
হাবিবুর রহমান চৌধুরী কুমিল্লা
কুমিল্লায় একের পর এক হত্যাকাণ্ডে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে। গত ৯ মাসে জেলায় ১০৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে আলোচনায় এসেছে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দম্পতির একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম এবং সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন হত্যার ঘটনা। এসব হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি চুরি, ডাকাতি, অপহরণ ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অপরাধ দমনে অভিযান ও গ্রেফতার চললেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক প্রতিনিধি ও বিশ্লেষকরা।
জেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সভার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত কুমিল্লা জেলায় ১০৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৯টি, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ১২টি, মার্চে ১১টি, এপ্রিলে ১০টি, মে মাসে ১৭টি, জুনে ১০টি, জুলাইয়ে ১০টি এবং আগস্টে ১১টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। সেপ্টেম্বর মাসের অপরাধসংক্রান্ত তথ্য ১১ অক্টোবরের সভায় উপস্থাপন করা হতে পারে।
আলোচিত তিন হত্যাকাণ্ড : চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকায় আইরিশ হিল হোটেলের পাশ থেকে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর (৩৫) রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি রাতে চট্টগ্রাম থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। ঘুমিয়ে পড়ায় নির্ধারিত স্টপেজে নামতে না পেরে ঝাগুরঝুলি বিশ্বরোড এলাকায় নামেন। অভিযোগ অনুযায়ী, মধ্যরাতে সেখানে ছিনতাইকারী চক্রের কবলে পড়েন তিনি। চালক ও যাত্রীবেশে থাকা ছিনতাইকারীরা তাকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে মারধর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। পরে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দিলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
এরপর দেশব্যাপী আলোচনায় আসে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যার ঘটনা। সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী অপ্রতিম ১৯ সেপ্টেম্বর বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। পরদিন কোটবাড়ীর লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আইফোন ছিনিয়ে নেয়াকে কেন্দ্র করে তাকে হত্যা করা হয়।
সর্বশেষ আলোচনায় আসে সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৪) হত্যাকাণ্ড। কুমিল্লা মহানগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের এই শিক্ষার্থী ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়। ৭ অক্টোবর রাতে বাবার হোয়াটসঅ্যাপে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাকে বাঁচানোর আকুতি জানিয়ে বার্তা পাঠায়। পরদিন ৮ অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার ভোরাজগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, ৭ অক্টোবর রাতে সে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠেছিল। চালক সুমন মিয়া (৩৫) তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে বলে পুলিশের অভিযোগ। পরে চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছ থেকে তাজমিনের ছিনিয়ে নেয়া আইফোনও উদ্ধার করা হয়।
এক মাসে ৭৬টি মামলা : জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে কুমিল্লায় বিভিন্ন অপরাধে মামলার সংখ্যা বেড়েছে ৭৬টি। আগস্টে জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকায় বিভিন্ন অপরাধে ৫৮৫টি মামলা হয়েছে। জুলাইয়ে এ সংখ্যা ছিল ৫০৯টি। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চালিয়ে দুই হাজারের বেশি কিশোরকে আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এরপরও খুন, চুরি-ডাকাতি, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় উদ্বেগ কাটছে না। অভিযোগ রয়েছে, গ্রেফতারের পর জামিনে বা আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত হয়ে কেউ কেউ আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পাড়া-মহল্লায় কিশোরগ্যাংয়ের বেপরোয়া তৎপরতাও পরিস্থিতিকে আরো উদ্বেগজনক করে তুলছে। তাজমিন হত্যাকাণ্ডের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নাগরিক প্রতিনিধিরা।
মাদক ও সামাজিক অবয়কে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা : সমাজকর্মী ও আলোকিত বজ্রপুরের সংগঠক রফিকুল ইসলাম সোহেল বলেন, কুমিল্লায় অপরাধ বাড়ার কারণ এটি সীমান্তবর্তী জেলা। এখানে মাদকের আগ্রাসন রয়েছে। মাদক ঠেকানো গেলে অপরাধ কমে যাবে। এ ক্ষেত্রে জেলা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, বিজিবি, এসআরবি, জেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিসহ সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মাসুক আলতাফ চৌধুরী বলেন, কুমিল্লা ঢাকা ও চট্টগ্রামের মাঝামাঝি জেলা হওয়াতে যোগাযোগব্যবস্থা সহজ। বিভিন্ন জেলার কর্মজীবী মানুষের বসবাস থাকায় জনঘনত্বও বেশি। পাশাপাশি মাদকের সহজলভ্যতা রয়েছে। প্রশাসনের গাফিলতিও আছে, এ ছাড়া সামাজিক অনুশাসন ভেঙে পড়েছে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, এখন আর প্রচলিত পদ্ধতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এ জন্য রাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবতে হবে। অপরাধী গ্রেফতার হলে অনেকে ভয়ে আদালতে সাক্ষ্য দিতে যান না। ফলে অপরাধী খালাস পেয়ে যায়। পরে বেরিয়ে দ্বিগুণ অপরাধ করে। এদিকে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবক সমাবেশকে গুরুত্ব দিতে হবে। কুমিল্লা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে টহল টিম বাড়ানো হয়েছে। টানা অভিযান চালানো হচ্ছে। মাদক ও কিশোরগ্যাংয়ে অভিযুক্ত দুই হাজার জনকে আটক করেছি। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








