পাল্টে গেছে যাত্রাবাড়ীর চিত্র
যাত্রাবাড়ীতে সড়ক থেকে হকার উচ্ছেদের পরের চিত্র : নয়া দিগন্ত।

 আবু সালেহ আকন

Advertisement

ফুটপাথসহ রাস্তার সেই দোকানগুলো এখন আর নেই। এখানে সেখানে ময়লা আবর্জনার স্তূপও নেই। নেই অবাধে অপরাধীদের বিচরণ। সেসব জায়গায় সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লেগুন, রিকশা, অটোরিকশা। যাত্রীরা স্বাচ্ছন্দ্যে গাড়িতে উঠতে পারছেন। যানবাহনগুলোও নির্বিঘেœ চলছে। ফুটপাথে হাঁটার পথ হয়েছে পথচারীদের। এতেই তারা বেজায় খুশি। ফুটপাথ ও রাস্তা থেকে হকার উচ্ছেদের পর গোটা যাত্রাবাড়ী মোড়ের চিত্রই যেন পাল্টে গেছে। দেশের দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও সিলেটে যাতায়াতকারীদের জন্য এই মোড়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরেই যাত্রাবাড়ী পার্কের সামনের ফুটপাথ ও মূল সড়কের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাট ও জটলা পথচারীদের কাছে ভোগান্তির কারণ ছিল। গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা ও আশপাশের এলাকায় অবৈধ স্থাপনা ও হকারদের বিরুদ্ধে বিশেষ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। এর ফলে দীর্ঘদিনের দখল হয়ে থাকা রাস্তা ও ফুটপাথ এখন ফাঁকা হয়েছে। যাত্রাবাড়ী গোলচত্বরে অপরাধপ্রবণ ও জটলাপূর্ণ এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের নজরদারি এবং বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। 
সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে,  ফ্লাইওভারের আসার অংশ,  যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায়  পার্কের সামনে, শনিরআখড়া, ডেমরা রোড,  যাত্রাবাড়ী থেকে কাজলা এবং ধোলাইপাড়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের উভয় পাশের ফুটপাথ ও রাস্তায় গড়ে ওঠা শত শত অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা সরিয়ে দেয়া হয়েছে।  স্থায়ী ও অস্থায়ী দোকান উচ্ছেদ হওয়ার ফলে চিরচেনা তীব্র যানজট ও জনজটও কিছুটা কমে এসেছে এবং পথচারী ও যানবাহন চলাচলে স্বস্তি ফিরেছে। 
ফুটপাথ দখল ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের উদ্যোগে  ঢাকা দক্ষিণ  সিটি করপোরশেন (ডিএসসিসি), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যাত্রাবাড়ী থানা ও ট্রাফিক বিভাগ এবং  নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। 
রাজধানীর ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের যাত্রাবাড়ী শহীদ ফারুক রোড এবং পার্কের আশপাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। অভিযান চলাকালে সড়ক ও ফুটপাথ দখল করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন অবৈধ দোকান ও স্থাপনা অপসারণ করা হয়। ৫ অক্টোবর সোমবার বেলা ১১টায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-৫ আসনের বিএনপি প্রধান সমন্বয়ক নবীউল্লাহ নবী, শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা ফেরদৌস হোসেন রনিসহ দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ সময় স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ দল ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন। মূল সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন অবৈধ ভাসমান দোকানপাট গড়ে উঠেছিল এবং বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে তাদের মালামাল রাস্তায় ও ফুটপাথে ফেলে রেখেছিল, যার ফলে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে চরম বিঘœ ঘটছিল। 
শনিরআখড়ায় ডিএসসিসি ও স্থানীয় বিএনপি যৌথ উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে ফুটপাথ দখলমুক্ত করেছে। গত ৭ অক্টোবর বুধবার সকালে শনিরআখড়া এলাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। উচ্ছেদ অভিযানের পরপরই আবারো কিছু অসাধু ব্যক্তি ও বাড়িওয়ালার মাধ্যমে অবৈধভাবে ফুটপাথ দখলের চেষ্টা করা হচ্ছিল। 
এর আগে রাজধানীর ডেমরা রোডের ফুটপাথ দখলমুক্ত করতে, অবৈধ ভাঙাড়ি দোকান, অননুমোদিত গাড়ি পার্কিং এবং পরিবেশদূষণকারী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার মৃধাবাড়ী থেকে কাজলা হয়ে কুতুবখালী পর্যন্ত এ অভিযান চলাকালে হকারদের সাথে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের বাগি¦তণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করলেও পরে রাজনৈতিক নেতাদের অনুরোধে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।
সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ফেরদৌস হোসেন রনি বলেছেন, ‘যারা চাঁদাবাজির সাথে জড়িত, তাদের পরিচয় একটাই- তারা চাঁদাবাজ। কারো নাম, পরিচয় বা প্রভাব ব্যবহার করে কোনো ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ নেই।’
তিনি বলেন, ‘সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, শহীদ ফারুক রোড, মৃধাবাড়ী-কাজলা, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার ও শনিরআখড়া এলাকায় অবৈধ দখল উচ্ছেদ কার্যক্রমের পর আমরা কয়েক দফা সরজমিনে পরিদর্শন ও মনিটরিং করেছি। জনস্বার্থে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে নিজ উদ্যোগে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। পাশাপাশি এলাকার পরিবেশ সুন্দর ও সবুজ রাখতে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও গ্রহণ করা হয়েছে।’
ফেরদৌস হোসেন রনি বলেন, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে রাস্তার পাশে থাকা ভবন বা জায়গার মালিকদের একটি অংশ অবৈধভাবে হকার বসানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। অবৈধ হকারদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা বা অগ্রিম অর্থ নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। আবার কোথাও কোথাও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।’
স্থানীয় এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হকার ও ভাসমান অপরাধীদের জন্য এই এলাকা চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছিল, যা থেকে অনেকটাই রেহাই মিলেছে উচ্ছেদের কারণে। এখন দেখতে হবে এই সুন্দর পরিবেশ কত দিন টিকে। রাসেল নামের এক পথচারী বলেন, হকাররা রাস্তা পর্যন্ত দখল করে রেখেছিল। যা থেকে উদ্ধার পেয়েছে পথচারীরা। তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকলে পুরো শহরটাকেই সুন্দর করা সম্ভব।