
হামিদুল ইসলাম সরকার
* উন্নয়ন সহযোগীর গ্যাঁড়াকলে বাপবিবো’র আধুনিকায়ন
* ব্যয় ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি : ৪ বছরে কাজ ৩০ শতাংশ
উন্নয়ন সহযোগীর কঠোর শর্ত, দফায় দফায় দরপত্র বাতিল এবং ফাইল চালাচালির মারপ্যাঁচে পড়ে গতি হারাচ্ছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বাপবিবো) এক গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র আধুনিকায়ন প্রকল্প। চার বছরে যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা টেনেটুনে সাড়ে সাত বছরে ঠেকানো হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার শুরুতেই দেড় বছরের গোলকধাঁধায় আটকে ‘বাপবিবো’র বিদ্যমান ৩৩/১১ কেভি পোল মাউন্টেড উপকেন্দ্রের নবায়ন ও আধুনিকায়ন (পর্যায়-১) প্রকল্পের খরচ বেড়ে গেছে ৩৫ থেকে ৩৬ শতাংশের বেশি, যা টাকার অঙ্কে ২৪৮ কোটি ৬৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা। অথচ বিদ্যুৎ সরবরাহের সুফল যখন গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর কথা, তখন মাঠপর্যায়ে অবকাঠামোগত মূল ভৌত অগ্রগতি থমকে আছে। প্রকল্প মেয়াদে কাজ হয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ। পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগের ১৪ জেলার ১৫টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এলাকায় ২৩টি পুরনো উডেন পোল মাউন্টেড উপকেন্দ্র নবায়ন হবে। বিতরণ সক্ষমতা ৪১০ থেকে বেড়ে ৫৩০ এমভিএ হবে। দুই হাজার ৭৬০ কিলোমিটার (৯২০ সার্কিট কিলোমিটার) বিতরণ লাইন রিকন্ডাক্টরিং করা হবে। প্রকল্প পরিচালকের দাবি, এতে সিস্টেম লস কমবে এবং সিস্টেম গড় বিদ্যুৎবিভ্রাট সময়কাল সূচক (এসএআইডিআই) ৫৫১ মিনিট থেকে ৪৯৫ মিনিটে নামবে, অর্থাৎ ১০ শতাংশ উন্নতি।
ব্যয় বাড়ছে ৩৬.৫৮ শতাংশ বা ২৪৯ কোটি টাকা : সংশোধিত প্রস্তাবনার নথির তথ্য বলছে, গত ২০২২ সালের ১০ মে একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। তখন প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৭৯ কোটি ৭২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল ১৯২ কোটি ৩৮ লাখ ৯৪ হাজার টাকা, কেএফডব্লিউর ঋণ ও অনুদান ৪৭৭ কোটি ৪০ লাখ ৫৮ হাজার টাকা এবং বাপবিবোর নিজস্ব ৯ কোটি ৯২ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। মেয়াদ ছিল ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত চার বছর।
পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে যায়। প্রথম সংশোধনে প্রস্তাব করা হয়েছে ব্যয় ৯২৮ কোটি ৩৬৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল ডিপিপির চেয়ে ২৪৮ কোটি ৬৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা বা ৩৬.৫৮ শতাংশ বেশি। কেএফডব্লিøউর ঋণ ও অনুদানের অঙ্ক ধরা হয়েছে ৭২৬ কোটি চার লাখ ৮৬ হাজার টাকা। সরকারি ও সংস্থার নিজস্ব অংশে কোনো পরিবর্তন নেই।
মেয়াদ চাওয়া ১.৫ বছর, দরকার ২ বছর : পরিকল্পনা কমিশনের কাছে পাঠানো প্রস্তাবনায় প্রথমে এক বছর ছয় মাস মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব ছিল, যাতে প্রকল্প শেষ হবে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরে; কিন্তু পিইসি সভায় প্রকল্প পরিচালক নিজেই জানান, অগ্রগতি বিবেচনায় দুই বছর বাড়ানো দরকার। আর বাপবিবো চেয়ারম্যানও এই যৌক্তিকতা সমর্থন করেন। পিইসি শেষ পর্যন্ত দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাব লিখিত যৌক্তিকতাসহ পুনর্গঠিত ডিপিপিতে দিতে বলেছে। বাড়তি ছয় মাসের জন্য ব্যয় বাড়বে না বলে জানানো হয়েছে।
প্রকল্প বিলম্বের নেপথ্যে কী : পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, জার্মান ঋণদাতা কেএফডব্লিউর শর্ত অনুযায়ী শুরুতেই একজন আন্তর্জাতিক প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সুপারভিশন পরামর্শক (পিআইএসসি) নিয়োগ করতে হয়। এই পরামর্শককেই কেএফডব্লিউর নিজস্ব গাইডলাইন মেনে ডিজাইন, ড্রয়িং, স্পেসিফিকেশন, বিওকিউ ও টেন্ডার ডকুমেন্ট তৈরি করতে হয়। এরপরই মূল কাজ শুরু করা যায়। আর পিআইএসসি নিয়োগে ডাকা প্রথম দরপত্রে সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দর ডিপিপির সংস্থানের চেয়ে প্রায় ১০৩ শতাংশ বেশি ছিল। ফলে দরপত্র বাতিল করে পুনরায় আহ্বান করতে হয়। এতেই অতিরিক্ত প্রায় এক বছর ছয় মাস চলে যায়। এ ছাড়া কেএফডব্লিউর নো অবজেকশন সনদ (এনওসি) নেয়া, দরপত্র প্রক্রিয়া ও অন্যান্য কাজেও বাড়তি সময় লেগেছে। এ দিকে পিআইএসসি নিয়োগ সম্পন্ন হয় ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি। অর্থাৎ ২০২২ সালে অনুমোদিত প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজই শেষ হতে প্রায় আড়াই বছরের বেশি লেগেছে।
২৩ উপকেন্দ্র, কাজ হয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ : প্রকল্প দলিলের তথ্য থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগের ১৪টি জেলার ১৫টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এলাকায় থাকা ২৩টি পুরনো উডেন পোল মাউন্টেড উপকেন্দ্র নবায়ন ও আধুনিকায়নের কথা। এর মাধ্যমে উপকেন্দ্রগুলোর বিতরণ সক্ষমতা ৪১০ এমভিএ থেকে বাড়িয়ে ৫৩০ এমভিএ করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ সক্ষমতা বাড়বে ১২০ এমভিএ। এ ছাড়া প্রকল্পভুক্ত উপকেন্দ্রগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট দুই হাজার ৭৬০ কিলোমিটার বিদ্যমান বিতরণ লাইন রিকন্ডাক্টরিং করার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ৯২০ সার্কিট কিলোমিটার লাইন রয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার দাবি, কাজ শেষ হলে উপকেন্দ্রগুলোর কারিগরি দক্ষতা বাড়বে, সিস্টেম লস কমবে এবং গ্রাহক পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে। পাশাপাশি সিস্টেম অ্যাভারেজ ইন্টারাপশন ডিউরেশন ইনডেক্স ৫৫১ মিনিট থেকে ৪৯৫ মিনিটে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে- অর্থাৎ প্রায় ১০ শতাংশ উন্নতি। কিন্তু সেই কাক্সিক্ষত ফল পাওয়ার আগেই প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পিইসি সভায় জানানো হয়েছে, প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জীভূত ভৌত অগ্রগতি মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ।
প্রকল্পে এখনো ঠিকাদারই নেই : শিল্প ও শক্তি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এত সময় পেরিয়েও মূল কাজের ঠিকাদার এখনো নিয়োগ হয়নি। প্রকল্প পরিচালক মূল্যায়ন কমিটিকে জানান, ২৩টি উপকেন্দ্রের নবায়ন ও আধুনিকায়নের জন্য ইপিসি ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান। চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা ২০২৬ সালের ডিসেম্বর। চুক্তির মেয়াদ হবে ১৮ মাস।
শিল্প ও শক্তি বিভাগের বিদ্যুৎ অনু বিভাগের যুগ্ম প্রধান একই সভায় জানান, প্রকল্পের ধীর গতি নিয়ে গত ১৩ জুলাই অর্থমন্ত্রীর সাথে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। সেই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তা সভাকে জানাতে অনুরোধ করেন তিনি। জবাবে বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) জানান, ইআরডি-সহ উন্নয়ন সহযোগীর সাথে আলোচনা হয়েছে এবং প্রকল্পে এখন গতি এসেছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
বিনিময় হারেই বড় অঙ্ক : প্রকল্প ও পরিকল্পনা কমিশন সংশ্লিস্টরা বলছেন, ব্যয় বৃদ্ধির বড় কারণ বিনিময় হার। বাপবিবোর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের মোট সহায়তা ৫০.৫০ মিলিয়ন ইউরো, যার ৫০ মিলিয়ন ঋণ ও ০.৫০ মিলিয়ন অনুদান। ঋণ চুক্তি সই হয় ২০২১ সালের ২৫ অক্টোবর এবং অনুদান চুক্তি ২০১৯ সালের ২২ ডিসেম্বর। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরির সময় এক ইউরো ছিল ৯৪.৬০ টাকা। আর এখন ধরা হয়েছে ১৪৩.৮৮ টাকা। ঋণের ইউরো অঙ্কে বাড়তি নেই। ইপিসি ঠিকাদার ও পিআইএসসি পরামর্শকের ব্যয় সরাসরি কেএফডব্লিউ পরিশোধ করবে। তাই দেশীয় মুদ্রায় সরাসরি চাপ পড়বে না বলে তার ভাষ্য। টাকার অঙ্কে প্রতিফলনের জন্যই বিনিময় হার হালনাগাদ করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, টাকায় ঋণের পরিমাণ বাড়ায় দেশীয় মুদ্রার ওপর কোনো প্রভাব পড়বে কি না, তা পুনর্গঠিত ডিপিপিতে স্পষ্ট করতে হবে। একই সাথে ঋণ চুক্তির ধরন, পরিমাণ ও সুদের হারও উল্লেখ করতে হবে।
একনেকে যেতে ৯ শ’ শর্ত পালন : পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ প্রকল্পটি নিয়ে পর্যালোচনা করেছে। তারা প্রকল্পের বিলম্বের কারণ পুনর্গঠিত ডিপিপিতে উল্লেখ করা এবং ১৩ জুলাইয়ের সভার সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে পালন করার জন্য বলেছে। আর দুই বছর মেয়াদ বৃদ্ধির লিখিত যৌক্তিকতা প্রদান করতে হবে। তবে বাড়তি ছয় মাসের কারণে ব্যয় না বাড়ানোর শর্তও রয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাবনায় ঋণ চুক্তির ধরন, পরিমাণ ও সুদের হার উল্লেখ এবং দেশীয় মুদ্রার ওপর প্রভাবের ব্যাখ্যা করে আনতে হবে। আর দ্রুত ঠিকাদার নিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগীর সাথে অমীমাংসিত বিষয় দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। বেশ কিছু খাতে খরচের অঙ্ক সংশোধন ও যৌক্তিক করার জন্য বলা হয়েছে। গ্যান্ট চার্ট অনুযায়ী চুক্তি পরিচালনা এবং তা পুনর্গঠিত ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা। প্রতি তিন মাস অন্তর পিআইসি ও স্টিয়ারিং কমিটির সভা এবং আইএমইডির নিবিড় পরিবীক্ষণ। এই শর্ত পালন করে পুনর্গঠিত ডিপিপি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








