এলসি নিষ্পত্তিতে শিল্প কাঁচামাল কমেছে বেড়েছে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের চাপ

 বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমলেও ঋণ, বিনিয়োগ ও উৎপাদন অর্থনীতির বেশ কিছু সূচকে এখনো দুর্বলতা স্পষ্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাপ্তাহিক নির্বাচিত অর্থনৈতিক সূচকে দেখা যাচ্ছে, আগস্ট ২০২৬-এ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। এক বছর আগে একই সময়ে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। তবে ব্যাংকিং খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত জুন ২০২৬-এ মোট বকেয়া ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি কমার পাশাপাশি আর্থিক খাতের ঝুঁকি কমছে- এমন সরল চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্য দিকে ২০২৬ সালের জুলাই-আগস্টের এলসি (ঋণপত্র) তথ্যেও অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও শিল্প উৎপাদনের মিশ্র প্রবণতা ফুটে উঠেছে। মোট এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে সামান্য; কিন্তু শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি উপ খাতে আমদানি কমেছে। বিপরীতে পেট্রোলিয়াম ও অন্যান্য পণ্যের এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে।
এলসি প্রবাহে স্থবিরতার ইঙ্গিত
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট সময়ে মোট এলসি খোলার পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ০৬৭৮ ১৪৯ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার, যা ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ কম। মধ্যবর্তী পণ্যে নিষ্পত্তি ৪৩১ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার, কমেছে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।
শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের এলসি নিষ্পত্তিও ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৯৩৭৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। শিল্প উৎপাদনের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা ও বিনিয়োগের জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতি এবং শিল্প কাঁচামালের আমদানি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ প্রবণতা অর্থনীতির উৎপাদনমুখী অংশে চাপের ইঙ্গিত দিতে পারে। 
তবে সম্পূর্ণ চিত্র নেতিবাচক নয়। পেট্রোলিয়াম পণ্যের এলসি নিষ্পত্তি ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ বেড়ে ৯০৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে শিল্প খাতে অন্যান্য পণ্যের নিষ্পত্তি বেড়েছে ৪ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং বাণিজ্যিক খাতে ৫ দশমিক ০৯ শতাংশ।
ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির পরিমাণও ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ কমে ৮১৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নামলেও স্বস্তি সীমিত
আগস্টে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। জুলাইয়ে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসে সামান্য কমেছে। তবে বারো মাসের গড় মূল্যস্ফীতি আগস্টে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা জুলাইয়ের ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশের সমান।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এক বছর আগের তুলনায় মূল্যস্ফীতির কাঠামো বদলালেও সাধারণ মানুষের ওপর দামের চাপ পুরোপুরি দূর হয়নি। আগস্ট ২০২৫-এ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং বারো মাসের গড় ছিল ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ গড় মূল্যস্ফীতি কমেছে; কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্তর এখনো উচ্চ অবস্থানে রয়েছে।
এ কারণে মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়াকে সরাসরি পণ্যের দাম কমে যাওয়ার সাথে সমান করে দেখার সুযোগ নেই। মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ সাধারণত দাম বৃদ্ধির গতি কমেছে; আগের উচ্চ মূল্যস্তর থেকে দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি।
ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি খেলাপি ঋণ
অর্থনীতির আরেকটি বড় উদ্বেগ ব্যাংকিং খাতের শ্রেণিকৃত ঋণ। ২০২৪ সালের জুনে মোট বকেয়া ঋণের ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ ছিল শ্রেণিকৃত। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ হয়। ২০২৫ সালের মার্চে ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং জুনে ৩৪ দশমিক ৪০ শতাংশে ওঠে। সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ তা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছে।
ডিসেম্বর ২০২৫-এ কিছুটা কমে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ হলেও ২০২৬ সালের মার্চে আবার বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং জুনে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ হয়েছে।
অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতে ঋণমানের অবনতির সমস্যা এখনো ব্যাপক। জুন ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী প্রতি ১০০ টাকার বকেয়া ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা শ্রেণিকৃত ঋণের আওতায় পড়েছে। নেট ভিত্তিতেও একই ধরনের চাপ রয়েছে। নেট শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত ২০২৪ সালের জুনের ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে ১৫ দশমিক ২২ শতাংশ হয়েছে।
কৃষি ঋণে প্রবাহ বাড়ছে
কৃষি ও অকৃষি গ্রামীণ ঋণে তুলনামূলক ইতিবাচক প্রবণতা রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এ খাতে বিতরণ হয়েছে দুই হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। আগের বছরের জুলাইয়ের দুই হাজার ১৫৪ কোটি টাকার তুলনায় তা ২৩ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি ও অকৃষি গ্রামীণ ঋণ বিতরণ হয়েছে ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা, যেখানে আগের অর্থবছরে ছিল ৩৭ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। একই সময়ে ঋণ আদায় বেড়ে হয়েছে ৪৫ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের ৩৮ হাজার ২৫ কোটি টাকার চেয়ে উল্লেখযোগ্য বেশি।
জুলাই ২০২৬ শেষে এ খাতে স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। 
এর অর্থ, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাংকঋণের প্রবাহ এবং আদায়- দুই ক্ষেত্রেই সম্প্রসারণ ঘটছে। তবে মোট অর্থনীতিতে এর প্রভাব কতটা হচ্ছে, তা নির্ভর করবে ঋণটি উৎপাদনশীল খাতে কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে তার ওপর।