১৫ বছর পর টি-বন্ডের বাইব্যাক, সাড়া পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক

 বিশেষ সংবাদদাতা

Advertisement

দীর্ঘ ১৫ বছর পর ট্র্যাজারি বন্ড পুনঃক্রয় বা ‘বাইব্যাক’ প্রক্রিয়ায় ফিরলেও বন্ডহোল্ডার বা বিনিয়োগকারীদের কাক্সিক্ষত সাড়া পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। উচ্চ সুদের হার এবং মেয়াদের সময়সীমা একদম শেষপর্যায়ে হওয়ায় মাত্র ৩০ শতাংশ বন্ড ক্রয়ের প্রস্তাব জমা পড়েছে।
গতকাল  বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এ নিলামে ২ বছর মেয়াদি উচ্চ ফলনশীল সরকারি ট্রেজারি বন্ডটি কিনে নেয়ার জন্য দরপত্র আহ্বান করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে মোট ২,০১৬.১৮ কোটি টাকার ৫৬টি বিড বা বিক্রয় প্রস্তাব জমা পড়ে, যা বন্ডটির মোট বকেয়া পরিমাণ ৬,৬৬৬.৫৮ কোটি টাকার ৩০.২ শতাংশ। প্রাপ্ত দরপত্রের মধ্য থেকে ১,৭১৬.১৪ কোটি  টাকার (২৫.৭ শতাংশ) প্রস্তাব গ্রহণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অবশিষ্ট প্রায় ৩০০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত দর নিলাম কমিটির নির্ধারিত ইয়েল্ড শর্ত পূরণ না করায় বাতিল করা হয়। ফলে বন্ডটির মূল পরিমাণের প্রায় ৭৪ শতাংশ অর্থাৎ চার হাজার ৯৫০ কোটি টাকা আগামী নভেম্বরে মেয়াদ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অপরিশোধিত থাকছে।
আইএসআইএন নম্বরে ‘ইউ০৯২৬১৯১০২৬’ চিহ্নিত এই বন্ডটি ২০০৪ সালের ৬ নভেম্বর ১২.৩০ শতাংশ বার্ষিক কুপন হারে ইস্যু করা হয়েছিল। আগামী ৬ নভেম্বর এটি মেয়াদ পূর্ণ (গধঃঁৎব) করতে যাচ্ছে। আগামী ১২ অক্টোবর বাইব্যাক নিষ্পত্তির চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হলেও মাত্র এক মাস আগে তা বিক্রিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ সুদের হার (১২.৩০%) এবং মাত্র কয়েক সপ্তাহ মেয়াদ বাকি থাকায় বিনিয়োগকারীরা এতে ঝুঁকিহীন আকর্ষণীয় রিটার্ন পাচ্ছেন। এ মুহূর্তে বন্ড বিক্রি করে দিলে মেয়াদ শেষের আগেই কুপন পেমেন্ট হারাতে হবে এবং সেই অর্থ বাজারে তুলনামূলক কম সুদে পুনরায় বিনিয়োগ করতে হবে। এ কারণেই মূলত ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বন্ডটি বিক্রি করতে আগ্রহী হয়নি।
উল্লেখ্য, রিভার্স নিলামের  মাধ্যমে এই ক্রয় প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়, যেখানে বিক্রেতারা ব্যাংককে তাদের বিক্রয়মূল্য প্রস্তাব করেন। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের সিকিউরিটিজ বাইব্যাক করেছিল।
এ দিকে অর্থমন্ত্রণালয় থেকে দাবি করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরকারি ট্রেজারি বন্ড পুনঃক্রয় নিলাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরো আধুনিক, সক্রিয় ও বাজারভিত্তিক করার অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার এ পুনঃক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
অর্থ বিভাগের পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক এ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। সরকারি সিকিউরিটিজ পুনঃক্রয় হলো এমন একটি আধুনিক ঋণ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে সরকার বিদ্যমান সরকারি সিকিউরিটিজের মেয়াদপূর্তির আগেই বাজার থেকে তা পুনঃক্রয় করতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দায় ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকারি সিকিউরিটিজ পুনঃক্রয়ের মাধ্যমে ঋণের মেয়াদপূর্তিতে এককালীন অর্থ পরিশোধের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সাথে সরকারের পুনঃঅর্থায়ন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ পরিশোধের সময়সূচি আরো সুষম করা সম্ভব হবে।
এ কার্যক্রমের ফলে সরকারি সিকিউরিটিজের বাজারে দক্ষতা বাড়ানোরও সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরো সক্রিয়, আধুনিক ও বাজারভিত্তিক করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, সরকারি ঋণের ব্যয় ও ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, ঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং সরকারি সিকিউরিটিজের বাজার উন্নয়নে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথমবারের মতো পুনঃক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
সরকারের মধ্যমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশলের উদ্দেশ্যের সাথেও এ কার্যক্রম সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভবিষ্যতে বাজার পরিস্থিতি, সরকারের নগদ অর্থের অবস্থান এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় আরো জানিয়েছে, ভবিষ্যতে বাজার পরিস্থিতি, তারল্য, বিনিয়োগকারীদের চাহিদা এবং সরকারি ঋণের কাঠামো বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি সিকিউরিটিজ পুনঃক্রয় নিলাম পরিচালনা করা হবে।
সরকারের এ উদ্যোগের ফলে সরকারি ঋণের পরিশোধ ব্যবস্থাপনা আরো সুশৃঙ্খল হওয়ার পাশাপাশি আকস্মিক বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধের চাপ কমবে বলে মনে করছে অর্থ বিভাগ।