ইরানকে ট্রাম্পের ধ্বংসের হুমকির পরও আলোচনায় দুই পক্ষ

 নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলমান সঙ্ঘাতের সমাধান না হলে ইরানকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের হুমকি দেয়ার দিনেই নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘের সদর দফতরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন। আলজাজিরা জানায়, কাতারের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ অংশ নেন। গত জুনের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর এটিই দুই পক্ষের মধ্যে প্রথম আলোচনা। তবে বৈঠক থেকে কোনো অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি।
উইটকফ বলেছেন, এক দফা আলোচনা শেষ হয়েছে। আমরা আশা করি আলোচনার এই পর্ব গঠনমূলক ও আশাব্যঞ্জক প্রমাণিত হবে। অন্য দিকে, ইরান আবার যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ‘আগ্রাসী কর্মকাণ্ড’ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে বিমান হামলা শুরু করে। এর জবাবে ইরান ইসরাইল, উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্রদের ওপর হামলা চালায়। একইসাথে তারা হরমুজ প্রণালীও বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হতো। প্রণালীটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম ওঠানামা করছে। এ পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধ শেষ করার জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ বেড়েছে, বিশেষ করে নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচন থাকায়।
মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে দেয়া ভাষণে ট্রাম্প প্রথমে অর্থনীতি, অভিবাসন, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং সহিংস অপরাধ মোকাবেলায় তার সরকারের অর্জন তুলে ধরেন। তার বক্তব্য জাতিসঙ্ঘের সম্মেলনকক্ষে থাকা কূটনীতিকদের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন ভোটারদের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যের মতোই বেশি শোনাচ্ছিল। ভাষণের বড় একটি অংশে ট্রাম্প ইরানে যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, ইরানের সাথে সঙ্ঘাত তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রেখেছে। ট্রাম্প এমন এক নীতির কথা বলেন, যেটিকে তিনি শক্তির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা হিসেবে বর্ণনা করেন। আর তা হচ্ছে, সমঝোতা বা আপসের পরিবর্তে কঠোর আলটিমেটাম ও হুমকি দেয়া।
তিনি বলেন, ‘ইরানের সাথে কি এমন একটি চুক্তি হবে, যার মাধ্যমে তারা আবার গড়ে উঠতে পারবে এবং আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী একটি দেশ হয়ে উঠতে পারবে? “নাকি আমি ইসলামী প্রজাতন্ত্রটিকে ধ্বংস করে দেবো এবং তা দ্রুতই করব, যাতে তারা আবার মানুষ ও বিভিন্ন দেশকে হত্যা ও ধ্বংস করার সুযোগ না পায়?” ট্রাম্প বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, নভেম্বরের নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই ইরানের সাথে একটি সমঝোতা হতে পারে। ইরানের সাথে এখন পর্যন্ত কাক্সিক্ষত কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারা ট্রাম্পের এমন সব কথা তার পররাষ্ট্রনীতির কৌশলেরই ইঙ্গিত। এই কৌশলে তিনি একদিকে শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিচ্ছেন, আবার অন্য দিকে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগও খোলা রাখছেন।
 ‘খুব ভালো’ আলাপ হয়েছে : ট্রাম্প
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, ইরানের নেতাদের সাথে মার্কিন কর্মকর্তাদের তিন ঘণ্টাব্যাপী ‘খুব ভালো’ বৈঠক হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের সাথে খুব ভালো, খুবই ফলপ্রসূ একটি বৈঠক হয়েছে।’ আলজাজিরার খবরে বলা হয়, ট্রাম্প জানান, ইরানের সাথে আলোচনায় নেতৃত্ব দেয়া মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার মঙ্গলবারের ওই বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় ট্রাম্পের সাথে থাকা উইটকফও বৈঠকটিকে ‘খুব ভালো’ বলে উল্লেখ করেন। তবে তিনি আর কোনো বিস্তারিত জানাননি। ট্রাম্প বলেন, ‘খুব নিকট ভবিষ্যতে’ আরেকটি বৈঠকের সময় নির্ধারিত হয়েছে।
দ্বিতীয় দফার আলোচনা কোথায় হবে, জানতে চাইলে হোয়াইট হাউজ আলজাজিরাকে প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে। ইরানের সাথে আলোচনায় কী নিয়ে কথা হয়েছে, সে বিষয়ে ট্রাম্প কোনো বিস্তারিত জানাননি। তবে তিনি বলেন, দেশটি এমন এক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি, যেটিকে তিনি ‘অসাধারণ সম্ভাবনা অথবা সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হিসেবে বর্ণনা করেন। দিনের শুরুতে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে দেয়া বক্তব্যেও তিনি একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। আলজাজিরার প্রধান মার্কিন সংবাদদাতা অ্যালান ফিশার বলেন, ট্রাম্পের জাতিসঙ্ঘের ভাষণের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৈঠকটি ছিল একটি ‘অদ্ভুত বৈপরীত্য।’ ফিশার বলেন, ‘কিছুটা হলেও মনে হচ্ছে, তারা কোনো ধরনের শান্তিচুক্তির দিকে এগোতে পারবে, এমন একটি আশাবাদের আবহ রয়েছে।’ 
ট্রাম্পের হুমকি কৌশলগত হতাশার লক্ষণ : ইরান
তবে ইরানকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকিকে কৌশলগত হতাশার লক্ষণ বলে মন্তব্য করেছে ইরানের সামরিক বাহিনী। একই সাথে তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে আগের চেয়েও ‘ধ্বংসাত্মক’ হামলার জন্য তারা প্রস্তুত। ইরানের জেনারেল স্টাফের এক বিবৃতি দেশটির মেহের নিউজ এজেন্সি প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চকে ব্যবহার করে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘আগ্রাসনকে’ ন্যায্যতা দেয়ার চেষ্টা করছেন। ইরানের সামরিক বাহিনী বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ট্রাম্পের এমন বক্তব্য আসলে ‘কৌশলগত অচলাবস্থা’র প্রকাশ। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ট্রাম্পের বারবার হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির প্রমাণ নয় বরং তাদের ‘কৌশলগত হতাশার’ বহিঃপ্রকাশ। বিবৃতিতে ইরানের সামরিক বাহিনী আরো সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য তারা প্রস্তুত। এসব হামলা আগের হামলার তুলনায় আরো ‘ধ্বংসাত্মক’ ও ‘কম অনুমানযোগ্য’ হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে।
এ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানসংক্রান্ত বক্তব্যকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনাও সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে বৈরিতাপূর্ণ। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে একাধিকবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ট্রাম্পের নতুন হুমকি এবং তার বিপরীতে ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়া পুরনো বিরোধকে নতুন করে সামনে এনেছে।
ইরানের সামরিক নেতৃত্বের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপকে কৌশলগত অচলাবস্থার সাথে যুক্ত করেছে। তাদের দাবি- ইরানের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের পরও যুক্তরাষ্ট্র কাক্সিক্ষত অবস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি এবং সে কারণেই ট্রাম্পের বক্তব্যে হুমকির ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি অবশ্য ইরানের সামরিক নেতৃত্বের নিজস্ব মূল্যায়ন; এর সত্যতা বা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত এই বক্তব্য থেকে টানা যায় না।
একইভাবে ইরানের পক্ষ থেকে আরো বিধ্বংসী ও অপ্রত্যাশিত হামলার হুমকিকেও দেশটির সামরিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই ধরনের বক্তব্যের বাস্তব সামরিক পরিকল্পনা কী এবং ইরানের প্রকৃত সক্ষমতা কতটা তা বিবৃতিতে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে প্রকাশ্য বক্তব্যের বাইরে সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন।