সৌদিতে দ্রুত সেনা পাঠাচ্ছে তুরস্ক ও পাকিস্তান
ইয়েমেনের তাইজ গভর্নরেটের দুবাবের কাছে ইরান-সমর্থিত হাউছিদের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় গুলিবর্ষণ করছেন সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের যোদ্ধারা : ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি।

আলজাজিরা, মিডল ইস্ট আই ও আনাদোলু এজেন্সি
ইয়েমেনের হাউছি বাহিনীর ক্রমাগত আক্রমণ ও ক্রমবর্ধমান সামরিক পদক্ষেপ রোধে বহুপক্ষীয় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ পূর্ণাঙ্গভাবে বহাল করার ঘোষণা এসেছে। উক্ত সমঝোতার অধীনে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় তাৎক্ষণিকভাবে সেনাবহর পাঠাতে একমত হয়েছে তুরস্ক ও পাকিস্তান। সৌদি রাজধানী রিয়াদে তিন রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। 
সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান বলেছেন, ‘কমিটি জোটের কাঠামোর মধ্যে থেকে হামলা ও এগুলোর জন্য দায়ী সবার বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কার্যকর করতে সম্মত হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই জোট সৌদি আরব ও পবিত্র স্থানগুলোর বিরুদ্ধে ঘৃণ্য হামলা মোকাবেলায় আমাদের দেশগুলোর সংহতি ও ঐক্য পুনর্নিশ্চিত করেছে।’
পৃথক আরেক বিবৃতিতে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, এই তিন দেশ ‘সম্মত হওয়া সামরিক বাহিনী ও সক্ষমতা সরবরাহ করবে’ আর সৌদি আরবে তাদের ‘দ্রুত মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করবে’। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো ‘অনুমোদিত পরিকল্পনা’ ও প্রত্যেক দেশের আইন অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে। ইয়েমেনের আন্তর্জতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনী হাউছিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে পাল্টা আক্রমণ শুরু করার কয়েক ঘণ্টা পর মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের এই ঘোষণাটি এল।
সৌদি আরবের সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, তারা লোহিত সাগরের বন্দর শহর মোখা পুনর্দখল করেছে আর এখন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল মান্দেব প্রণালীও তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর অভিযানে অংশ নিচ্ছে আর তাদের ১০০ যুদ্ধবিমান আকাশপথে সহায়তা জোগাচ্ছে।
গত ৭ আগস্ট ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’ গঠনের পর এবারই প্রথম এর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। ন্যাটোর আদলে তৈরি এই চুক্তির বিধানমতে, কোনো এক সদস্য রাষ্ট্রের ওপর আগ্রাসন বাকি মিত্রদের ওপর আক্রমণ বলে বিবেচিত হবে। বৈঠেক উপস্থিত সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান স্পষ্ট করেন, হাউছি আগ্রাসনের যৌথ জবাব দিতে এবং পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা রক্ষায় সমন্বিত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, সাংবিধানিক সীমার মধ্যে থেকেই নির্দিষ্ট সেনাদল ও সরঞ্জাম দ্রুত সৌদি আরবে পাঠানো হবে। ‘গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার’-এর সামরিক তথ্য মতে, তিন দেশের এই সম্মিলিত জোটে অন্তত ১৪ লাখ সক্রিয় সেনাসদস্য, তিন হাজার ৪০০ যুদ্ধবিমান ও ছয় হাজার ট্যাংক রয়েছে। ইতোমধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে নতুন আক্রমণের তথ্য মিলেছে। হাউছি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, দেশটির আভা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, জাজান অঞ্চলের আল-দাগারি সামরিক ঘাঁটি, রিয়াদ বিমানবন্দর এবং রাবিগের আরামকো তেল শোধনাগারে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। একই সাথে মক্কা ও মদিনা ব্যতীত পুরো সৌদির আকাশসীমাকে ‘সামরিক অঞ্চল’ ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকে সতর্ক করেছে দলটি। সারির মতে, ইয়েমেনে অবরোধ এবং রাজধানী সানাসহ বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সৌদি বোমার জবাবেই এই পদক্ষেপ। তবে রিয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
এরই মধ্যে সৌদি আরবের পদক্ষেপ ও মক্কা জোটের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিডিয়া ডিরেক্টর ইব্রাহিম সুলতান আল হাশমি। তিনি জানান, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে যেকোনো উদ্যোগকে কাতার সমর্থন করে, তবে জোটে যোগ দেয়ার সময় এখনো আসেনি। পাশাপাশি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যস্থতায় আলোচনার অগ্রগতি বজায় রাখতে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। অন্যপ্রান্তে, ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী লোহিত সাগরের বাব আল মান্দেব প্রণালী ও মোখা বন্দরের মতো কৌশলগত এলাকাগুলো হাউছিদের থেকে মুক্ত করার দাবি করেছে। এই স্থল অভিযানে সহায়তা দিচ্ছে যৌথ জোটের ১০০টির বেশি যুদ্ধবিমান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ‘সতর্ক আশাবাদ’ ব্যক্ত করে জানান, জ্বালানি তেলের দাম কমানো ও বিশ্ব নৌপথ সচল রাখতে বার্লিন সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সংঘাতে বাস্তুচ্যুত প্রায় দুই লাখ মানুষের জন্য ৩৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের জরুরি মানবিক সহায়তা ঘোষণা করেছে ফ্রান্স।

Advertisement