
সাইবার অপরাধ দমন, অনলাইন হয়রানি এবং ডিজিটাল মাধ্যমে যৌন নিপীড়ন ঠেকানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো সুস্থ সমাজে দ্বিমতের সুযোগ নেই। প্রযুক্তির অবাধ বিস্তারের সাথে সাথে ডিজিটালি সংঘটিত অপরাধের মাত্রা ও কৌশল যেমন জটিল হচ্ছে, তেমনি নাগরিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার নিরাপত্তায় কার্যকর আইনি কাঠামোর আবশ্যিকতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই নিরাপত্তার আইনি ছাতা যখন ধীরে ধীরে বাকস্বাধীনতা ও অনুসন্ধানী সত্য প্রকাশের ওপর নজরদারির চাদর হয়ে ওঠে, তখনই তৈরি হয় নতুন বিপত্তি। সাইবার নিরাপত্তার অজুহাতে কোন তথ্যটি অপরাধ, কোনটি সমালোচনা, কোনটি সাধারণ ভুল এবং কোনটি কেবল তাৎক্ষণিকভাবে অযাচাইকৃত তথ্য— এই সীমারেখাগুলো যখন অস্পষ্ট বা ধোঁয়াশাপূর্ণ করে ফেলা হয়, তখন আইনটি তার মূল রক্ষক ভূমিকা হারিয়ে রাষ্ট্রের নাগরিকদের মুক্তচিন্তা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়।
সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর বিভিন্ন ধারা সংশোধনের যে খসড়াটি সম্প্রতি (১০ সেপ্টেম্বর) পর্যালোচনা সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে বাকস্বাধীনতা, সাংবাদিকতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্রে ঝুঁকির আলামত স্পষ্টভাবে ভেসে ওঠে। খসড়াটির ধারা ৮, ২৫, ২৯, ৪১, ৪৯ এবং নতুন প্রস্তাবিত ২৬ক ধারাটি আইনি, সাংবিধানিক ও ব্যবহারিক দিক থেকে নিবিড় পর্যালোচনার দাবি রাখে।
সংবিধানের সুরক্ষা বনাম প্রস্তাবিত বিধিনিষেধ
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের চিন্তার স্বাধীনতা, বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। তবে এটি একটি অবাধ বা অনিয়ন্ত্রিত অধিকার নয়; সংবিধান নিজেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধে প্ররোচনার মতো নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে আইনের দ্বারা আরোপিত ‘যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ’-এর কথা বলেছে।
কিন্তু প্রস্তাবিত সংশোধনী খসড়ায় অনলাইন কনটেন্ট অপসারণ ও ব্লক করার পরিধি যে হারে বাড়ানো হয়েছে এবং ‘অপতথ্য’, ‘গুজব’, ‘মানহানি’ কিংবা ‘রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর’ তথ্যের মতো সংজ্ঞাহীন পরিভাষাকে অপরাধের আওতায় আনার সুযোগ রাখা হয়েছে, তা সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের চেতনাকে খর্ব করে।
এখানে মূল মৌলিক প্রশ্নটি কেবল—‘কিভাবে অনলাইন গুজব ঠেকানো হবে?’—এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। গুজব ও ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য দমনের নামে স্বাধীন সংবাদ প্রকাশ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সীমা টেনে ধরার সুযোগ তৈরি করবে। সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তের সমালোচনাকে আইনি খাঁচায় বন্দী করার ব্যবস্থা হচ্ছে কি?
অনিয়ন্ত্রিত আইনি সুযোগ এবং অস্পষ্টতার ঝুঁকি
প্রস্তাবিত ধারা ৮(২)-এ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সরকারের ক্ষমতাপ্ত যেকোনো সংস্থা বা বাহিনীকে নির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত অপসারণ, ব্লক বা স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়ার ব্যাপক ক্ষমতা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও জনশৃঙ্খলার রক্ষার পাশাপাশি এই ক্ষমতার পরিধিতে যুক্ত করা হয়েছে— অপতথ্য বা গুজব, ধর্মীয়/সাম্প্রদায়িক ঘৃণা, জাতিগত সহিংসতা, অপরাধের উসকানি এবং যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘মানহানিকর’ বা রাষ্ট্রের জন্য ‘অবমাননাকর’ তথ্য।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে ‘সহিংসতার নির্দেশনা’ বা সরাসরি দাঙ্গা-হাঙ্গামার উসকানি একটি নির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান অপরাধ। কিন্তু কোনো তথ্যে ‘রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর’ কিছু আছে কি না— তার কোনো বস্তুনিষ্ঠ বা সুস্পষ্ট আইনি সংজ্ঞা এই খসড়ায় অনুপস্থিত। সরকারের কোনো ভুল বা ক্ষতিকর উন্নয়ননীতির কঠোর বিশ্লেষণমূলক সমালোচনা কি রাষ্ট্রের অবমাননা হিসেবে গণ্য হবে? কোনো সরকারি দফতর বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ কি প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপরাধে পড়বে? কিংবা কোনো মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা কি রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্যের মোড়কে বিচার করা হবে? এসব স্পর্শকাতর প্রশ্নের স্পষ্ট আইনি সমাধান না থাকলে, আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী ও প্রশাসনিক কাঠামোর হাতে ইচ্ছামতো ব্যাখ্যার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রস্তাবিত ২৬ক ধারা : গুজব, অপতথ্য ও শাস্তির আনুপাতিকতা
খসড়ার সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও আলোচিত সংযোজন হলো নতুন প্রস্তাবিত ২৬ক ধারা। এই ধারায় সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচারকে সরাসরি গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড অথবা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের কঠোর বিধান রাখা হয়েছে।
তবে এই কঠোর শাস্তির চেয়েও বড় সঙ্কট লুকিয়ে আছে ‘অপরাধের সংজ্ঞা নির্ধারণে’। খসড়ায় ‘গুজব’-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে— এমন অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবি, যা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে বা করার সম্ভাবনা রাখে। অন্য দিকে ‘অপতথ্য’ বলতে বোঝানো হয়েছে— এমন মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, যা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি ও প্রচার করা হয়। এখানে আইনের বয়ানে তথ্যবিজ্ঞানের দু’টি মৌলিক বিষয়কে গোলমাল করে ফেলা হয়েছে : অযাচাইকৃত তথ্য এবং ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য এক জিনিস নয়।
সাংবাদিকতা কোনো তৈরি পণ্যের বিতরণ নয়; এটি একটি চলমান অনুসন্ধানী প্রক্রিয়া। কোনো বড় ঘটনা, দুর্ঘটনা বা রাজনৈতিক সঙ্কটের প্রাথমিক পর্যায়ে সব তথ্য শতভাগ যাচাই করা তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নাও হতে পারে। পরবর্তীতে অনুসন্ধানের সাথে সাথে সেই প্রাথমিক তথ্যটি সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে বা ভুল প্রমাণিত হয়ে সংশোধিত হতে পারে। এখন কেবল ‘অযাচাইকৃত’ হওয়ার কারণে যদি একজন সাংবাদিককে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকা জরিমানার ঝুঁকিতে পড়তে হয়, তবে দেশের কোনো সাংবাদিক কি আর দ্রুত বা সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের সাহস পাবেন?
একইভাবে ‘আতঙ্ক বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির সম্ভাবনা’— এটি একটি চরম আপেক্ষিক ও নমনীয় মানদণ্ড। কোনো বড় ব্যাংকিং সঙ্কট, আন্তর্জাতিক জ্বালানি ঘাটতি, শেয়ারবাজারের ধস, খাদ্য সঙ্কট কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার হুমকিসংক্রান্ত সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ পেলেও তা স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর উদ্বেগ বা আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। এই উদ্বেগ তো বাস্তব সত্যের প্রতিফলন, এটি মিথ্যা তথ্যের ফল নয়। অথচ খসড়ার বর্তমান সংজ্ঞায় এই বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনকেও ‘আতঙ্ক সৃষ্টিকারী’ আখ্যা দিয়ে ২৬ক ধারার অধীনে মামলা দেয়ার পথ খোলা থেকে যায়।
শাস্তির মাত্রায় ভারসাম্যহীনতা
একটি গণতান্ত্রিক আইনি ব্যবস্থার অন্যতম মূলনীতি হলো— অপরাধের গভীরতা ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী শাস্তির আনুপাতিকতা। অথচ ২৬ক ধারায় সব ধরনের ঘটনাকে একই পাল্লায় মাপা হয়েছে। একজন সাধারণ নাগরিকের না বুঝে শেয়ার করা একটি ফেসবুক পোস্ট, একজন সাংবাদিকের অনাকাঙ্ক্ষিত পেশাগত ভুল বা অসাবধানতা, বাণিজ্যিক বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এবং কোনো সুসংগঠিত চক্রান্তের মাধ্যমে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোর ওপর পরিচালিত অপতথ্য প্রচার।
এগুলোর সামাজিক প্রভাব, অপরাধের মাত্রা এবং পেছনের উদ্দেশ্য কোনোভাবেই এক নয়। অথচ প্রস্তাবিত ধারায় সবার জন্য একই সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের খাঁড়া ঝুঁলিয়ে রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আইনি কাঠামো হতে পারে : ১. অনিচ্ছাকৃত ভুল বা অযাচাইকৃত তথ্যের ক্ষেত্রে : অপরাধ হিসেবে গণ্য না করে বাধ্যতামূলক সংশোধন, প্রত্যাহার ও দুঃখপ্রকাশের নীতি গ্রহণ। ২. ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা প্রচারের ক্ষেত্রে : ক্ষতির উপাদান প্রমাণ সাপেক্ষে দেওয়ানি প্রতিকার ও আনুপাতিক জরিমানা। ৩. রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিধ্বংসী সুসংগঠিত ক্ষতিকর প্রচারণার ক্ষেত্রে : ক্রিমিনাল অফেন্স হিসেবে কঠোরতর বিচার ও নির্দিষ্ট শাস্তি।
২৫ ধারার ব্যাপ্তি ও সাংবাদিকতায় বাধা
প্রস্তাবিত ২৫ ধারায় ইতিবাচকভাবে ডিজিটাল মাধ্যমে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, রিভেঞ্জ পর্নো, শিশু যৌন নিপীড়নের মতো জঘন্য অপরাধগুলো ঠেকানোর কঠোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রযুক্তির বর্তমান যুগে বিশেষ করে নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় এই অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়া নিঃসন্দেহে জরুরি। কিন্তু এই কঠোর ও সংবেদনশীল ধারার ভেতরেই যুক্ত করা হয়েছে ‘মানহানিকর তথ্য’ প্রকাশের অপরাধকে। প্রকৃতি ও সামাজিক ক্ষতির বিচারে দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
প্রস্তাবিত ব্যাখ্যায় দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার মানহানির ধারণার পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমের মিথ্যা, বিকৃত, বিভ্রান্তিকর, অপমানজনক উপাদান এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত কনটেন্টকেও যুক্ত করা হয়েছে।
কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা দুর্নীতিগ্রস্ত করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতির সংবাদ সত্য তথ্যপ্রমাণসহ পত্রিকায় প্রকাশ পেলেও ওই প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি স্বভাবতই দাবি করবে যে এই সংবাদে তাদের ‘সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে’ বা তারা ‘অপমানিত’ হয়েছে। যদি আইনের সংজ্ঞায় ‘অপমানজনক’ বা ‘ক্ষতিকর’ শব্দের এমন ঢালাও ও বিস্তৃত ব্যবহার থাকে, তবে সত্য প্রকাশকারী অনুসন্ধানী সংবাদ এবং মানহানিকর কুৎসার মধ্যে পার্থক্য করার আর কোনো দেয়াল থাকবে না। ফলস্বরূপ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা আইনি মামলার চাপে পড়বে, দুর্নীতিবাজরা এই ধারাকে নিজেদের আত্মরক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করবে।
প্রতিকার, করপোরেট দায় ও বিচারিক ফ্রেমওয়ার্ক
খসড়াটিতে কিছু বিচারিক নজরদারির প্রস্তাবও রাখা হয়েছে, যা ইতিবাচক। যেমন— অনলাইন কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণের পর ৩ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের অনুমোদন নেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ট্রাইব্যুনাল অনুমতি না দিলে কনটেন্ট অবমুক্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে এবং ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা তার পরিবার আদালতের কাছে আবেদনের সুযোগ পাবেন। এই প্রতিকারকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আরো কিছু প্রশাসনিক ও বিচারিক সংস্কার যুক্ত করা প্রয়োজন : কনটেন্ট ব্লক করার সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট লেখক বা প্রতিষ্ঠানকে সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শানো, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে দ্রুততম সময়ে (যেমন-২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে) শুনানির ব্যবস্থা করা, লিখিত আদেশ প্রদান এবং রাষ্ট্র কর্তৃক বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক সাইবার স্পেসে কী পরিমাণ কনটেন্ট কখন ও কী কারণে ব্লক করা হলো— তার সার্বিক পরিসংখ্যান নিয়ে ধারাবাহিক ‘স্বচ্ছতা প্রতিবেদন’ সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা।
ধারা ২৯ : কোম্পানির দায়ভার
প্রস্তাবিত ধারা ২৯-এ কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীর অপরাধের জন্য কোম্পানির মালিক, সিইও, ম্যানেজার, সচিব বা অংশীদারদের ওপর দায় চাপানোর পাশাপাশি পুরো কোম্পানির নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত কিংবা বাতিল করার ক্ষমতা আদালতের হাতে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে শত শত কর্মী কাজ করতে পারেন। কোনো একজন কর্মীর ব্যক্তিগত ডিজিটাল অপরাধের জন্য যদি পুরো কোম্পানির পরিচালনা বন্ধ করে দেয়া হয়, তবে তা হাজারও কর্মীর চাকরি ও বিনিয়োগকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলবে। তাই এখানে প্রতিষ্ঠানের সরাসরি ‘জ্ঞান’, ‘অনুমোদন’ কিংবা ‘গভীর অবহেলা’ ছিল কি না— তা প্রমাণ করার সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা শর্ত আইনে থাকা আবশ্যক।
ধারা ৪১ ও ৪৯ : প্রশাসনিক বনাম আইনি ক্ষমতা
ধারা ৪১-এর মাধ্যমে অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী বিচারিক বিভাগ সাজানো হয়েছে— গুরুতর অপরাধগুলোকে বিশেষায়িত সাইবার ট্রাইব্যুনালে এবং অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধ প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষায়িত আদালত ভালো উদ্যোগ হলেও, অপরাধের সংজ্ঞা যদি নিজেই অস্পষ্ট থাকে (যেমন ২৬ক ধারা), তবে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল দ্রুত বিচার করতে গিয়ে মূলত বাকস্বাধীনতার কণ্ঠরোধ করার যন্ত্রে পরিণত হতে পারে।
অন্য দিকে ধারা ৪৯-এ বলা হয়েছে, কনটেন্ট অপসারণের সময়সীমা এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর (যেমন- মেটা, গুগল, এক্স) সাথে কাজের পদ্ধতি পরবর্তী সময়ে ‘বিধিমালা’ প্রণয়নের মাধ্যমে ঠিক করা হবে। এখানে একটি মূলনীতিগত আপস দেখা যায়। কোনো নাগরিকের সংবিধান প্রদত্ত বাকস্বাধীনতার মৌলিক সীমা কী হবে এবং কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র নাগরিকের বক্তব্য সেন্সর বা ব্লক করতে পারবে— তা সংসদে পাস হওয়া মূল আইনেই চূড়ান্ত ও স্পষ্ট থাকা উচিত। এটি নির্বাহী বিভাগের তৈরি করা পরবর্তী প্রবিধান বা বিধির ওপর ছেড়ে দেয়া বিপজ্জনক। প্রবিধান প্রযুক্তিগত নিয়ম নির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু মতপ্রকাশের আইনি সীমানা নির্ধারণ করার দায়িত্ব আইনসভারই।
সুরক্ষা ও স্বাধীনতার ভারসাম্যই মূল পরীক্ষা
বাংলাদেশের সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ ইতোমধ্যে কার্যকর এবং পরবর্তীতে ১ জুলাই ২০২৬-এ সংশোধিত আইন প্রণীত হয়েছে। বিদ্যমান এই আইনি কাঠামোর জটিল বাস্তবতায় নতুন প্রস্তাবিত প্রতিটি সংশোধনকে কেবল ‘অপরাধ দমনের তাগিদ’ থেকে না দেখে— আইনের প্রয়োজনীয়তা, সংজ্ঞার স্পষ্টতা, শাস্তির আনুপাতিকতা, নির্বাহী ক্ষমতার সীমা এবং বিচারিক প্রতিকারের কার্যকারিতা— এই পাঁচটি নিরপেক্ষ মানদণ্ডে বিচার করতে হবে।
একটি সুস্থ ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা যেমন জরুরি, তেমনি সত্য সংবাদ তুলে ধরা, শাসকশ্রেণীর ভুল সিদ্ধান্তের বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করা এবং নাগরিকের মন খুলে নিজের মতামত প্রকাশ করাও সাংবিধানিক কাঠামোর হৃৎপিণ্ড।
সাইবার স্পেসে সহিংস উসকানি, পর্নোগ্রাফি, ব্ল্যাকমেইলিং, শিশু নির্যাতন, আর্থিক জালিয়াতি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ডিপফেক প্রতারণা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগে কারো আপত্তি নেই। কিন্তু এই অপরাধগুলো দমনের সূত্র ধরে ‘অযাচাইকৃত’, ‘অবমাননাকর’, ‘বিভ্রান্তিকর’ কিংবা ‘ক্ষতিকর’-এর মতো নমনীয় ও অনির্দিষ্ট শব্দমালাকে যখন ফৌজদারি অপরাধের ভিত্তি বানানো হয়, তখন তা অপরাধিকে শাস্তি দেয়ার চেয়ে মুক্ত গণমাধ্যম ও সৎ নাগরিককে ভীত করার হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়।
আইনের প্রকৃত শক্তি বা ন্যায্যতা কেবল শাস্তির কঠোরতা বা জরিমানার অঙ্কে পরিমাপ করা যায় না। বরং দেশের একজন সাধারণ নাগরিক এবং সংবাদকর্মী খুব স্পষ্ট ও নির্ভুলভাবে বুঝতে পারছেন কি না— কোন আচরণটি অপরাধ আর কোনটি তার সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার— তার ওপরই একটি আইনের আইনি গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে। প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের নতুন খসড়াটি কি স্বাধীনতার সুরক্ষা দেবে, নাকি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করবে— সেই পরীক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় জাতীয় প্রশ্ন।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
mrkmmb@gmail.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








