
দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনায় ২০১৩ সালে পুলিশের কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ বালি ব্যবসায়ী বিল্লাল হোসেন হত্যার ঘটনায় করা মামলায় নতুন মোড় নিয়েছে। অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) দেয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে বাদির নারাজি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি পুনরায় তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। প্রায় ১৩ বছর আগের বিতর্কিত ওই মৃত্যুর ঘটনায় পিবিআই মাঠপর্যায়ে পুনঃতদন্ত শুরু করায় বিষয়টি এলাকায় আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর নিহত বিল্লালের বোন শালপোনা পারভীন বাদি হয়ে চুয়াডাঙ্গার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি হত্যা মামলা (সিআর-৬৩৬/২০২৪) দায়ের করেন। মামলায় অভিযুক্তরা হলেনÑ তৎকালীন চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য আলী আজগর টগর, তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) আব্দুর রহিম শাহ চৌধুরী, দর্শনা পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর জয়নাল আবেদীন নফর, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আলী মুনসুর বাবু, দর্শনা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের তৎকালীন ইনচার্জ এসআই মিজানুর রহমান, দামুড়হুদা থানার তৎকালীন ওসি আহসান হাবিব। এ ছাড়া আরো তিনজন নামীয় এবং কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি।
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩৪১, ৩৬৪, ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় অপহরণ, হত্যা, অবৈধ সমাবেশ এবং আলামত গুমের অভিযোগ আনা হয়। আদালতের নির্দেশে সিআইডি প্রাথমিক তদন্তের দায়িত্ব পায়।
সিআইডির প্রতিবেদন ও বাদির নারাজি
প্রায় দেড় বছর তদন্ত শেষে ২০২৬ সালের মার্চে সিআইডি আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। গত ১৫ মার্চ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে দাখিল করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। তাই আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়।
তবে এই প্রতিবেদনের তীব্র বিরোধিতা করে গত ১৯ মে আদালতে নারাজি আবেদন করেন বাদি শালপোনা পারভীন। তার অভিযোগ, সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা মূল সাক্ষীদের সঠিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি এবং প্রভাবশালী আসামিদের প্রভাবে তদন্তপ্রক্রিয়া প্রভাবিত হয়েছে। আদালত বাদির নারাজি আবেদন মঞ্জুর করে মামলাটির পুনঃতদন্তের জন্য পিবিআই ঝিনাইদহকে নির্দেশ দেন।
বাদির এজাহার অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ১১ আগস্ট রাত ২টা ৩০ মিনিটে দক্ষিণ চাঁদপুরের এক স্বজনের বাড়ি থেকে পুলিশ সদস্যসহ কয়েকজন বিল্লালকে ধরে নিয়ে যায়। পরদিন ১২ আগস্ট ভোরে দক্ষিণ চাঁদপুর-উজলপুর সড়কের হররচারা মাঠের পাশে তার গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। লাশের হাতে হ্যান্ড কাফ পরানো ছিল এবং শরীরে একাধিক গুলির ক্ষত ও আঘাতের চিহ্ন ছিল। বাদির দাবিÑ এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, যা ঢাকতে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজানো হয়।
অন্য দিকে, সিআইডির প্রতিবেদন ও তৎকালীন সরকারি নথিতে বলা হয়Ñ ১২ আগস্ট ২০১৩ চুয়াডাঙ্গা থানায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে তিনটি মামলা হয়েছিল। পুলিশের দাবি ছিল, একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ও বোমা বিস্ফোরণ ঘটালে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়। এতে বিল্লাল নিহত হন। তৎকালীন নির্বাহী তদন্তেও পুলিশের গুলিবর্ষণকে ‘যথার্থ’ বলা হয়েছিল।
সিআইডির তদন্তের অসঙ্গতি
পিবিআইয়ের পুনঃতদন্তের আদেশে সিআইডি প্রতিবেদনের বেশ কিছু অস্পষ্টতা ও অসঙ্গতি গুরুত্ব পাচ্ছে। সিআইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ঘটনাস্থলে পাওয়া গুলির খোসা পুলিশের সরকারি বরাদ্দের ছিল না, ফলে বিল্লাল নিজ দলের গুলিতে নিহত হতে পারেন। কিন্তু ওই গুলি বা খোসার সাথে কোনো অস্ত্রের বৈজ্ঞানিক বা ফরেনসিক মিল রয়েছে কি না, সে সংক্রান্ত কোনো ব্যালিস্টিক রিপোর্ট প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়নি।
প্রতিবেদনের এক অনুচ্ছেদে সাক্ষীর সংখ্যা একেক জায়গায় একেক রকম লেখা হয়েছে। এ ছাড়া এজাহারে উল্লিখিত ‘এএসআই দেবাশীষ’ নামের কোনো কর্মকর্তার অস্তিত্ব তদন্ত কেন্দ্রে না পেলেও ‘কনস্টেবল দেবাশীষ’ নামে একজনের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে সিআইডি নিজেই।
এর আগে ২০১৩ সালের ২০ আগস্ট নিহত বিল্লালের বাবা আতিয়ার রহমান পি-১৯৫/১৩ নম্বরে একটি হত্যা মামলা করেছিলেন, যা পরে তুলে নেয়া হয় এবং ২০২১ সালের ৫ অক্টোবর আদালত থেকে বিধি অনুযায়ী নথি বিনষ্ট করা হয়। বাদির অভিযোগ, প্রাণনাশের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের পরিবারকে মামলাটি প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়েছিল।
সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম জানান, “দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় ফরেনসিক আলামত ও দাফতরিক নথির ঘাটতি ছিল। ঘটনার সাথে অভিযুক্তদের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ না মেলায় নিয়ম অনুযায়ী ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া হয়েছিল।”
পুনঃতদন্তের বিষয়ে পিবিআই ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার গাজী রবিউল ইসলাম বলেন, “আদালতের নির্দেশে প্রায় এক-দেড় মাস আগে মামলার নথি আমাদের হাতে এসেছে। একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে তথ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যগ্রহণের কাজ চলছে।”
ঘটনার সময়ক্রম, আগের মামলা প্রত্যাহারের পেছনের কারণ এবং সিআইডির প্রতিবেদনের আইনি ফাঁকগুলো যাচাই করে পিবিআই কিভাবে প্রকৃত সত্য উন্মোচন করেÑ এখন সেটাই দেখার বিষয়।








