মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার ঘোষণা

বিশেষ সংবাদদাতা
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর অবশেষে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নিয়োগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো: শরীফুল ইসলামের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, এবার শ্রমিকরা সরকারের তালিকাভুক্ত ও অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন। 
এ দিকে প্রত্যাশিত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার পর বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়ার জনশক্তি ব্যবসায়ীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস শুরু হয়েছে। তবে একই সাথে প্রতারকরাও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় শুধু বলছেন, তারা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার সরকারি ঘোষণা শুনেছেন। তবে এখনই এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় আসেনি। 
গত রাত ৭টার দিকে গুলশান উদয় টাওয়ারের একজন ব্যবসায়ী নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আমি এখন এফডব্লিওসিএমএসে’র ওয়েবসাইট দেখছি। মন্ত্রণালয় যে ঘোষণা দিয়েছে তার সাথে বাস্তবতার মিল পাচ্ছি না। মন্ত্রণালয় বলছে আগের সব মেডিক্যাল সেন্টার কাজ করতে পারবে। কিন্তু এখনো দেখছি ১৭টি মেডিক্যাল সেন্টারের নাম ভেসে রয়েছে। হয়তো রাতে পরিবর্তন হতে পারে। অপর এক ব্যবসায়ী দেশের বাইরে থেকে নয়া দিগন্তকে বলেন, শ্রমবাজার খোলার ঘোষণা সরকার দিয়েছে। তবে আমাদের এখনো এ নিয়ে কিছু বলার সময় আসেনি। 
গতকাল মন্ত্রণালয়ের ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় কার্যকর এবং একটি স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল ও ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে। শ্রমবাজারে আগে কি ব্যবস্থা ছিল, বর্তমান সরকার কী উদ্যোগ নিয়েছে, মালয়েশিয়ার সাথে আমাদের কী সমঝোতা হয়েছে, বাংলাদেশের প থেকে আমরা অতিরিক্ত কি সুযোগ নিশ্চিত করেছি এবং সামনে এই নিয়োগ ব্যবস্থা কিভাবে পরিচালিত হবে- সেগুলো বিস্তারিত বলা হয়েছে। 
এতে বলা হয়, ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক স্বারিত হয়েছিল, সেই সমঝোতা অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় তাদের নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন ও তালিকাভুক্ত করার বিধান রয়েছে। এ ধরনের যোগ্যতার মানদণ্ড শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়। মালয়েশিয়া যেসব উৎস দেশ থেকে কর্মী নিয়োগ করে, তাদের েেত্রও দেশটির নিজস্ব নীতিমালা ও যোগ্যতার শর্ত রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মালয়েশিয়ার নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। আলোচনার একপর্যায়ে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কিছু শর্তে নমনীয়তা দেখায়, কারণ প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত কয়েকটি শর্ত আমাদের অনেক রিক্রুটিং এজেন্সির পে পূরণ করা কঠিন ছিল। এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র ও সহায়ক দলিলসহ ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা মালয়েশিয়ার কর্তৃপরে কাছে পাঠানো হয়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহনের পর প্রধানমন্ত্রী বন্ধ ও সীমিত হয়ে যাওয়া বৈদেশিক শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালু এবং সম্প্রসারণের বিষয়টিকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেন। এর মধ্যে মালয়েশিয়াকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর তার প্রথম সরকারি বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নেন। সেই সফরে তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচনা করেন। আমাদের ল্য শুধু মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা নয়। আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে সর্বোচ্চ সংখ্যক বৈধ ও যোগ্য বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি কাজ করার সুযোগ পাবে এবং একইসঙ্গে আমাদের কর্মীদের স্বার্থ ও অভিবাসন ব্যয় সুরতি থাকবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, মালয়েশিয়া তাদের নিজস্ব যোগ্যতার ভিত্তিতে যে এজেন্সিগুলো তালিকাভুক্ত করবে, আমরা সেটিকে সম্মান জানাই। একই সাথে আমরা বাংলাদেশের অন্যান্য বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সিও যেন এই শ্রমবাজারে ব্যবসা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অংশগ্রহণের চেষ্টা করেছি। এর পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়ার কর্তৃপ তাদের নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল), ২৫টি বেসরকারি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি এবং আরো ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সি অর্থাৎ মোট ৩৩৮টি এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। এটি মালয়েশিয়ার নিজস্ব নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সি নিজেদের উদ্যোগে নিয়োগকর্তা খুঁজে বের করতে পারবে; নিজেদের জব ওর্ডার বা ডিমান্ড সংগ্রহ করতে পারবে; বাংলাদেশে নিজেদের কর্মী নির্বাচন করতে পারবে এবং নিয়ম অনুযায়ী সেই কর্মীদের নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে মালয়েশিয়ার কর্তৃপ ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (জিরো কস্ট) নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছে। মালয়েশিয়ার কর্তৃপ কর্তৃক অনুমোদিত সব বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার থেকে  নিজেদের উদ্যোগে ঔড়ন ঙৎফবৎ বা উবসধহফ সংগ্রহ করতে পারবে। যে এজেন্সি জব অর্ডার সংগ্রহ করবে, সেই এজেন্সি বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুসরণ করে নিজের কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। অর্থাৎ কর্মী সংগ্রহ ও নির্বাচন করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির নিজের কাছেই থাকবে। মালয়েশিয়ার কর্তৃপ কর্তৃক অনুমোদিত প্রতিটি বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সি তার নিজের রিক্রুটিং লাইসেন্সের মাধ্যমেই তার নিজস্ব কর্মীদের বিএমইটি কিয়ারেন্স সম্পন্ন করতে পারবে। আগ্রহী কর্মীরা তালিকাভুক্ত ও অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে এবং অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টার থেকে স্বাস্থ্য পরীা করাতে পারবে। এ েেত্র কোনও নির্দিষ্ট মেডিক্যাল সেন্টারকে এককভাবে স্বাস্থ্য পরীা পরিচালনার সুযোগ দেয়া হবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 
এ বিষয়ে গত রাতে একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সীর মালিক জানান, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে প্রতারক ও দালাল চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে তাদের প্রলোভনে পড়ে লাখ লাখ পাসপোর্ট বিভিন্ন এজেন্সীতে আটকা পড়ে আছে, সাথে জামানতের টাকাও। মালয়েশিয়া থেকে যে পরিমান চাহিদা আসতে পারে তার শতগুণ বেশি পাসপোর্ট এই দালালরা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে রেখেছে। পরবর্তীতে এসব বিদেশগামীর বেশির ভাগই প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে অভিবাসন বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

Advertisement