এখন যেন বৃক্ষনিধনের উৎসব চলছে। অভিযোগ উঠেছে, বন বিভাগের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরোক্ষ যোগসাজশ ও সহায়তায় সঙ্ঘবদ্ধ গাছচোর চক্র প্রতিনিয়ত পুরনো বৃক্ষ কেটে বন উজাড় করছে। উজাড় হওয়া সেই বনভূমি অবৈধভাবে দখলে নিয়ে সেখানে নির্বিঘেœ চালানো হচ্ছে বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ।
অনুসন্ধান ও সরেজমিন চিত্রে দেখা যায়, মধুপুর বন বিভাগের দোখলা রেঞ্জের সদর বিট, চুনিয়া দক্ষিণ-পূর্ব ফেকামারি এবং জামবাইদ এলাকার প্রায় পাঁচ বিঘা বিস্তৃত বনভূমিতে তাণ্ডব চালানো হয়েছে। সেখানে শত শত বছরের পুরনো শাল ও গজারি গাছ কেটে সাবাড় করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কোনো গোপনীয়তা ছাড়াই দিনের আলোতে প্রকাশ্যে এসব প্রাকৃতির সম্পদ কেটে নেয়া হচ্ছে। গাছ কাটার পর সেই জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফসল ফলাচ্ছেন দখলদারেরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই বন উজাড় ও দখলের নেপথ্যে রয়েছেন হরিণধরা গ্রামের বাসিন্দা মো: খোকন মিয়া, ময়েজ উদ্দিন ও আজমত আলী। তারা মূল গ্রামের বাসিন্দা হলেও বনের জমি দখলের সুবিধার্থে বনসংলগ্ন এলাকায় ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন এবং নিয়মিত গাছ কেটে জমি সম্প্রসারণ করছেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বলেন, আপনারা কেবল আমাদের জায়গাটুকুই চোখে দেখেন? বনের আরো বহু জায়গায় শত শত গাছ কেটে জমি দখল করা হচ্ছে, সেগুলো তো আপনাদের চোখে পড়ে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন অধিবাসী জানান, বন বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোটা অঙ্কের ঘুষ ও মাসোহারা দিয়ে নামমাত্র ম্যানেজ করেই এসব বৃক্ষনিধন চালানো হচ্ছে।
সরেজমিন বনাঞ্চলে গিয়ে দেখা যায়, কাটার পর ফেলে রাখা গাছের গোড়া (স্টাম্প) এবং আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শুকনো ডালপালা ও ছালের অবশিষ্টাংশ। এভাবে অবাদ কাটার ফলে প্রাকৃতিক বনের ভারসাম্য ও সার্বিক জীববৈচিত্র্য চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
এ দিকে অরণখোলা বিটেও বনের জমি দখল করে স্থায়ী পাকা ইমারত ও ভবন নির্মাণের গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। বনের অস্তিত্ব রক্ষায় সংশ্লিষ্ট দফতর দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অবৈধ দখলদার ও অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ও পরিবেশবাদীরা। পরিবেশবিদদের মতে, মধুপুরের এই শালবন বন্য প্রাণীর আবাসস্থল, মাটির ক্ষয়রোধ ও আবহাওয়ার ভারসাম্য রক্ষায় অনবদ্য ভূমিকা রাখে। পুরনো শাল-গজারি কেটে ফেললে বনের স্বাভাবিক পুনর্জন্মপ্রক্রিয়া চিরতরে ব্যাহত হয়।
এ বিষয়ে পরিবেশকর্মী রাতুল মুন্সি বলেন, যখন সর্ষের মধ্যেই ভূত থাকে, তখন সাধারণ মানুষ নিরুপায় হয়ে পড়ে। সামাজিক বনায়নের সুফলভোগীরাই যখন বন কাটে, তা বন বিভাগ ভালো করেই জানে।
তবে বন বিভাগের সর্বোচ্চ পদক্ষেপ কেবল কিছু কাঠ জব্দ ও একটি মামলা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু কেবল মামলা দিয়ে বা কাঠ জব্দ করে এই বিশাল বন রক্ষা সম্ভব নয়। বন ও জীববৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সামাজিক আন্দোলন ও জনসচেতনতা গড়ে না তুললে অবশিষ্টাংশ বাঁচানো যাবে না।
দোখলা রেঞ্জ কর্মকর্তা আমিনুর রহমান দাবি করেন, জামবাইদ এলাকার বন কাটার বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে তিনি বিট কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। অন্য দিকে সংশ্লিষ্ট বিট কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ স্বীকার করেন, ওই এলাকায় গাছ কাটার বিষয়ে তারা অবগত আছেন এবং ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে বর্তমানে কোনো গাছ কাটা হচ্ছে কি না- সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।
সহকারী বনসংরক্ষক (এসিএফ) এস বি তানবীর আহমদ ইমন বলেন, আমায় সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ দিন। বিষয়টির সরেজমিন তদন্ত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ নাজমুল আলম জানান, অনিয়মের দায়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তাকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট ছবি ও তথ্য পেলে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








