
বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে একই সাথে দু’টি বিপরীত প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে- একদিকে আমানত কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে বিনিয়োগ বা ঋণ বিতরণ। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অতিরিক্ত তারল্যও। ফলে খাতটির সামনে এখন মূল প্রশ্ন শুধু কত টাকা আমানত সংগৃহীত হচ্ছে তা নয়; বরং আমানতের ভিত্তি দুর্বল হওয়ার এই সময়ে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ কতটা টেকসই এবং ব্যাংকগুলোর তারল্য ও সম্পদের মান কতটা নিরাপদ- সেটিই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এপ্রিল-জুন ২০২৬ প্রান্তিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট আমানত দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৬৮ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। মার্চ শেষে যা ছিল চার লাখ ৭৯ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে আমানত কমেছে প্রায় ১১ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা বা ২.৪০ শতাংশ। তবে এক বছরের ব্যবধানে আমানত এখনো ২.৪৫ শতাংশ বেশি রয়েছে।
এর বিপরীতে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট বিনিয়োগ (ঋণ ও অগ্রিম) জুন শেষে বেড়ে হয়েছে পাঁচ লাখ ৩৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যা মার্চে ছিল পাঁচ লাখ ২৬ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে বিনিয়োগ বেড়েছে ৯ হাজার ৮১১ কোটি টাকা বা ১.৮৬ শতাংশ (এক বছরে বৃদ্ধি ৪.২৭ শতাংশ)। ফলেই ইসলামী ব্যাংকিং খাতে অর্থায়নের চাপ ও আমানতের ভিত্তির মধ্যকার ব্যবধান আরো গভীর হয়েছে।
আমানত সঙ্কোচন : একটি বড় সতর্কসঙ্কেত
মার্চ প্রান্তিক থেকেই ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত কিছুটা কমতে শুরু করেছিল। গতকাল প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ শেষে আমানত ডিসেম্বরের তুলনায় ০.২৬ শতাংশ কম ছিল। কিন্তু এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এই সঙ্কোচনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিন মাসে ২.৪০ শতাংশ আমানত কমে যাওয়ার অর্থ হলো, গ্রাহকদের আস্থার সঙ্কট বা আস্থার ওপর থাকা চাপ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের বিশ্লেষণেও ইসলামী ব্যাংকিং খাতের আমানত প্রবৃদ্ধি প্রচলিত ধারার ব্যাংকের তুলনায় পিছিয়ে থাকার বিষয়টি উঠে এসেছিল। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রচলিত ব্যাংকের আমানত ১২.৭৩ শতাংশ বাড়লেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছিল ৮.৯৮ শতাংশ মাত্র। নতুন প্রান্তিকের এই পতন আস্থার প্রশ্নটিকে আবারো সামনে নিয়ে এসেছে।
আমানত কমলেও বিনিয়োগ কেন বাড়ছে?
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো- যেখানে আমানত কমেছে, সেখানে বিনিয়োগ না কমে বরং বেড়েছে। অথচ একই সময়ে জাতীয় পর্যায়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ছিল অত্যন্ত দুর্বল। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, জুন ২০২৬-এ বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৪.৪৭ শতাংশে, যা ১৯৯৩ সালের পর সর্বনি¤œ।
অর্থাৎ, জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন ঋণের চাহিদা দুর্বল হলেও ইসলামী ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগ কিছুটা বাড়তে পেরেছে। এর পেছনে অগ্রাধিকার খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সহায়তা বড় ভূমিকা রেখেছে বলে প্রান্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এই বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিকে কেবল বাজারে ঋণের স্বাভাবিক চাহিদা বৃদ্ধির প্রতিফলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখানে ব্যাংকগুলোর মূল চ্যালেঞ্জ হলো- বর্ধিত বিনিয়োগের বিপরীতে স্থিতিশীল আমানতের ভিত্তি নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগের মান পর্যবেক্ষণ করা।
আইডিআর (ওউজ) ১. এর ঘরে : কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ওহাবংঃসবহঃ-উবঢ়ড়ংরঃ জধঃরড় বা আইডিআর (ওউজ) মার্চে ছিল ০.৯০, যা জুনে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.০০-এ (ইডিএফ ও পুনঃঅর্থায়ন বাদ দিয়ে)। অর্থাৎ, আমানতের তুলনায় বিনিয়োগের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আমানত কমার পাশাপাশি বিনিয়োগ বাড়ার কারণে এই অনুপাত ওপরের দিকে উঠেছে। ফলে আইডিআর বৃদ্ধিকে কেবল ব্যাংকগুলোর শক্তিশালী ঋণদানের সক্ষমতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং প্রশ্ন হলো- আমানত যদি আরো কমে এবং বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকে, তবে ব্যাংকগুলো এই বিনিয়োগের অর্থায়ন করবে কিভাবে?
অতিরিক্ত তারল্যের বেলায় বৈপরীত্য
একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ১২৪ কোটি টাকায় (মার্চে ছিল ১৯ হাজার ২০৪ কোটি টাকা)। তিন মাসে বৃদ্ধি প্রায় দুই হাজার ৯২০ কোটি টাকা বা ১৫.২০ শতাংশ।
একদিকে সামগ্রিক আমানত কমা এবং অন্যদিকে অতিরিক্ত তারল্য বৃদ্ধিকে আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী মনে হলেও, এর নেপথ্যে ব্যাংকিং খাতের তারল্য বণ্টনের বড় ধরনের বৈষম্য কাজ করছে। সব ব্যাংকের তারল্যের অবস্থা সমান নয়; কোনো কোনো ব্যাংকের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ অলস পড়ে থাকলেও অন্য ব্যাংকগুলো আমানত ও তারল্য সঙ্কটে ধুঁকছে।
বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্সে বড় ধাক্কা
রফতানি আয় : এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রফতানি আয় হয়েছে ২৯ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা, যা তিন মাসের ব্যবধানে ১.৪২ শতাংশ এবং এক বছরের ব্যবধানে ২৬.১৪ শতাংশ কম। ইউরোপীয় বাজারে পোশাক খাতের দুর্বল চাহিদা এর একটি বড় কারণ।
আমদানি ব্যয় : এই প্রান্তিকে আমদানি পরিশোধ হয়েছে ৩৮ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা, যা তিন মাসে ৬.৩৭ শতাংশ এবং এক বছরে ২৫.০৬ শতাংশ কমেছে।
রেমিট্যান্স : সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। আলোচ্য প্রান্তিকে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে ২১ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা, যা তিন মাসে ১২.৯৫ শতাংশ এবং এক বছরে ১৮.০২ শতাংশ কম। এটি জাতীয় রেমিট্যান্সপ্রবাহের সামগ্রিক চিত্রের সাথে বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
কর্মী কমেছে, শাখা বেড়েছে
জুন শেষে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের মোট শাখা দাঁড়িয়েছে ১,৭৫৩টিতে (বৃদ্ধি ৪টি) এবং উইন্ডো বেড়ে হয়েছে ৯৯০টি (বৃদ্ধি ১৫টি)। অথচ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের বিপরীতে কর্মীসংখ্যা কমেছে। জুনে মোট কর্মী দাঁড়িয়েছে ৪৮,৫৪৮ জনে, যা তিন মাসে ৩৮৭ জন এবং এক বছরে প্রায় ৩,৩০০ জন কম। এটি খরচ কমানো, ডিজিটাল রূপান্তর নাকি কাঠামোগত পুনর্গঠনের ফল- তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।
এক নজরে : ইসলামী ব্যাংকিং (এপ্রিল-জুন ২০২৬)
সূচক মার্চ ২০২৬ জুন ২০২৬ পরিবর্তন
মোট আমানত ৪,৭৯,৯৩৫ কোটি টাকা ৪,৬৮,৩৯৬ কোটি টাকা -২.৪০%
মোট বিনিয়োগ ৫,২৬,৮৮৯ কোটি টাকা ৫,৩৬,৭০০ কোটি টাকা +১.৮৬%
আইডিআর (ওউজ) ০.৯০ ১.০০ ঊর্ধ্বমুখী
অতিরিক্ত তারল্য ১৯,২০৪ কোটি টাকা ২২,১২৪ কোটি টাকা +১৫.২০%
রফতানি ৩০,৩২১ কোটি টাকা ২৯,৮৯১ কোটি টাকা -১.৪২%
আমদানি ৪১,৫৯৬ কোটি টাকা ৩৮,৯৪৬ কোটি টাকা -৬.৩৭%
রেমিট্যান্স ২৫,০১১ কোটি টাকা ২১,৭৭১ কোটি টাকা -১২.৯৫%
শাখা ১,৭৪৯ ১,৭৫৩ +৪
উইন্ডো ৯৭৫ ৯৯০ +১৫
কর্মী ৪৮,৯৩৫ ৪৮,৫৪৮ -০.৭৯%
ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ প্রবৃদ্ধি অর্জন নয়; বরং আমানতের ওপর আস্থা পুনর্গঠন, সম্পদের গুণগত মান রক্ষা এবং তারল্যের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। সার্বিক গড়ের আড়ালে ব্যাংকভিত্তিক প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নিলে এই সঙ্কট দীর্ঘায়িত হতে পারে।








