জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ

বিশেষ সংবাদদাতা
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতার কারণে দেশে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরির আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ পরিস্থিতিতে এখনই নীতি সুদহার পরিবর্তন না করে অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটি (এমপিসি)। ফলে নীতি সুদহার আগের মতোই ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল থাকছে।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির ১৪তম বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে, যখন দেশে মূল্যস্ফীতি এখনো সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। চলতি অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। একই সময়ের মধ্যে মূল্যস্ফীতি প্রায় একই মাত্রায় নামানোর লক্ষ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকও। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি এখনো সেই লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, আগস্টে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আর পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমতির দিকে থাকলেও তা এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের কাক্সিক্ষত সীমার নিচে নামেনি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পণ্য পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন, নির্মাণ, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ে। ফলে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ও বাড়ে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে। বিশেষ করে ডিজেলনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পণ্যের বাজারে অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি করতে পারে। দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য পরিবহনে ব্যয় বাড়লে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া কৃষি খাতেও জ্বালানি তেলের মূল্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেচ, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র পরিচালনায় জ্বালানি ব্যবহারের কারণে তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যয় বাড়ে। শিল্প খাতেও পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের মাধ্যমে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।
এ দিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নকেও মূল্যস্ফীতির অন্যতম সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংকের এমপিসি। বেতন বৃদ্ধির ফলে সরকারি কর্মচারীদের ব্যয় করার সক্ষমতা বাড়াতে পারে। অর্থনীতিতে পণ্য ও সেবার চাহিদা যদি একই সময়ে বাড়ে, কিন্তু সরবরাহ সেই অনুপাতে না বাড়ে, তবে মূল্যস্তরের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে আয়, ভোগ, উৎপাদন ও বাজার সরবরাহের সামগ্রিক গতিপ্রকৃতির ওপর।
এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো নীতি সুদহার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার বাড়িয়ে ঋণের খরচ বাড়াতে পারে, যার মাধ্যমে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাহিদা কমানোর চেষ্টা করা হয়। আবার মূল্যস্ফীতির চাপ কমে এলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে সুদহার কমানোর সুযোগ থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বশেষ জুলাইয়ে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করে। প্রায় ছয় বছর পর সেটিই ছিল নীতি সুদহার কমানোর প্রথম সিদ্ধান্ত। নতুন হার গত ২ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়।
এর পরপরই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের কারণে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় এখনই আবার সুদহারে পরিবর্তন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এমপিসি। কমিটির বিবেচনায়, বর্তমানে অর্থনীতিতে একই সাথে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বিভিন্ন অভিঘাত কাজ করছে। ফলে নীতি সুদহার পরিবর্তনের আগে এসব অভিঘাত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) মূল্যস্ফীতির ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
অন্য দিকে মুদ্রানীতি কমিটি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সঙ্ঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতাকেও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে সংগ্রহ করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। একই সাথে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক লেনদেনের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে আপাতত নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু সুদহার নির্ধারণই যথেষ্ট নয়- জ্বালানি মূল্য, বাজার সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার, খাদ্যপণ্যের দাম এবং সরকারি ব্যয়ের গতিপ্রকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও নতুন বেতনকাঠামোর প্রভাব কতটা দ্রুত পণ্য ও সেবার দামে প্রতিফলিত হয় এবং একই সাথে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা কতটা স্থিতিশীল রাখা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অভিঘাতের প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিপথ বিবেচনা করেই পরবর্তী সময়ে নীতি সুদহার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ফলে আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতির গতিপথ, জ্বালানি বাজার এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তথ্যই পরবর্তী মুদ্রানীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

Advertisement