এলএনজির দামে ব্যয়ের চাপ উৎপাদনশিল্পে

শাহ আলম নূর 

Advertisement

আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়ছে এর প্রভাব দেশের শিল্প খাতে বেশ ভালোভাবেই লেগেছে। দেশে গ্যাসের ঘাটতি পূরণে সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে প্রায় ৩০ ডলার পর্যন্ত দামে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি কিনতে হচ্ছে, যা কয়েক বছর আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয়ে আমদানি করা সেই গ্যাসও শিল্পকারখানার চাহিদানুযায়ী সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি কিনতে বাড়ছে রাষ্ট্রের ব্যয়, অথচ গ্যাসের নিম্নচাপে শতভাগ উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগতে পারছে না দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো। 
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের গ্যাস সঙ্কট এমন পর্যায়ে নেমে এসেছে যে, পোশাক, বস্ত্র, স্পিনিং, ডাইং, স্টিল, কাচ, কাগজ ও অন্যান্য গ্যাসনির্ভর শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা অব্যাহতভাবে কমে যাচ্ছে। কোথাও কয়েক ঘণ্টা, কোথাও দিনের বড় একটি সময় উৎপাদন বন্ধ থাকছে। এতে শুধু কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে না; বাড়ছে প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন খরচ, পিছিয়ে যাচ্ছে রফতানি আদেশ এবং বাড়ছে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা। তারা বলছেন, চড়া দামে এলএনজি আমদানি করেও যদি শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে জ্বালানি ব্যয়ের এই বাড়তি চাপ শেষ পর্যন্ত দেশের উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতার ওপরই পড়ছে। 
এ দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ সঙ্কটে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নতুন করে বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে। 
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন দিয়ে চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না, আবার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসার কথা থাকা কিছু এলএনজি সময়মতো না পাওয়ায় ঘাটতি পূরণে সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায়। 
গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, সরকার ভিটল এশিয়া থেকে একটি কার্গো ২৯ দশমিক ৭৯৫ ডলার এবং টোটাল এনার্জিজ গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার থেকে আরেকটি কার্গো ২৮ দশমিক ৯৫ ডলার প্রতি এমএমবিটি দরে কেনার অনুমোদন দিয়েছে। প্রতিটি কার্গোতে প্রায় ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটি এলএনজি থাকে। এমন পরিস্থিতিতে একটি কার্গোর দাম প্রায় ১০ কোটি ডলারে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ২৩০ কোটি টাকা।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলএনজির উচ্চমূল্যের কারণে দেশের শিল্প প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যাচ্ছে এবং উৎপাদন কমছে। বিষয়টি শিল্প খাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। এলএনজির দাম বাড়ার সাথে সাথে গ্যাস গ্রাহকদের জন্য সরকারের দেয়া ভর্তুকিও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে অন্যান্য উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হচ্ছে। 
দেশে উৎপাদ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই সঙ্কটের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি আসে আমদানি করা এলএনজিনির্ভর গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে শুধু শিল্পের জ্বালানি ব্যয় নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়ে। একই সাথে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। এতে তৈরি হয় একটি দ্বিমুখী চাপ- এক দিকে জ্বালানি কিনতে সরকারের ব্যয় বাড়ছে, অন্য দিকে পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা কমছে। 
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেই বাংলাদেশ বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে বছরে জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ সমপরিমাণ ভর্তুকি দিত। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম আরো বেড়ে যাওয়ায় এই ভর্তুকির চাপ আরো বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যাচ্ছে যে অন্যান্য উন্নয়ন কর্মসূচিতে অর্থ ব্যয় করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলএনজির বাজারে বর্তমান অস্থিরতার বড় কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত এবং হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে সরবরাহে বিঘœ। বাংলাদেশের প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী কাতার থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটি স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির তুলনায় বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে সরকারকে। 
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু গ্যাসের বিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গ্যাসের চাপ কম থাকলে কারখানার যন্ত্রপাতির উৎপাদনক্ষমতা কমে যায়, একই পরিমাণ পণ্য উৎপাদনে বেশি সময় লাগে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়। এতে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় থাকা বাংলাদেশের রফতানিমুখী শিল্পের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে তিনি মনে করেন। 
তিনি বলেন, বিশেষ করে পোশাক ও বস্ত্র খাতে গ্যাস সরবরাহের ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিংয়ের মতো উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বয়লার চালাতে গ্যাস প্রয়োজন হয়। গ্যাসের চাপ কমে গেলে পুরো উৎপাদন চক্র ব্যাহত হতে পারে। কোনো একটি পর্যায়ে উৎপাদন আটকে গেলে পরবর্তী পর্যায়েও তার প্রভাব পড়ে। ফলে গ্যাস সঙ্কটের কারণে উৎপাদন কমার পাশাপাশি ক্রেতার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। 
এমন পরিস্থিতিতে দেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে, উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি করেও যদি শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত ব্যয়ের বিপরীতে কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া কঠিন হবে। স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়ানো হলেও শিল্পাঞ্চলে প্রয়োজনীয় চাপ না থাকলে উৎপাদন সঙ্কট থেকেই যাবে বলে বিজিএমইএ সভাপতি মনে করছেন। 
এ দিকে দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সঙ্কটকে শুধু আমদানি বাড়িয়ে মোকাবেলা করলে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হবে না; কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিবার দাম বাড়ার সাথে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় এবং সরকারি ভর্তুকির চাপ বাড়বে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। 
সরকার অবশ্য আমদানিনির্ভরতা কমাতে বিকল্প উৎসের দিকে নজর দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি সরবরাহে বিঘেœর কারণে বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও চীনের দিকে তাকাচ্ছে। রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানির সম্ভাবনা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে সীমিত বলে জানা গেছে। 
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদে আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে শিল্পের বর্তমান সঙ্কট মোকাবেলায় তাৎক্ষণিকভাবে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ নতুন সৌরবিদ্যুৎ বা পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হতে সময় লাগবে। কিন্তু শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ বা কমে যাওয়ার ক্ষতি প্রতিদিনই অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে। তিনি বলেন, এলএনজির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবকে শুধু জ্বালানি খাতের ব্যয় হিসেবে দেখলে সঙ্কটের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। উচ্চ জ্বালানি ব্যয় শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়ায়, ভর্তুকির মাধ্যমে সরকারের অর্থের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দিতে পারে। একই সাথে উৎপাদন কমলে রফতানি আয়, কর রাজস্ব এবং কর্মসংস্থানের ওপরও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। 
তিনি বলেন, এলএনজির বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য একই সাথে জ্বালানি, শিল্প ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক দিকে চড়া দামে এলএনজি কিনে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা, অন্য দিকে সেই বাড়তি ব্যয়ের কারণে সরকারের উন্নয়ন বাজেটে চাপ- দুই দিক থেকেই সঙ্কটটি গভীর হচ্ছে। এর সাথে শিল্পকারখানায় গ্যাসের নিম্নচাপ যুক্ত হওয়ায় উৎপাদন খাতও পড়ছে বাড়তি ঝুঁকিতে।