
এম জে এইচ জামিল সিলেট ব্যুরো
তফসিল আসে, প্রস্তুতি চলে; কিন্তু ভোট আর হয় না। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হলেই সরগরম হয়ে ওঠে সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মাঠ। প্রার্থীরা ছুটে বেড়ান ভোটারদের দ্বারে দ্বারে, মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ হয়, শুরু হয় প্রচার-প্রচারণা। ব্যবসায়ীদের মধ্যেও তৈরি হয় নতুন নেতৃত্ব পাওয়ার প্রত্যাশা। কিন্তু ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসে, ততই যেন অনিশ্চয়তার মেঘ ঘন হয়। শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো জটিলতায় থেমে যায় পুরো আয়োজন।
সর্বশেষ গত ২৪ সেপ্টেম্বর আবারো বাতিল হয়েছে সিলেট চেম্বারের নির্বাচনী তফসিল। একই সাথে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ফলে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্বাচিত নেতৃত্ব ছাড়া চলা ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনটির নির্বাচন আবারো চলে গেল অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে। ব্যবসায়ী মহলে এখন একটাই প্রশ্নÑ আর কতবার তফসিল হবে, আর কবে হবে ভোট? শুক্রবার ও শনিবার (২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর) সরকারি বন্ধ হওয়ায় রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিষয়টি জানাজানি হয়। এরপরই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেকেই নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবারের ঘটনাও যেন আগের ধারাবাহিকতারই পুনরাবৃত্তি। গত ১৭ আগস্ট নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর আবারও চেম্বারজুড়ে শুরু হয়েছিল নির্বাচনী প্রস্তুতি। তফসিল অনুযায়ী ভোট হওয়ার কথা ছিল ৫ নভেম্বর। দুই বছর মেয়াদি পরিচালনা পর্ষদে একজন সভাপতি, একজন সিনিয়র সহসভাপতি, একজন সহসভাপতি ও ২৪ জন পরিচালকসহ মোট ২৭ জন নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভোটের দেড় মাস আগেই সেই তফসিল বাতিল হয়ে গেল।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২৪ সেপ্টেম্বরের আদেশে এজাজ আহমদ চৌধুরীকে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাকে সদস্য অন্তর্ভুক্তি ও সদস্যপদ হালনাগাদ, নতুন ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং নতুন নির্বাচনী তফসিলের মাধ্যমে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, আবারো শুরু হবে নতুন করে প্রস্তুতি; নতুন হবে ভোটার তালিকা, নতুন হবে তফসিল।
সিলেট চেম্বারের নির্বাচনী সঙ্কটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর চেম্বারের তৎকালীন সভাপতি তাহমিন আহমদ আত্মগোপনে চলে গেলে নেতৃত্ব সঙ্কট তৈরি হয়। পরে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফয়েজ হাসান ফেরদৌসের নেতুত্বে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা হলেও অধিকাংশ সদস্যের দাবির মুখে সভাপতি ও চার পরিচালক পদত্যাগ করেন। এতে চেম্বারের স্বাভাবিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসক নিয়োগ করা হলেও নির্বাচিত নেতৃত্বের সঙ্কট কাটেনি। বরং ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাড়তে থাকে ক্ষোভ। তাদের অভিযোগ, প্রশাসকের মাধ্যমে দৈনন্দিন কার্যক্রম চললেও আমদানি-রফতানি, বিনিয়োগসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে কার্যকর প্রতিনিধিত্বের জন্য নির্বাচিত নেতৃত্ব প্রয়োজন।
এই অবস্থায় নির্বাচিত নেতৃত্ব ফিরিয়ে আনতে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। ১ নভেম্বর ভোট গ্রহণের কথা ছিল। দু’টি প্যানেল থেকে মোট ৪২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন। নির্বাচনের প্রায় সব প্রস্তুতিও শেষ হয়েছিল। কিন্তু ভোটের মাত্র পাঁচ দিন আগে, ২৬ অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন-১ শাখার চিঠিতে নির্বাচন স্থগিত করা হয়। অর্থাৎ, ভোটের একেবারে দোরগোড়ায় গিয়েও ফের থেমে যায় নির্বাচন।
হাইকোর্টের নির্দেশ, তবুও হয়নি ভোট
সেই সময় নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটি প্যানেলের প্রার্থীরা হাইকোর্টে রিট করেন। ২৯ অক্টোবর হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশ দেন। কিন্তু আদালতের আদেশের কপি যথাসময়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে না পৌঁছানোয় নির্ধারিত ১ নভেম্বর ভোটগ্রহণ সম্ভব হয়নি। পরে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন করে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে প্রার্থী ও ব্যবসায়ীরা মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও নির্বাচন আয়োজনের কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে অস্পষ্টতার কারণেও প্রক্রিয়া এগোয়নি। শেষ পর্যন্ত সেই নির্বাচন আর হয়নি।
আবারো ভেস্তে গেল আশা
দীর্ঘ জটিলতার পর চলতি বছরের ১৭ আগস্ট নতুন করে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হলে ব্যবসায়ী মহলে ফের আশার সঞ্চার হয়। চেম্বারের হলরুমে তৎকালীন প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহা তফসিল ঘোষণা করেন। নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) আয়েশা আক্তার তফসিলের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তফসিল অনুযায়ী ১৩ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক ভোটার তালিকা, ২০ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ এবং সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও দাখিলের কথা ছিল। যাচাই-বাছাই শেষে ৩ অক্টোবর প্রাথমিক বৈধ প্রার্থী তালিকা এবং ১২ অক্টোবর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের সময় নির্ধারণ করা হয়। ১৫ অক্টোবর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর একই দিন চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের কথা ছিল। ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয় ৫ নভেম্বর। তফসিল ঘোষণার পর আবারো নির্বাচনী আমেজ তৈরি হয়। কিন্তু সেই আমেজও স্থায়ী হলো না। এক মাসের ব্যবধানেই বাতিল হয়ে গেল পুরো তফসিল।
ফের প্রশাসক, আবার শুরু শূন্য থেকে
সর্বশেষ আদেশে নতুন প্রশাসক এজাজ আহমদ চৌধুরীর হাতে এখন পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া নতুন করে সাজানোর দায়িত্ব। সদস্য অন্তর্ভুক্তি ও হালনাগাদ, ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং এরপর নতুন তফসিল ঘোষণাÑ সবই করতে হবে নতুন করে। ফলে ১৭ আগস্ট ঘোষিত তফসিলের ভিত্তিতে যে নির্বাচনী প্রক্রিয়া এগোচ্ছিল, তার আর কোনো কার্যকারিতা থাকছে না। নতুন প্রশাসকের অধীনে আবার শুরু হবে সদস্যপদ ও ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ। এরপর ঘোষণা হবে নতুন তফসিল।
সিলেট চেম্বারের সাবেক সভাপতি খন্দকার শিপার বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় আমদানি-রফতানি, বিনিয়োগসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে কার্যকরভাবে আলোচনা করা কঠিন হচ্ছে।
এ ব্যাপারে সিলেট চেম্বারের সাবেক পরিচালক আলীমুল এহসান চৌধুরী বলেন, আমরা এখনো অফিসিয়াল কোন চিঠি পাইনি। নির্বাচনের প্রস্তুতিতেই আছি। তবে শুনেছি তফসিল বাতিল এবং প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যদি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে এটি হয় তাহলে ভিন্ন কথা। আর যদি নির্বাচন ছাড়া প্রশাসকের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে চেম্বার পরিচালনার চেষ্টা হয়, তাহলে সেটি ব্যবসায়ীরা মেনে নিবে না। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিবো।








