
‘আমি কোন দেশে বাস করি। এটা কোন দেশ? আমার একটাই মাত্র ছেলে। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব। তোরা আইফোন নিয়ে যেতি, কিন্তু আমার ছেলেকে খুন করলি কেন? আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও। অপ্রতিম আমার বুকের মানিক, তোকে ছাড়া কিভাবে বাঁচব, বাবা’। উপরিউক্ত কথাগুলো কোনো নাটকের ডায়ালগ নয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের বুকফাটা আর্তনাদ ও করুণ আহাজারি। গত ১৮ সেপ্টেম্বর তার একমাত্র সন্তান স্থানীয় স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে কিশোর দুর্বৃত্তরা নৃশংসভাবে হত্যা করে।
১৮ সেপ্টেম্বর একই দিনে পাবনা সদর উপজেলার কুলোনিয়ার শিশু কামরুন নাহার কলিকে (১০) ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। স্থানীয় মুদি দোকানি মোস্তফা কামাল (৫৬) ও তার ভাড়াটিয়া ইয়াছিন আলী (২১) শিশুটিকে ফুসলিয়ে দোকানের পেছনের কক্ষে নিয়ে যায় এবং পাশবিক নির্যাতন চালায়। পরে পরিচয় ফাঁস হওয়ার ভয়ে শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। লাশটি প্রথমে বস্তায় ভরে খাটের নিচে এবং পরে ডোবায় ফেলে দেয়া হয়। অভিযুক্তদের পুলিশ গ্রেফতার করে। বিক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত জনতা দোগাছি ইউনিয়নে অবস্থিত মোস্তফার বাড়ির সীমানাপ্রাচীর, দরজা এবং জানালার গ্রিল ভেঙে ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। জানালার গ্রিলসহ বিভিন্ন সামগ্রী খুলে নিয়ে যায়। চার দিন ধরে স্থানীয় জনগণ হাতুড়ি শাবল দিয়ে দোতলা বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেয়।
শিশুধর্ষণ করে নৃশংস কায়দায় হত্যার মতো ঘটনা মানুষের স্বাভাবিক ন্যায়বোধে তীব্র আঘাত করে। ফলে ক্ষোভ অনেক সময় যুক্তিসঙ্গত প্রতিবাদ অতিক্রম করে প্রতিশোধমূলক আচরণে পরিণত হয়। মানুষ যদি মনে করে অপরাধীকে আটকাতে রাষ্ট্রযন্ত্র দুর্বল অথবা বিচার প্রলম্বিত হবে, তখন বিক্ষুব্ধ জনতা মনে করে, ‘আমাদেরই কিছু করতে হবে।’ পাবনার ঘটনায় জনতার সংখ্যা ও ক্ষোভ তীব্র হওয়ায় পুলিশের পক্ষে ভাঙচুর ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
থানা পর্যায়ে হয়রানি, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, বিচারহীনতার শঙ্কা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা থেকেই এ ধরনের আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। তবে এটি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। প্রতিবাদের নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার সংস্কৃতি মানুষের জীবন ও সম্পত্তিকে অনিরাপদ করে তুলবে। যে কেউ প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য মব সৃষ্টি করতে পারে। দেশ বাসযোগ্য থাকবে না। একপর্যায়ে রাষ্ট্র হয়ে যাবে অকার্যকর। সরকার আসে সরকার যায় শিশু নির্যাতন, নারী-নিগ্রহ ও হত্যাযজ্ঞের অবসান হয় না। এখনই ভাবতে হবে, সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। শিশুর ভবিষ্যৎ দুর্বৃত্তদের হাতে ছেড়ে দেয়া যাবে না। প্রতিটি জেলায় বিশেষ আদালত গঠন করে শিশুধর্ষণ ও শিশুহত্যার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, আপিলেট ডিভিশনের দীর্ঘ ও বিরক্তিকর প্রক্রিয়াকে সহজতর করে রায় কার্যকর করতে হবে। দ্রুত ও কঠোর প্রয়োগ থাকলে মানুষ আইন ও বিচারকে ভয় পাবেই।
এ দুটি হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন বলা যাবে না। সামাজিক অপরাধ সংঘটনের ধারাবাহিকতা মাত্র। জননিরাপত্তার কতটুকু ঘাটতি থাকলে বিগত সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময়ে ১৫৫টি শিশুর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে ধর্ষণ, বলাৎকার ও নির্যাতনে। কেবল শিশু নয়, যেকোনো বয়সের মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে। একশ্রেণীর মানুষরূপী দানব বিগত সাত মাসে দুই হাজার ৩৬২ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।
কেন এক শ্রেণীর মানুষ ছোট্ট সোনামণিদের ওপর পাশবিকতার তাণ্ডব চালায়। কেন নৃশংসপন্থায় তাদের হত্যা করে বন বাদাড়ে ও ডোবায় ফেলে দেয়। এর মৌলিক কারণ, ঘাতক মনে করে তার শাস্তি হবে না। জঘন্য অপরাধ করেও পার পেয়ে যাবে। কারণ তার রাজনৈতিক বড়ভাই আছে অথবা বিপুল বিত্ত-ভৈবব আছে। হত্যা ও ধর্ষণের বিচারে দীর্ঘপ্রক্রিয়া ও উচ্চ আদালতে মামলার অস্বাভাবিক জট একজন অপরাধীকে অপরাধে প্রলুব্ধ করে। শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ও অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও বিচার না হলে অপরাধীর মধ্যে শাস্তির ভয় হ্রাস পায় এবং ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শিশু সুরক্ষার জন্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। অপরাধের আগে প্রতিরোধ, ঘটলে দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, প্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ রাখা, শিশুবান্ধব তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং ভুক্তভোগী শিশুর জন্য সামাজিক ও মানসিক সহায়তা। এর কোনো একটি দিক দুর্বল থাকলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই কঠোর শাস্তির পাশাপাশি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরকে একই সাথে শক্তিশালী করতে হবে। স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ যেখানে শিশুরা যায়, সেখানে তাদের নিরাপত্তার জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন শিশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয় হয়, কোনোভাবেই ঝুঁকির স্থান না হয়। অপরাধপ্রবণতা কমাতে পরিবার, শিক্ষা ও সমাজের নৈতিক ভিত্তিও শক্তিশালী করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলো শিশুর মর্যাদা, আমানতদারি, আত্মসংযম ও মানুষের অধিকার বিষয়ে নিয়মিত সচেতনতা তৈরি করতে পারে।
অপ্রতিম ও কলিহত্যার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এখন জরুরি। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের আলামত ও মুঠোফোন উদ্ধার এবং তদন্তে অগ্রগতি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু কোনো অপরাধের পর আসামি শনাক্ত ও গ্রেফতার করাই রাষ্ট্রের দায়িত্বের শেষ কথা হতে পারে না। প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই সম্ভাব্য বিপদ শনাক্ত করে একটি শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়।
একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় ডায়েরি করা হলো অথচ তার প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হলো না কেন, সে রহস্য উদঘাটন করা অত্যন্ত জরুরি। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঠিক কোথায় গাফিলতি ছিল, শিশুটি ঠিক কোন সময় থেকে বিপদের মুখে পড়েছিল এবং আশপাশের লোকজন বা পুলিশ প্রশাসনের নজর এড়ালো কিভাবে— তদন্তপ্রক্রিয়ায় এসব প্রশ্নের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কোনো অপরাধ ঘটার পর দ্রুত আসামি ধরাটাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একমাত্র সাফল্য হতে পারে না বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নির্ধারিত হওয়া উচিত অপরাধ ঘটার আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা, প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং নাগরিকদের জীবন রক্ষা করার ক্ষমতার ওপর।
তবে শিশুর নিরাপত্তার দায়িত্ব কেবল রাষ্ট্রের নয়; পরিবার ও সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যদের সন্তানদের চলাফেরা, বন্ধুত্ব ও দৈনন্দিন পরিবেশ সম্পর্কে আরো সচেতন হতে হবে। সন্তান কার সাথে মিশছে, কোথায় খেলছে, কার সাথে নিয়মিত সময় কাটাচ্ছে— এসব বিষয়ে অভিভাবকদের খোঁজ রাখা জরুরি। সে কোনো কিশোর গ্যাং বা অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত হচ্ছে কি না, অনলাইনে কার সাথে যোগাযোগ করছে, পর্নোগ্রাফি বা অন্যান্য ক্ষতিকর ডিজিটাল কনটেন্টের আসক্তির ঝুঁকিতে পড়ছে কি না— এসব বিষয়ও অবহেলা করা যাবে না। অবশ্যই এই নজরদারি হতে হবে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও আস্থার ভিত্তিতে; অযথা সন্দেহ বা দমন-পীড়নের মাধ্যমে নয়। অপ্রতিম মায়ের দামি আইফোন নিয়ে বাইরে যেতে পারল কেন, এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। মসজিদের ইমাম-খতিব, আলেম-ওলামা, অন্যান্য ধর্মীয় নেতা ও পুরোহিতদের নিজ নিজ উপাসনালয়ে শিশু হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও নিপীড়নের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে নিয়মিত নৈতিকতাভিত্তিক বক্তব্য রাখতে হবে। মানুষের জীবন ও মর্যাদা রক্ষা, দুর্বল ও অসহায়ের প্রতি দায়িত্ব, আত্মসংযম, পাপ থেকে বিরত থাকা এবং অপরাধ গোপন না করে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানোর বিষয়ে ধর্মীয় ও নৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজে নৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে।
প্রতিটি শিশু যেন নিশ্চিন্তে ঘর থেকে বের হতে পারে, বিদ্যালয় বা খেলাধুলা শেষে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারে এবং মা-বাবা যেন প্রতিদিন সন্তানের অপেক্ষায় আতঙ্কিত না থাকেন— এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। অপ্রতিমের মায়ের মতো আর কোনো মা-বাবাকে যেন সন্তানের রক্তাক্ত মরদেহ শনাক্ত করতে না হয়— এটাই হওয়া উচিত আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।
লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
drkhalid09@gmail.com








