
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালাবে না যুক্তরাষ্ট্র। তবে নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। এ দিকে মধ্যপ্রাচ্যে আরো সামরিক শক্তি পাঠাচ্ছে ওয়াশিংটন। অন্য দিকে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে ইরানের হামলা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে দুই দেশের সঙ্ঘাত নিরসনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও সামরিক উত্তেজনা কমার লণ নেই। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের সাথে অচলাবস্থা ভাঙতে ট্রাম্পের হাতে সামরিক বিকল্প কী রয়েছে এবং প্রতিটি পদেেপর সম্ভাব্য মূল্য কতটা? আলজাজিরার এক বিশ্লেষণে সামরিক বিশেষজ্ঞদের বরাতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে প্রধানত তিনটি পথ রয়েছেÑ ইরানের ওপর নৌ অবরোধ ও চাপ অব্যাহত রাখা, নতুন করে বিমান ও পেণাস্ত্র হামলা শুরু করা এবং সীমিত স্থল অভিযান চালানো। তবে প্রতিটি বিকল্পেরই রয়েছে উল্লেখযোগ্য সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি।
যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। এর জবাবে পরবর্তী মাসগুলোতে উপসাগরীয় দেশগুলো ও জর্দানে মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং বিভিন্ন অবকাঠামো ল্য করে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। একই সাথে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) অন্তত ২০ শতাংশ পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় তেহরান। এতে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। যুদ্ধ শুরুর আগের দিন আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেল-প্রতি প্রায় ৭২ ডলার। পরে তা বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছায়। গত বৃহস্পতিবার দাম ছিল প্রায় ১০৪ ডলার। জুনে হওয়া যুদ্ধবিরতি হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে ভেঙে পড়ে। এরপর ইরানের দণিাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ বজায় রাখে যুক্তরাষ্ট্র। অন্য দিকে প্রণালী দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা জাহাজে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় পরো আলোচনা চললেও গত মাসে প্রণালী খুলে দেয়ার বিষয়ে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ট্রাম্প। ব্রিটেনের লাফবরো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক এবং রয়্যাল এয়ার ফোর্সের সাবেক কর্মকর্তা আফজাল আশরাফ আলজাজিরাকে বলেন, সামরিক সমতায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের তুলনা চলে না; কিন্তু সেই বিপুল সমতা কাজে লাগিয়েও ওয়াশিংটন কাক্সিক্ষত ফল অর্জন করতে পারেনি।
বিকল্প এক : নৌ অবরোধ ও সামরিক চাপ অব্যাহত রাখা
বিশেষজ্ঞদের মতে, আপাতত এ পথেই এগোনোর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ বজায় রাখতে পারে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজকে নৌবাহিনী পাহারা দিতে পারে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন হরমুজ প্রণালী দিয়ে গড়ে প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত। এগুলোতে গড়ে এক কোটি ৭১ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হতো। মার্চে প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই চলাচল ভেঙে পড়ে। জাহাজ চলাচল পর্যবেণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় সেপ্টেম্বরে ইরান ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল পরিবহন যুদ্ধপূর্ব মাত্রার ৮১ শতাংশের বেশি হয়েছিল। তবে ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় পরিস্থিতির আবার অবনতি হয়েছে। গত ১১ অক্টোবর প্রণালী দিয়ে মাত্র ২৯ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়, যা ওই মাসের সর্বনিম্ন। বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ন্যাটোর সাবেক গবেষণা বিশ্লেষক প্যাট্রিক বুরি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রণালীর দণি-পশ্চিম অংশে টহল ও নজরদারি বাড়িয়ে জাহাজগুলোকে কিছুটা নিরাপত্তা দিতে পারে। ড্রোনের মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও হামলা চালানোয় ব্যয় তুলনামূলক কম হচ্ছে। তবে ইরানও কৌশল বদলেছে। ব্রিটেনের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ৬ থেকে ১৪ অক্টোবরের মধ্যে জাহাজে ১৫টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা কাজে লাগিয়ে তুলনামূলক কম খরচে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারছে তেহরান।
বিকল্প দুই : নতুন করে বিমান ও পেণাস্ত্র হামলা
নির্বাচনের পর ইরানে বোমা হামলা বাড়ানোর সম্ভাবনা নাকচ করেননি ট্রাম্প। পরিস্থিতির অবনতি হলে ইরানের উপকূলীয় এলাকা ও দেশের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট ল্যবস্তুতে সীমিত পরিসরে নতুন হামলা চালানো হতে পারে বলে মনে করেন প্যাট্রিক বুরি। তবে আগের হামলার তুলনায় এবার কম ফল পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আফজাল আশরাফের মতে, ইরান অস্ত্রের সংখ্যা কমিয়ে আনলেও সেগুলো আরো ভালোভাবে আড়াল করার সমতা অর্জন করেছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল প্রতিরাব্যবস্থার পেণাস্ত্রের মজুদও কমে এসেছে। ইরানের তুলনামূলক সস্তা একটি ড্রোন বা পেণাস্ত্র ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে ১০ লাখ ডলার বা তার বেশি দামের প্রতিরোধী পেণাস্ত্র ব্যবহার করতে হতে পারে।
যুদ্ধ চলাকালে ইরানের বিরুদ্ধে এক হাজারের বেশি টমাহক ক্রুজ পেণাস্ত্র ছুড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের (সিএসআইএস) হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের আগের মজুদ পুরোপুরি পুনর্গঠন করতে ২০৩০ সালের শেষ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য গোলাবারুদের মজুদ আগের পর্যায়ে ফেরাতেও তিন থেকে চার বছর লাগতে পারে বলে ধারণা করছেন প্যাট্রিক বুরি। নতুন হামলা হলে পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ গত মাসে ঘোষণা করেন, ‘সমানুপাতিক জবাবের’ যুগ শেষ হয়েছে। এ ছাড়া নতুন সঙ্ঘাতের ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সামরিক ঘাঁটিতে প্রবেশাধিকারও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিকল্প তিন : খার্গ দ্বীপে সীমিত স্থল অভিযান
ইরানের তেল রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশ পরিচালিত হয় খার্গ দ্বীপ দিয়ে। দেশটির উপকূল থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপ দখল করা যুক্তরাষ্ট্রের একটি সম্ভাব্য সামরিক বিকল্প। সাবেক মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড-প্রধান জোসেফ ভটেল বলেছেন, ৮০০ থেকে এক হাজার সেনা দিয়ে দ্বীপটি দখল করা সম্ভব হতে পারে। তবে মূল ভূখণ্ড থেকে ইরানি বাহিনীর হামলার মুখে মার্কিন সেনারা অত্যন্ত ঝুঁকিতে পড়বেন। আশরাফের মতে, ইরানের প্রতিরাব্যবস্থা অকার্যকর করতে ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মাধ্যমে অভিযান শুরু করা সম্ভব; কিন্তু দ্বীপ দখলের পর সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের ওপর ইরানের হামলার ঝুঁকি থাকবে। পাল্টা হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল অবকাঠামোতেও হামলা চালাতে পারে তেহরান। ইতোমধ্যে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা একটি যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি রাজনৈতিক চাপ আরো বাড়াবে। এ কারণে খার্গ দ্বীপ দখলকে অত্যন্ত অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন আশরাফ।
পূর্ণাঙ্গ স্থলযুদ্ধের সম্ভাবনা কম
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানে পূর্ণমাত্রার স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনা আরো কম। ট্রাম্পও স্থলযুদ্ধের বিষয়টি অনেকটাই নাকচ করেছেন। মার্চে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন, ল্য অর্জনে স্থলসেনার প্রয়োজন হবে না। প্যাট্রিক বুরির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পে এমন অভিযান চালানো বাস্তবসম্মত নয়। বিপুল সামরিক সমতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি স্থলযুদ্ধের ব্যয় ও ঝুঁকি ওয়াশিংটনের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নির্বাচনের হিসাব ও আঞ্চলিক অস্থিরতা
যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয়। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে প্রায় ৬৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক অসন্তুষ্ট। ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় নতুন সামরিক অভিযানের রাজনৈতিক মূল্যও তাকে বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মজুদ পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদে শক্তি পুনরুদ্ধার করাও বড় চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিও তত বাড়বে। রোববার ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি বলেন, হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে পরিচালিত জাহাজ চলাচলের উদ্যোগে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতি রাতেই হামলা চালাচ্ছে তেহরান। তার ভাষায়, ‘আপনারা চোরাচালান করছেন; কিন্তু প্রণালী ইরানের নিয়ন্ত্রণে।’ তাই বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সামরিক চাপ বাড়ানোর একাধিক পথ থাকলেও কোনোটিই সহজ সমাধান দিচ্ছে না। নৌ অবরোধে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হতে পারে, নতুন হামলায় পেণাস্ত্রের মজুদ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা আরো চাপে পড়তে পারে, আর স্থল অভিযান ডেকে আনতে পারে বড় ধরনের প্রাণহানি ও রাজনৈতিক সঙ্কট। ফলে ট্রাম্পের জন্য সামরিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








