অর্থবছরের প্রথম মাসেই পৌনে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ সরকারের

বিশেষ সংবাদদাতা 

Advertisement

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতেই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১৯ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা নিট ঋণ নিয়েছে সরকার। পুরো অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নিট এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এক মাসেই সংগৃহীত হয়েছে প্রায় ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আগের অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণ বেড়েছে ৫০৬ দশমিক ৬ শতাংশ। 
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের অর্থ ও ব্যাংকিং উইংয়ের গতকাল প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, জুলাইয়ে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৫৭৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই মাসে এর পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৫৬৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অন্য দিকে সঞ্চয়পত্রসহ ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণ কমেছে। 
অর্থবছরের শুরুতেই সরকারি ঋণের এমন বৃদ্ধি রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান, ব্যাংক খাতের তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে এক মাসের তথ্য দিয়ে পুরো অর্থবছরের ঋণচিত্র বা রাজস্ব ঘাটতির প্রবণতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না। 
এক মাসেই লক্ষ্যমাত্রার ১৫.৫ শতাংশ 
সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নিট এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি এবং ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। 
বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া উপাত্ত অনুযায়ী, জুলাইয়ে সরকারের মোট নিট অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৬৬৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই মাসে এই পরিমাণ ছিল আট হাজার ৫২৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা; অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মাসিক নিট ঋণ গ্রহণ বেড়েছে ১৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। 
জুলাইয়ের ঋণ গ্রহণে ব্যাংকিং খাতের অবদানই ছিল প্রধান। বিপরীতে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে নিট ঋণ গ্রহণ আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। ফলে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ সংগ্রহের কাঠামো আরো বেশি ব্যাংকনির্ভর হয়ে পড়েছে। 
ব্যাংকনির্ভরতা বাড়ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ কমেছে 
জুলাইয়ে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৫৭৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের স্থিতি একই সময়ে ৬৪৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা কমেছে। এর মধ্যে ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্স (ডব্লিউএমএ) কমেছে এক হাজার ১৭৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। 
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ গ্রহণের পরিবর্তে সরকার মূলত ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্যান্য উৎসের ওপর নির্ভর করেছে। তবে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ কমেছে বলেই অর্থায়নে নতুন টাকা সৃষ্টি পুরোপুরি বন্ধ হয়েছেÑ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। সামগ্রিক অর্থ সরবরাহ, ব্যাংকের ব্যালান্সশিট এবং ঋণ পরিশোধের তথ্যও বিবেচনায় নিতে হবে। 
সরকারি সিকিউরিটির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড। জুলাইয়ে ট্রেজারি বিলের নিট স্থিতি বেড়েছে চার হাজার ৯১৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং ট্রেজারি বন্ডের নিট স্থিতি বেড়েছে ছয় হাজার ৭৪৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি বন্ডে তিন হাজার ২৯৫ কোটি ৬০ লাখ এবং ১০ বছর মেয়াদি বন্ডে এক হাজার ৯০৯ কোটি ৬০ লাখ টাকার নিট বৃদ্ধি হয়েছে। 
সরকারি সিকিউরিটি  বিক্রির মাধ্যমে ঋণ নেয়া বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের স্বাভাবিক উপায়। কিন্তু স্বল্প সময়ে বড় অঙ্কের ঋণ সংগ্রহের ফলে সুদের হার, ব্যাংকের তারল্য এবং বেসরকারি খাতে অর্থায়নের ওপর কী প্রভাব পড়ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। 
সঞ্চয়পত্রে চিত্র মিশ্র
ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণ জুলাইয়ে কমে চার হাজার ৯২ কোটি ৪০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের একই মাসে এর পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৯৫৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। 
তবে সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্প থেকে জুলাইয়ে নিট ঋণ এসেছে দুই হাজার ৫৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আগের বছরের একই মাসে এ পরিমাণ ছিল এক হাজার ২৯৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। 
পারিবারিক সঞ্চয়পত্র থেকে নিট এক হাজার ৬৭০ কোটি ২০ লাখ টাকা এসেছে। তিন মাস মেয়াদি সঞ্চয়পত্র থেকে এসেছে ২৫১ কোটি ৪০ লাখ এবং পেনশনভোগী সঞ্চয়পত্র থেকে ৩২০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বিপরীতে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে ১৮২ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং পোস্ট অফিস সঞ্চয় ব্যাংকে ২২ কোটি টাকা ঋণাত্মক নিট প্রবাহ দেখা গেছে; অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট খাতে নিট বিক্রির তুলনায় নগদায়ন বা অর্থ প্রত্যাহারের পরিমাণ বেশি ছিল। 
সুতরাং সামগ্রিক ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ কমলেও সঞ্চয়পত্রের নিট আহরণ বেড়েছে। এই পার্থক্য থেকে সঞ্চয়পত্রের প্রতি জনগণের আগ্রহ কমে যাওয়ার সরল সিদ্ধান্ত টানা ঠিক হবে না; বরং বিভিন্ন সঞ্চয়পণ্যের বিক্রি, মেয়াদপূর্তি, নগদায়ন ও সুদহারের পৃথক প্রবণতা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। 
সুকুক ও ইসলামী বিনিয়োগ বন্ড 
শরিয়াহভিত্তিক সরকারি সিকিউরিটির ক্ষেত্রেও ঋণ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। জুলাই ২০২৬ শেষে বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুকের মোট বকেয়া স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের সিকিউরিটি অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। 
অন্য দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট বন্ডের ক্ষেত্রে জুলাইয়ে ১ হাজার ৫৮ কোটি ৮০ লাখ টাকার নিট স্থিতির তথ্য দেয়া হয়েছে। তবে এই অঙ্কটি নিট ইস্যু, লেনদেন নাকি নির্দিষ্ট তহবিলের স্থিতিÑ তা মূল সারণি থেকে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। 
জুলাই শেষে সরকারের মোট বকেয়া অভ্যন্তরীণ ঋণের স্থিতি ১১ লাখ ৭৫ হাজার ৫৮২ কোটি ৬০ লাখ টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এ অঙ্কের সংজ্ঞা ও অন্তর্ভুক্ত ঋণশ্রেণী যাচাই করে প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে নিট ঋণ গ্রহণের মাসিক প্রবাহের সাথে মোট বকেয়া ঋণের স্থিতিকে গুলিয়ে ফেলা না হয়। 
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ 
সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ বাড়লে অর্থনীতিতে কয়েকটি সম্ভাব্য প্রভাব তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তির ওপর চাপ। ব্যাংকগুলো যদি সরকারি সিকিউরিটিতে অধিক অর্থ বিনিয়োগ করে এবং সেই কারণে বেসরকারি ঋণের জন্য তহবিল বা ঝুঁকি নেয়ার সমতা সীমিত হয়, তাহলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অর্থনীতিতে এ পরিস্থিতিকে ‘ক্রাউডিং আউট’ বলা হয়। 
তবে সরকারি ঋণ বাড়লেই বেসরকারি ঋণ কমবে, এমনটি অবধারিত নয়। ব্যাংকের অতিরিক্ত তারল্য, আমানত প্রবৃদ্ধি, ঋণের চাহিদা, সরকারি সিকিউরিটির সুদহার এবং বেসরকারি খাতের ঋণঝুঁকির ওপর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করে। তাই সরকারি ঋণের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ ও বিনিয়োগের ধারাবাহিক তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। 
দ্বিতীয় উদ্বেগ হলো সুদ ব্যয়। ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ বাড়লে সরকারের ভবিষ্যৎ সুদ পরিশোধের দায় বাড়তে পারে। বিশেষত দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের ক্ষেত্রে সুদের হার ও মেয়াদ অনুযায়ী ব্যয়ের প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে বাজেটে বহন করতে হয়। তবে সুদ ব্যয়ের প্রকৃত পরিবর্তন নির্ধারণে নতুন ঋণের সুদহার, পুরনো ঋণের মেয়াদপূর্তি এবং ঋণ পুনঃঅর্থায়নের শর্ত বিবেচনা করা জরুরি।
তৃতীয়ত, অর্থবছরের প্রথম মাসেই বার্ষিক ঋণ লক্ষ্যমাত্রার ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ গ্রহণ রাজস্ব ও ব্যয়ের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। তবে এ প্রবণতা রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির কারণেই ঘটেছে, নাকি আগাম ব্যয়, বকেয়া বিল পরিশোধ কিংবা ঋণের মেয়াদ ও নগদ ব্যবস্থাপনার কারণে হয়েছে, তা নির্ধারণে সরকারি রাজস্ব আদায়, ব্যয় এবং নগদ স্থিতির তথ্য প্রয়োজন। 
রাজস্ব বাড়ানো ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় জোর প্রয়োজন 
সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, কর ফাঁকি কমানো, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও অগ্রাধিকার পুনর্মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে ঋণের মেয়াদ, সুদ ব্যয় ও উৎসের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে কার্যকর ঋণ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও বেসরকারি বিনিয়োগের মন্থরতার প্রেক্ষাপটে সরকারের ঋণ চাহিদা যেন উৎপাদনশীল খাতের অর্থায়নকে অযথা সঙ্কুচিত না করে, সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সতর্ক থাকা জরুরি। এ জন্য সরকারি ঋণ গ্রহণের পাশাপাশি বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি, ব্যাংকের তারল্য, সরকারি সিকিউরিটির সুদহার এবং সুদ পরিশোধের বাজেটীয় চাপ নিয়মিত প্রকাশ ও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। 
জুলাইয়ের পরিসংখ্যান সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ সংগ্রহে ব্যাংকিং খাতের ওপর বাড়তি নির্ভরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই প্রবণতা সাময়িক নাকি পুরো অর্থবছরজুড়ে অব্যাহত থাকবে, তা স্পষ্ট হবে পরবর্তী মাসগুলোর ঋণ, রাজস্ব ও ব্যয়ের তথ্য প্রকাশের পর।