
নবাবগঞ্জ (দিনাজপুর) সংবাদদাতা
পায়ে আলতা, খোঁপায় বাহারি ফুল, পরনে রঙিন শাড়ি। ঢোল, মাদল ও মন্দিরার তালে নাচ-গানে মুখর চারপাশ। কারো কণ্ঠে মাতৃভাষার গান, কারো পায়ে ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের ছন্দ। শেকড় ও সংস্কৃতির টানে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে মিলনমেলায় পরিণত হয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠিগুলোর ঐতিহ্যবাহী কারাম উৎসব।
গত সোমবার উপজেলার ভাদুরিয়া ইউনিয়নের হরিনা (জালাপাড়া) গ্রামে দিনব্যাপী এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। সুরক্ষা সিএসওর উদ্যোগে এবং সিসিডিবির ‘সমান আওয়াজ’ প্রকল্পের সহযোগিতায় আয়োজিত উৎসবে বিভিন্ন এলাকার নৃগোষ্ঠির নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী ও সিএসও সদস্যসহ প্রায় ৩০০ মানুষ অংশ নেন।
সকাল থেকেই হরিনা গ্রামে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে নারী-পুরুষ ও তরুণ-তরুণীরা দলবদ্ধভাবে নাচ ও গানে অংশ নেন। ঢোল, মাদল ও মন্দিরার তালে পরিবেশিত হয় নিজস্ব ভাষার গান ও নৃত্য। এতে ফুটে ওঠে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে আসা তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির কাছে কারাম উৎসব শুধু আনন্দ-উৎসব নয়; এটি কৃষি, বিশ্বাস, প্রকৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সাথে গভীরভাবে যুক্ত একটি ঐতিহ্য। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ভাদ্র মাসের শুক্লা একাদশীতে ধান রোপণের পর এ উৎসব পালিত হয়। উৎসবের প্রতীক ‘কারাম’ বা ‘খিল কদম’ গাছের ডাল ফুল ও নতুন গামছা দিয়ে সাজিয়ে পূজা-অর্চনা ও প্রার্থনা করা হয়। পরে নাচ-গান ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উৎসব উদযাপন শেষে কারাম গাছের ডাল পুকুরে বিসর্জন দেয়া হয়।
আয়োজকরা বলেন, কারাম উৎসবের মাধ্যমে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য চর্চার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শেকড়ের সাথে পরিচিত করার সুযোগ তৈরি হয়। পরিবর্তিত সময় ও জীবনযাত্রার মধ্যেও ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার একটি মাধ্যম।
অনুষ্ঠানে সুরক্ষা সিএসওর সভাপতি শিউলি মিনজ সভাপতিত্ব করেন। প্রধান অতিথি ছিলেন ‘সমান আওয়াজ’ প্রকল্পের দাতা সংস্থা কোডি ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধি লিসা ফায়ে। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রকল্প সমন্বয়কারী মারিয়া সরকার, প্রকল্প কর্মকর্তা ইসমে আজম বাধন, এরিয়া ম্যানেজার মাহফুজা নাজমিন ও প্রণয় পালাশ টপ্যসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
উৎসবে অংশ নেয়া আসুন্তা টপ্য বলেন, ‘নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সবার সামনে তুলে ধরতে পেরে আমরা আনন্দিত। ভবিষ্যতে আরো বড় পরিসরে এ উৎসব আয়োজনের প্রয়োজন।’
দিনভর নাচ-গান ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শেষ হয় আয়োজন। তবে উৎসবের আবহে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ যেন মনে করিয়ে দেয়- সংস্কৃতি টিকে থাকে শুধু স্মৃতিতে নয়, চর্চা ও প্রজন্মান্তরের ধারাবাহিকতায়।









