
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
অবশেষে প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরে খুলে দেয়া হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটী থেকে মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুরের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। ‘মুক্তারপুর-পঞ্চবটী সড়ক প্রশস্তকরণ ও দোতলাকরণ’ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত এ দ্বিতল সড়কের মধ্য দিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জের যোগাযোগব্যবস্থা আরো সহজ ও গতিশীল হবে। সেই সাথে দীর্ঘদিনের তীব্র যানজট সমস্যা নিরসনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই মেগা অবকাঠামো। সড়কটি খুলে দেয়া হলে মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের সাথে রাজধানীর সড়ক যোগাযোগ আরো দ্রুত ও নিরাপদ হবে। সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ।
সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গত বৃহস্পতিবার এক্সপ্রেসওয়েটি পরিদর্শনে আসেন। এ সময়ে মন্ত্রী বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে পঞ্চবটী-মুক্তারপুর সড়কে যান চলাচল চালু হবে। তিনি নির্মাণ কাজের খুঁটিনাটি ত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে সুচারুভাবে কাজ সম্পন্ন করার তাগিদ দেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান মন্ত্রীর কাছে মৌখিকভাবে প্রস্তাব করে বলেন, পঞ্চবটীর ফ্লাইওভারটি চাষাঢ়া মোড় পর্যন্ত সম্প্রসারিত করলে নারায়ণগঞ্জের যানজট নিরসনে অনেক উপকার হবে। এ ছাড়াও পঞ্চবটী বিসিক নারায়ণগঞ্জের অন্যতম শিল্প এলাকা। এখানে শত শত গার্মেন্টস শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে শত শত মালবাহী গাড়ি চলাচল করে। যানজটের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তাই পঞ্চবটী ফ্লাইওভারটি চাষাঢ়া পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হলে যানজট নিরসনে বড় ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো: ওহিদুজ্জামান জানান, নির্মিত এ দ্বিতল সড়ক চালু হলে মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের সাথে রাজধানীর যানবাহন চলাচল আরো সহজ হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে যাতায়াতের সময় প্রায় ৬২ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমবে, যানবাহনের গড় গতি ৪ দশমিক ৪৫ গুণ বৃদ্ধি পাবে এবং যানজট বিলম্ব প্রায় ৭৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সাথে মুন্সীগঞ্জের সাথে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ আরো দ্রত, নিরাপদ ও ব্যয়সাশ্রয়ী হবে।
প্রকল্পটির ভারপ্রাপ্ত টিম লিডার প্রকৌশলী জহুরুল হক জানান, এরই মধ্যে দ্বিতল সড়কের তিন কিলোমিটার পিচঢালা লেয়ার হয়ে গেছে। দ্বিতল সড়কে ওঠার জন্য র্যাম্প তৈরির কাজও চলছে। সড়ককে সোলার লাইটও স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি নিচতলার কাজও চলছে।
টোল দিতে হবে ওপরতলার সড়কে : দ্বিতল সড়কটির উপরিভাগ ৩৬ ফুট প্রশস্ত ও দুইলেন বিশিষ্ট। বর্তমানে শেষ ধাপের কাজ হিসেবে টপ লেয়ার বিটুমিনাস কার্পেটিং ও রোড মার্কিংয়ের কাজ চলছে। চালু হওয়ার পর দ্বিতীয় তলায় চলাচলকারী যানবাহনকে টোল দিতে হবে। নিচতলার ৫৪ ফুট প্রশস্ত চারলেনের সড়ক টোলমুক্ত থাকবে। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক জানান, প্রস্তাবিত তালিকায় মোটরসাইকেলের টোল ২০ টাকা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ৫০ টাকা, প্রাইভেটকার ৮০ টাকা, মাইক্রোবাস ১০০ টাকা এবং বাস ৩০০ ও ৪০০ টাকা। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় তিন হাজার ৩১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে একটি চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রকল্পের আওতায় ১০ দশমিক ৮১৩ কিলোমিটার এট-গ্রেড (সমতল) সড়ক প্রশস্তকরণ, ৯ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার এলিভেটেড সড়ক ও র্যাম্প নির্মাণ, চারটি টোল প্লাজা, পাঁচটি ওজন স্কেল, কাশিপুর ও গোগনগর সেতু প্রশস্তকরণ, একটি আরসিসি সেতু, একটি ট্রাক স্ট্যান্ড এবং দু’টি নন-মোটরাইজড যানবাহন পার্কিং নির্মাণ করা হচ্ছে।
প্রকল্পের ডেপুটি টিম লিডার জহুরুল হক জানান, ২৩ জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত কাজ শেষ হয়েছে। তিনি জানান, ১২১টি এক্সপানশন জয়েন্টের মধ্যে একটি স্থাপন করা হয়েছে এবং বাকিগুলোর কাজ চলছে। ৫৮৬টি সোলার প্যানেলের মধ্যে ৩৪২টি স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। আট হাজার ৫৬ মিটার অ্যাসফল্ট কাজের মধ্যে দুই হাজার ৭২৭ মিটার সম্পন্ন হয়েছে। অন্যান্য কাজের মধ্যে সাত হাজার ৪০০ মিটার এইচডিপিই পাইপ স্থাপন হবে। এর মধ্যে সাত হাজার ২১৫ মিটার স্থাপন হয়েছে। আট হাজার ১১ মিটার ড্রেনেজ পাইপ স্থাপনের মধ্যে ছয় হাজার ৬২২ মিটারের কাজ শেষ হয়েছে।
এ্যাট-গ্রেড সড়কের বিভিন্ন অংশেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আট হাজার ৫৬ মিটার অ্যাসফল্ট কাজের মধ্যে দুই হাজার ৭২৭ মিটার সম্পন্ন হয়েছে। আর-৮১২ (মেইন রোড) অংশে ১৬ হাজার ৭৯২ মিটার সিসি কাজের মধ্যে ১৫ হাজার ২৮৪ মিটার এবং আরসিসি কাজের মধ্যে ১৪ হাজার ৯৪৬ মিটার সম্পন্ন হয়েছে। আর-৮১০ (চাষাঢ়া-ফতুল্লা) অংশে দুই হাজার ৪০০ মিটার সিসি কাজের এক হাজার ২৫৮ মিটার এবং আরসিসি কাজের এক হাজার ২৩৯ মিটার সম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের শিল্পনগরী ফতুল্লার বিসিক শিল্প এলাকায় প্রায় সাত শতাধিক শিল্পকারখানা রয়েছে। একই সাথে বিসিক থেকে মুক্তাপুর পর্যন্ত প্রায় তিন শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আর এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রায় চার লাখ শ্রমিক কাজ করেন। পাশাপাশি মুক্তারপুরে পাঁচটি সিমেন্ট কারখানাসহ ছয়টি হিমাগার থাকায় মুক্তারপুর-পঞ্চবটী সড়কে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। এসব যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে যোগসূত্র স্থাপন করবে।
নারায়ণগঞ্জ বিসিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বিকেএমইএ সহসভাপতি মোরশেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, যে কোনো দেশের জন্য যাতায়াতব্যবস্থার উন্নতি হলে সব ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়। তেমনিভাবে পঞ্চবটী-মুক্তারপুর সড়কের মধ্যে দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে। তবে মুন্সীগঞ্জের সাথে নারায়ণগঞ্জের আগে থেকেই যোগাযোগ রয়েছে। নতুন করে আলাদাভাবে উল্লেখ করার মতো ব্যবসার উন্নতি ঘটবে এরকম নয়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








