
জিলানী মিলটন
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলাতে এখনো থ্রি-জি ও ফোর-জি মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা চালু রয়েছে। ফলে রোহিঙ্গাদের অনেকে বিদেশী সিম ব্যবহার করে অনলাইন জুয়াসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে।
সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা শিবিরে থ্রি-জি ও ফোর-জি মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা চালু থাকায় তারা অবাধে বিদেশী সিম ব্যবহার করছে। মিয়ানমার ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সিম দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। তারা অনেকে এসব বিদেশী সিম ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রোহিঙ্গাবিষয়ক জাতীয় কমিটির সভায় সেখানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। সূত্র জানায়, বৈঠকে এপিবিএনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রোহিঙ্গা শিবিরে একাধিক অভিযানে মাদককারবারিসহ রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে বিভিন্ন দেশের সিম উদ্ধার করা হয়েছে। এসব সিমের মাধ্যমে অনলাইন জুয়া খেললে তা বাংলাদেশের বদলে বিদেশ থেকে হচ্ছে বলে মনে হয়। ফলে পুলিশের পক্ষে তা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে বসবাসরত শরণার্থীদের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার সিম কার্ড বিতরণ করেছে সরকার। তবে শিবিরগুলোতে মোবাইল নেটওয়ার্ক শুধু ২জি প্রযুক্তিতে সীমিত রাখার যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল, তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে সেখানে এখনো থ্রি-জি ও ফোর-জি নেটওয়ার্ক সেবা চালু রয়েছে।
২০২৫ সালে রোহিঙ্গাদের সিমকার্ড দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। প্রথম ধাপে ১০ হাজার সিম বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল, রোহিঙ্গাদের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নজরদারির আওতায় আনা এবং বিদেশী সিমের ব্যবহার বন্ধ করা। গত বছরের ১০ নভেম্বর শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান ১০০টি সিম হস্তান্তরের মাধ্যমে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানায়, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে শুধু ২জি নেটওয়ার্ক চালুর সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছিল। এ জন্য ৩জি ও ৪জি সেবা বন্ধ করার পরিকল্পনা ছিল। এর পেছনে যুক্তি ছিল, ২জি নেটওয়ার্কে রোহিঙ্গারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে পারবেন। এত অনলাইন জুয়া, মাদক কারবারি এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সংঘটিত অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। উচ্চগতির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে শিবিরের বাইরে, দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এবং বিদেশে যোগাযোগ করা সহজ হয়।
এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) শিবিরগুলোতে ২জি নেটওয়ার্ক চালুর উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছিল। সিম বিতরণের জন্য জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের কাছ থেকে তথ্য-উপাত্ত নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তথ্য হস্তান্তর দ্রুত করা ও কার্যক্রম তদারকির জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের বিষয়ক জাতীয় কমিটির বৈঠক হয়। সূত্র জানায়, সেখানে আরআরআরসি অফিস জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত মোট ৭ হাজার ৯৮৫টি সিম বিতরণ করা হয়েছে, কিন্তু শিবিরগুলোকে ২জির আওতায় আনা যায়নি।
বৈঠকে আরআরআরসি জানায়, রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। তাই ইউএনএইচসিআরের দেয়া নিবন্ধন নম্বরের ভিত্তিতে সিম দেয়া হয়েছে। শুধু ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সীরা এর জন্য যোগ্য।
বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ২জিতে যাওয়ার বিষয়ে আরআরআরসি আপত্তি তুলেছেন। আরআরআরসি অফিসের বক্তব্য, ৩জি-৪জি থেকে ২জিতে গেলে ত্রাণকার্যক্রম ব্যাহত হবে। কার্যবিবরণীতে তার বরাতে বলা হয়েছে, ‘দুর্যোগের সময় সহজে যোগাযোগ করা বা বার্তা পাঠানো সম্ভব হয় না। আরো বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরাও সম্ভব হয় না। এ বিষয়ে সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে আরআরআরসি কার্যালয়ের সহকারী সচিব নওশের ইবনে হালিম গণমাধ্যমকে বলেন, এলাকাটি পাহাড়ি হওয়ায় নেটওয়ার্ক সব সময়ই ধীরগতির, তাই ২জি কাজ করবে না। তাই ২জি এখনো করা হয়নি। বিষয়টি এখনো ঝুলে আছে।
১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি সিরাজ আমিন বৈঠকে জানান, একাধিক অভিযানে মাদক কারবারিসহ রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে বিভিন্ন দেশের সিম উদ্ধার করা হয়েছে। এসব সিমের মাধ্যমে অনলাইন জুয়া খেললে তা বাংলাদেশের বদলে বিদেশ থেকে হচ্ছে বলে মনে হয়। ফলে পুলিশের পক্ষে তা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে। পুলিশের সাইবার ইউনিট এ নিয়ে কাজ করছে, তবে তাদের সক্ষমতা আরো বাড়ানো প্রয়োজন।
রোহিঙ্গা শিবির ও আশপাশের এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) আরেক কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমার, মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশের সিম রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করছে। এসব সিম বন্ধ করার বিষয়ে বিটিআরসির সাথে আমাদের যোগাযোগ চলছে। আমাদের চেষ্টা ও প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। আশা করছি শিগগিরই একটি ভালো সমাধান পাওয়া যাবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








