বিশ্বসঙ্কট ও ভূরাজনীতি ঘিরে ৮১তম জাতিসঙ্ঘ সাধারণ অধিবেশন শুরু
জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তেনিও গুতেরেস আয়োজিত স্বাগত প্রাতঃরাশ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান : পিআইডি

 রয়টার্স

বিশ্বজুড়ে চলমান সামরিক সঙ্ঘাত, ভূরাজনৈতিক তীব্র উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক সঙ্কটের আবহেই নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘের সদর দফতরে শুরু হয়েছে সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) বার্ষিক উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। গতকাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া এই মহাসম্মেলনে অংশগ্রহণ করে বৈশ্বিক বহুমুখী ইস্যু ও সঙ্কট মোকাবেলায় বক্তব্য তুলে ধরছেন বিশ্বের অন্তত ১৩০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান।
গত ৮ সেপ্টেম্বর পরিষদের ৮১তম বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতির পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কূটনীতিক খলিলুর রহমান। গতকাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া এই সাধারণ বিতর্ক অনুষ্ঠানটিই মূলত দুই সপ্তাহের বার্ষিক সম্মেলনের মূল আকর্ষণ। আমেরিকান সময়সীমা অনুযায়ী সাধারণ বিতর্ক পর্বটি গত মঙ্গলবার থেকে সূচিত হয়ে আগামী শনিবার পর্যন্ত পরিচালিত হবে। মাঝে আগামী রোববারের বিরতি দিয়ে আগামী সোমবার পুনরায় অধিবেশন শুরু হবে। প্রত্যহ দু’টি ভিন্ন সেশনে বক্তব্য পর্ব চলছে; প্রথম পর্বটি নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সময় সকাল ৯টা থেকে বেলা পৌনে ৩টা এবং দ্বিতীয় পর্বটি বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত কার্যকর রয়েছে। প্রথা মেনে প্রতি দেশের প্রতিনিধিকে ১৫ মিনিটে বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে তা দীর্ঘায়িত হয়।
জাতিসঙ্ঘের বিদায়ী মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস তার বার্ষিক মূল্যায়ন উপস্থাপনের মাধ্যমে আলোচনার সূচনা করেন, যা মহাসচিব পদে তার অন্যতম শেষ গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা। এরপর সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে অধিবেশনের উদ্বোধন করেন। প্রথাগত নিয়ম অনুযায়ী ১৯৫৫ সাল থেকে শুরু হওয়া রেওয়াজ মেনে ব্রাজিল সর্ব প্রথম বক্তা হিসেবে মঞ্চে ওঠে। স্বাগতিক দেশ হিসেবে দ্বিতীয় স্থানে বক্তব্য দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্য সদস্যদেশগুলোর সময়ক্রম প্রধান প্রতিনিধির রাজনৈতিক পদমর্যাদা, ভৌগোলিক অবস্থান ও সময় পছন্দের ভিত্তিতে সমন্বয় করা হয়েছে। সদস্যহীন পর্যবেক্ষক দল হিসেবে ভ্যাটিকান সিটি, ফিলিস্তিন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও বক্তার তালিকায় স্থান দেয়া হয়েছে। প্রতি বছর ম্যানহাটনে ইস্ট নদীর তীরে অবস্থিত ১৯৪৯ থেকে ১৯৫২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে নির্মিত জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মুক্ত অঞ্চলে এ সম্মেলন আয়োজিত হয়ে আসছে। তবে সুদীর্ঘ ইতিহাসে ব্যতিক্রম হিসেবে ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতকে যুক্তরাষ্ট্র ভিসা না দেয়ায় সেবার সাধারণ সভা সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় স্থানান্তর করা হয়েছিল। একই ধারায়, এবারো ট্রাম্প প্রশাসন ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের ভিসা প্রদানে অস্বীকৃতি জানানোয় আয়োজক চুক্তি লঙ্ঘনের সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস সরাসরি উপস্থিত না থেকে ভার্চয়াল মাধ্যমে চিত্রায়িত বক্তব্য পাঠাবেন।
এবারের অধিবেশনে মূল বিষয়ভিত্তিক প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- ‘আস্থা পুনর্বহাল ও রূপান্তর ব্যবস্থাপনা : সবার জন্য কার্যকর জাতিসঙ্ঘ।’ মূল আলোচনার বাইরে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মহামারি মোকাবেলা, বর্ণবাদ নিরসন ও পারমাণবিক অস্ত্র বিলুপ্তির মতো জরুরি ইস্যুতে বেশ কিছু উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনার বড় অংশজুড়ে থাকছে মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সংস্থার অভ্যন্তরীণ অর্থসংকট।
 এ দিকে আগামী ৩১ ডিসেম্বর বর্তমান মহাসচিবের মেয়াদ পূর্ণ হতে চলায় নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়েও নিউ ইয়র্কে জোর রাজনৈতিক গুঞ্জন চলছে। ১৯৪৫ সালের পর এখন পর্যন্ত কোনো নারী নেতৃত্ব না পাওয়ায় এবার প্রথম নারী মহাসচিব নিয়োগের প্রস্তাব তুলেছে নিরাপত্তা পরিষদের বেশ কিছু দেশ। এই দৌড়ে কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রেবেকা গ্রিনস্প্যান এবং গায়ানার স্থায়ী প্রতিনিধি ক্যারোলিন রড্রিগেজ-বার্কেট শীর্ষ অবস্থানে রয়েছেন। সমালোচকদের মতে, ৫১টি দেশ নিয়ে শুরু হয়ে বর্তমানে ১৯৩টি সদস্যে পৌঁছানো এই বিশ্বমঞ্চ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ক্রমবর্ধমান ব্যর্থতার মুখোমুখি হচ্ছে। যেখানে সাধারণ পরিষদের ক্ষমতা পরামর্শমূলক, সেখানে স্থায়ী পাঁচ সদস্যের ভেটো ক্ষমতার অধিকারী নিরাপত্তা পরিষদই মূল আইনি ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে।
জাতিসঙ্ঘের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের কার্যক্রমে যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকালে নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে আয়োজিত কর্মসূচিতে তিনি বিশ্বনেতাদের সাথে অংশ নেন। তার সাথে ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা : সবার জন্য কার্যকর জাতিসঙ্ঘ’। প্রায় ১৩০টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন।
প্রথম জাতিসঙ্ঘ ভাষণ ২৪ সেপ্টেম্বর
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেবেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই হবে জাতিসঙ্ঘে তার প্রথম ভাষণ। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, তার বক্তব্যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের আকাক্সক্ষার পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, শান্তি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পাবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচি অনুযায়ী নিউ ইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রী জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূত এবং জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী ও মানবাধিকারবিষয়ক কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করবেন।
এ ছাড়া অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে মেটা, ওয়াল স্ট্রিট ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সাথেও বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে। এসব আলোচনায় বিনিয়োগ, উৎপাদন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য
এবারের জাতিসঙ্ঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের উপস্থিতির একটি বাড়তি তাৎপর্য রয়েছে। ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এর আগে ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের কূটনীতিক হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ৪১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি ছিলেন। চার দশক পর আবার একজন বাংলাদেশী এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এসেছেন।
ড. খলিলুর রহমান ২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকুরিসকে পরাজিত করে সভাপতি নির্বাচিত হন। শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৎকালীন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো: তৌহিদ হোসেনকে প্রার্থী করা হয়েছিল; পরবর্তী সরকার পরিবর্তনের পর খলিলুর রহমান বাংলাদেশের প্রার্থী হন।
ফলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশেরই একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একই সময়ে জাতিসঙ্ঘের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ফোরামের উচ্চপর্যায়ের কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।