চলচ্চিত্র ‘ফ্রাঙ্ক অ্যান্ড পার্সি’তে পরিণত বয়সের প্রেম
চলচ্চিত্র ‘ফ্রাঙ্ক অ্যান্ড পার্সি’তে পরিণত বয়সের প্রেম।

 আলমগীর কবির
বয়সের ভার, একাকিত্ব আর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নতুন করে ভালোবাসার সন্ধান; এই তিনের মেলবন্ধনে নির্মিত হয়েছে ব্রিটিশ চলচ্চিত্র ‘ফ্রাঙ্ক অ্যান্ড পার্সি’। দুই বর্ষীয়ান অভিনেতা ইয়ান ম্যাককেলেন ও রজার অ্যালামের অভিনয়ে সমৃদ্ধ এই রোমান্টিক কমেডিতে উঠে এসেছে পরিণত বয়সের প্রেম, বন্ধুত্ব এবং মানুষের সাথে মানুষের গভীর সম্পর্কের গল্প। মৃদু হাস্যরস, আবেগ আর লন্ডনের নান্দনিক দৃশ্যপট নিয়ে নির্মিত ছবিটি দর্শকদের সামনে ভালোবাসার এক কোমল অথচ ব্যতিক্রমী অধ্যায় তুলে ধরে।
ডেভ ক্যালহাউনের চলচ্চিত্রবিষয়ক সাময়িকী ‘স্ক্রিন ডেইলি’তে ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত পর্যালোচনায় ছবিটিকে হৃদয়গ্রাহী ও মৃদু মেজাজের রোমান্টিক কমেডি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পর্যালোচকের মতে, ছবিটির চিত্রনাট্যে নাটকীয় ভারসাম্যের ঘাটতি, অতিরিক্ত আবেগনির্ভর সঙ্গীত এবং লন্ডনের অতিরিক্ত রোমান্টিক উপস্থাপনা কিছু দুর্বলতা তৈরি করেছে। তা সত্ত্বেও দুই প্রধান অভিনেতার আন্তরিক রসায়ন ও সম্পর্কের কোমলতা সেই সীমাবদ্ধতার অনেকটাই আড়াল করে দেয়।
শন ম্যাথিয়াস পরিচালিত ১০৯ মিনিটের ছবিটি ২০২৬ সালের নির্মাণ। এর চিত্রনাট্য লিখেছেন মার্টিন শেরম্যান। বেন ওয়েদারিলের ২০২৩ সালের একই নামের মঞ্চনাটক অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রটিতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইয়ান ম্যাককেলেন ও রজার অ্যালাম। তাদের পাশাপাশি রয়েছেন জোয়ানা লামলি, স্টিফেন ফ্রাই, ডেরেক জ্যাকোবি ও জেসিকা গানিং। লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির বিশ্ব প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে ছবিটি মুক্তি দেবে আইকন ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউশন।
ছবিটির গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন ফ্রাঙ্ক ও পার্সি। ফ্রাঙ্ক একজন বিপতœীক, অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক। তার বয়স ৭৭ বছর। অন্যদিকে আশির কোঠা পেরোনো পার্সি একজন সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও লেখক, যিনি এখনো কর্মজীবনে সক্রিয়। অতীতে তার দীর্ঘমেয়াদি একটি সম্পর্ক ছিল। দুই ব্যক্তির জীবনযাপন, অভিজ্ঞতা ও মানসিক অবস্থার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও তাদের মধ্যে একটি বিষয়ে মিল রয়েছে জীবনের এই পর্যায়ে এসে দুজনেরই প্রয়োজন সাহচর্য ও মানসিক সংযোগ।
দুই চরিত্রের প্রথম দেখা হয় তাদের পোষা কুকুরকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়ে। ফ্রাঙ্কের কুকুর টফি এবং পার্সির কুকুর ব্রুনো যেন দুই মানুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠার উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। এরপর লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড হিথ এলাকায় নিয়মিত হাঁটাহাঁটির মধ্য দিয়ে তাদের পরিচয় গভীর হয়। সব ধরনের আবহাওয়ায় একসাথে হাঁটা, কথা বলা, কফি পান কিংবা অবসর কাটানোর মধ্য দিয়ে তারা পরস্পরের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকেন। ফ্রাঙ্কের জীবনে বয়সজনিত দুর্বলতা নিয়ে অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তার সাথে বসবাসকারী এক তরুণী ভাড়াটে তাকে এমন একজন মানুষ হিসেবে দেখেন, যিনি জীবনের শেষ বয়সে পৌঁছে যাচ্ছেন। অন্যদিকে পার্সি নিজের বয়সের সাথে মানানসই সম্পর্কের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চান না। তরুণ ও বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে পরিচয় ও সম্পর্ক তৈরির উদ্দেশ্যে তৈরি ‘পাপা সার্চ’ নামের একটি অ্যাপ ব্যবহার করে তিনি নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করেন। ছবিতে তার দু’টি সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্ম দেয়। কিন্তু ফ্রাঙ্কের সাথে পরিচয়ের পর পার্সির জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। পার্কের একটি বেঞ্চে পার্সির চুম্বনের মধ্য দিয়ে তাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বের সীমা অতিক্রম করে অন্য দিকে মোড় নেয়। এরপর দুজনকেই নিজেদের জীবনের অতীত, বর্তমান এবং নতুন সম্পর্কের বাস্তবতার সাথে সমঝোতা করতে হয়। বিশেষ করে ফ্রাঙ্কের জন্য বিষয়টি সহজ নয়। কারণ এর আগে কোনো পুরুষের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল না। ফলে নতুন এই অনুভূতিকে গ্রহণ করার পাশাপাশি নিজের পরিচয় ও আবেগকে বুঝে নেয়ার প্রশ্নও সামনে আসে।
তবে ‘ফ্রাঙ্ক অ্যান্ড পার্সি’র বিশেষত্ব হলো, নির্মাতারা এই সম্পর্ককে বড় কোনো সঙ্কট কিংবা অতিনাটকীয় সঙ্ঘাতের মধ্য দিয়ে এগিয়ে নেননি। বরং তাদের দৈনন্দিন জীবন, ছোটখাটো অস্বস্তি, কথোপকথন এবং একে অপরের সান্নিধ্যে স্বস্তি খুঁজে পাওয়ার মুহূর্তগুলোই গল্পের মূল আকর্ষণ। দুই মানুষের বয়স বাড়লেও তাদের ভালোবাসা, আকাক্সক্ষা ও শারীরিক ঘনিষ্ঠতার প্রয়োজন যে শেষ হয়ে যায় না, ছবিটি সেই সত্যকে স্বাভাবিকভাবে তুলে ধরেছে।
পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ম্যাককেলেন ও অ্যালামের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের স্বতঃস্ফূর্ততা। দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা চরিত্র দুটিকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যেন দর্শক পর্দায় অভিনয় দেখছেন না; বরং বাস্তব জীবনের দুই মানুষের কথোপকথন প্রত্যক্ষ করছেন। তাদের একসাথে হাঁটা, কফি পান, বিছানায় শুয়ে গল্প করা কিংবা নিছক সময় কাটানোর দৃশ্যগুলোতে সম্পর্কের স্বাভাবিকতা ও আন্তরিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ছবিতে পার্শ্বচরিত্রেরও উপস্থিতি রয়েছে। স্টিফেন ফ্রাই অভিনয় করেছেন পার্সির সাবেক সঙ্গীর ভূমিকায়, আর জোয়ানা লামলি রয়েছেন ফ্রাঙ্কের সাবেক শ্যালিকার চরিত্রে। তবে পর্যালোচকের মতে, এই উপকাহিনিগুলো যথেষ্ট গভীরতা পায়নি। মূল মঞ্চনাটকে চরিত্রের সংখ্যা ছিল সীমিত। চলচ্চিত্রে গল্পের পরিসর বাড়াতে গিয়ে চিত্রনাট্যকার শেরম্যান কিছু অতিরিক্ত চরিত্র ও ঘটনা যুক্ত করেছেন, যার সবগুলো মূল গল্পের সঙ্গে সমানভাবে সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। ছবির কয়েকটি দৃশ্যেও এই সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ে। গর্ব ও আত্মপরিচয়ের উদ্যাপনে দুই চরিত্রের বিশেষ পোশাক পরার একটি পর্ব এবং তরুণ প্রজন্মের প্রেম ও যৌনতা নিয়ে তাদের হাস্যরসাত্মক মন্তব্যের দৃশ্য গল্পের গভীরতা বাড়ানোর বদলে কিছুটা কৃত্রিম মনে হয়েছে বলে পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে যৌনতা, বয়স এবং আবেগের জটিল বাস্তবতা নিয়ে আরো গভীরভাবে অনুসন্ধানের সুযোগ থাকলেও ছবিটি সে পথে খুব বেশি এগোয়নি।
চিত্রগ্রহণে ব্যবহার করা হয়েছে পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক দৃশ্যভাষা। ছবির বেশ কিছু দৃশ্যে মাঝখানের অংশ স্পষ্ট রেখে ফ্রেমের দুই পাশকে মৃদুভাবে ঝাপসা করা হয়েছে। এর ফলে পর্দায় এক ধরনের স্বপ্নময় ও আরামদায়ক আবহ তৈরি হয়। সঙ্গীতে বাঁশিজাতীয় কাঠের বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। তবে পর্যালোচকের মতে, আবেগঘন মুহূর্তগুলোতে সঙ্গীতের ব্যবহার কিছুটা বেশি হয়ে গেছে। লন্ডনের শরৎকালীন সৌন্দর্যকে ছবিতে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা শহরটিকে বাস্তবের চেয়ে কিছুটা বেশি রোমান্টিক ও মনোরম করে তোলে। ‘ফ্রাঙ্ক অ্যান্ড পার্সি’ ম্যাককেলেন, পরিচালক শন ম্যাথিয়াস ও চিত্রনাট্যকার মার্টিন শেরম্যানের দীর্ঘদিনের সৃজনশীল সহযোগিতারও নতুন অধ্যায়। আশির দশক থেকে ম্যাথিয়াস মঞ্চে বহুবার ম্যাককেলেনকে পরিচালনা করেছেন। চলচ্চিত্রেও তাদের একসাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০২৪ সালের ‘হ্যামলেট’ ছিল তাঁদের সাম্প্রতিক কাজগুলোর একটি। অন্যদিকে শেরম্যান ১৯৭৯ সালের ‘বেন্ট’ নাটকের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত, যেখানে অভিনয় করেছিলেন ম্যাককেলেন। এবার বেন ওয়েদারিলের মঞ্চনাটককে চলচ্চিত্রে রূপ দিতে আবারও একত্র হয়েছেন তারা।
ছবিটির সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা এর বিষয়বস্তুতে। প্রবীণ বয়সে প্রেম, যৌনতা ও সঙ্গী খোঁজার আকাক্সক্ষা নিয়ে সমাজে এখনো নানা সঙ্কোচ রয়েছে। ‘ফ্রাঙ্ক অ্যান্ড পার্সি’ সেই সঙ্কোচ ভেঙে দেখাতে চায়, বয়স বাড়ার সাথে মানুষের আবেগ কিংবা ভালোবাসার প্রয়োজন বিলুপ্ত হয় না।

Advertisement