
নিজস্ব প্রতিবেদক
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সরকারকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভূতে ধরেছে। এজন্য সরকার একের পর এক গণবিরোধী কাজ করছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার গণভোটের রায় মেনে নেয়নি। সংসদে জুলাই সনদ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ সব অধ্যাদেশ বাতিল করেছে।
গতকাল সোমবার বিকেলে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ সংগঠনটির ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিলের আগে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি জনগণের ওপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সাত মাসের মধ্যে তিনবার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। ফলে দ্রব্যমূল্যসহ সবকিছুর দাম বেড়ে জনগণকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন আমরা তাকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগিতা করেছিলাম। কিন্তু তখনো সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী টুকু সাহেবের ব্যর্থতায় সরকার বেকায়দায় পড়তে হয়েছিল। এখন আবার সেই টুকু সাহেবকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে জনগণকে দুর্ভোগের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, জনগণ এখন আর বলেন না, ‘বিদ্যুৎ যায় আর আসে’; জনগণ বলে ‘টুকু যায় আর আসে’। এই নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা থেকে দেশকে রক্ষা করতে বিরোধী দলের সাথে আলোচনা করে করণীয় নির্ধারণ করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নতুবা জনগণ যেভাবে লংমার্চে রাজপথে নেমে এসেছে, পরবর্তীতে দেখা যাবে গ্রামগঞ্জ থেকে মানুষ লংমার্চ নিয়ে ঢাকার দিকে ছুটছে। তখন কিন্তু গদি রক্ষা করা যাবে না।
সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, সরকার রাতের অন্ধকারে প্রতি লিটার তেলের দাম ২০ টাকা করে বৃদ্ধি করেছে। সাত মাসে তিনবার তেলের দাম বৃদ্ধি করে সরকার জনগণের ঘাড়ে ভোগান্তির বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়লেও মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই। সর্বস্তরে দলীয়করণ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি চলছে। পুলিশকে দলীয় বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতিতে মানুষ উদ্বিগ্ন।
তিনি আরো বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করে তারা সংসদের টু-থার্ড আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সরকার জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে গণবিরোধী সরকারে পরিণত হয়েছে। অবিলম্বে গভীর রাতে তেলের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন বলেন, বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের সাত মাসে তিনবার তেলের দাম বৃদ্ধি করেছে। জ্বালানি তেলের সাথে প্রতি সেক্টর জড়িত হওয়ায় তেলের দাম বৃদ্ধি হলে এর প্রভাব সব সেক্টরে পড়ে। কিন্তু সরকার জনগণের কথা চিন্তা না করে দুর্নীতিবাজদের স্বার্থে দফায় দফায় তেলের দাম বৃদ্ধি করছে।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির মো: নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে দ্রব্যমূল্য আরো ঊর্ধ্বগতির দিকে যাবে। জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
তিনি বলেন, সরকার মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যার কথা বলে তেলের দাম বৃদ্ধি করছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যার চেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সিন্ডিকেট, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা। সরকার পে-স্কেল দেয়ার আগেই তেলের দাম বৃদ্ধি করে জনগণের পকেট থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ করে নিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, পে-স্কেলে ২৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবীকে সামান্য সুবিধা দেয়ার নামে সরকার ১৮ কোটি জনগণের পকেট কেটে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়ার জন্য তেলের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিলসহ সর্বক্ষেত্রে লুটপাট চালাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী যখন দেশের বাইরে তখন মধ্যপ্রাচ্যের কথা বলে গভীর রাতে তেলের দাম বৃদ্ধি শুধু জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টি নয়, বরং এই সিদ্ধান্ত সরকারকেও বিপাকে ফেলবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণবিরোধী এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে।
ডাকসু ভিপি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদপ্রার্থী সাদিক কায়েম বলেন, গত সাত মাসে বিএনপি সরকারের ব্যর্থতার জন্য জনগণকে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কট সমাধান করতে না পারলে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, প্রশাসনে দলীয়করণ করে, রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখা যায় না। ক্ষমতা হতে হবে জনতার জন্য। নতুবা জনতা যথাসময়ে যথাযথ জবাব দেবে।
সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানে জনগণের ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরে সাদিক কায়েম বলেন, এসব ভোগান্তি দলীয় প্রশাসক দিয়ে নিরসন সম্ভব নয়।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির মো: নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপির সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপির পরিচালনায় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় কেন্দ্রীয় ও মহানগরীর নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশ শেষে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ও মহানগরীর নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি বিজয়নগর মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।
অন্য দিকে জ্বালানি তেলের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজধানীর মহাখালীতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করেছে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর। গতকাল সোমবার বিকেল ৫টায় মহাখালী কলেরা হাসপাতালের সামনে মহাখালী রেলগেট এলাকায় এ বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর এ কর্মসূচির আয়োজন করে। মিছিল কলেরা হাসপাতালের সামনে থেকে শুরু হয়ে নাবিস্কোতে এসে শেষ হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘এই সরকার ছয় মাসের মধ্যে তিনবার জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করেছে। প্রথমবার আমাদের পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লম্বা লাইন ছিল। এই সঙ্কট দীর্ঘদিন চলার পর বিরোধী দল যখন জাতীয় সংসদে এই সঙ্কট নিয়ে কথা বলতে চেয়েছে, তার তিন দিনের মধ্যেই সব সঙ্কট শেষ হয়ে গেছে। পাম্পগুলোতে তখন সঙ্কট শেষ। এর মাধ্যমেই বুঝা গেল, একদল লোককে সরকার সুবিধা দেয়ার জন্য এই কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করা হয়েছিল।’
সভাপতির বক্তব্যে ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘ছয় মাসের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গোটা দেশব্যাপী দুর্নীতি, লুণ্ঠন ও অরাজকতার মাধ্যমে আমরা দেখতে পাচ্ছি বিএনপি সরকার অধিষ্ঠিত নয়, মনে হচ্ছে বিগত ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের একটি এক্সটিম সরকার।’
কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি ডা: ফখরুদ্দিন মানিকের উপস্থাপনায় এতে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দীন মোল্লা ও ইয়াসিন আরাফাত।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








