শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ
মতামত লোগো। নয়া দিগন্ত

আমাদের গৃহকর্মীর নাম চায়না। তিন-চার বাড়িতে কাজ করেন। কাজে দক্ষ, বিশ্বস্ত। তবে মাঝে মধ্যে উধাও হয়ে যান, কাজে আসেন না। এ জন্য তাকে বাদ দিয়ে কাজে নেয়া হয়েছিল মরিয়মকে। তিনি চায়নার মতো পরীক্ষিত না। তবে নিয়মিত আসেন। কিন্তু একদিন তার উপস্থিতিতেই ঘটে যায় এক দুর্ঘটনা— বারান্দা থেকে সাইকেলটা চুরি হয়ে যায়। এবার মরিয়মকে বাদ দিয়ে আবার কাজে নেয়া হয় পুরনো সেই বিশ্বস্ত চায়নাকে।
আদতে চায়না আর মরিয়ম দুইজনই ফ্রিল্যান্সার, ‘অফলাইন ফ্রিল্যান্সার’। যোগ্যতা, কাজের ধরন এবং মূল্যের ওপর নির্ভর করে তাদের চাহিদা তৈরি হয়। চায়না হাই-স্কিলড ফ্রিল্যান্সার, দায়িত্ব নিয়ে কিভাবে ঘরের কাজ নামাতে হয়, সেটি তিনি জানেন। তার বিশ্বস্ততা নিয়েও প্রশ্ন নেই। অন্য দিকে মরিয়ম হলেন লো-স্কিলড; কিন্তু হাই-অ্যাভেইলেবিলিটি ফ্রিল্যান্সার। কাজে নান্দনিকতা না থাকলেও তিনি নিয়মিত আসেন; কিন্তু ‘প্রজেক্ট’ বা প্ল্যাটফর্মের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেননি। অথবা তার উদাসীনতার সুযোগে ভেঙে পড়েছে নিরাপত্তাবলয়।
চায়না আর মরিয়ম কোথাও চাকরি করেন না, তিন-চার বাড়িতে কাজ করেন। কাজ ছাড়েন, আবার কাজ ধরেন। কখনো কখনো কাজ খুঁজে পান না। ওই সময়টা দুঃসহ হয়; কিন্তু কাজের বেলায় তারা স্বাধীন।
অফলাইন ফ্রিল্যান্সার চায়না আর মরিয়মের মতো দশা আমাদের অনলাইন ফ্রিল্যান্সারদেরও। স্বাধীন থাকার একটা মোহ থেকে তারা ফ্রিল্যান্সার হয়েছেন। কেউ কেউ টাকা খরচ করে ‘ফ্রিল্যান্সিং কোর্স’ করছেন; কিন্তু ফ্রিল্যান্সিং আসলে কী সেটিই জানেন না তারা, কোর্স করে আসার পরও না। ফ্রিল্যান্সিং বলতে তারা ধরেই নেন, শুয়ে-বসে থেকে কাজ। একটা অ্যাকাউন্ট খুলবেন। তারপর একখান চাবি মাইরা দেবেন ছাইড়া, জনম ধইরা চলতে থাকবে! পাহাড়ি ঢলের মতো তাদের অ্যাকাউন্টে নেমে আসবে ডলার। ঘরে বসে থেকে মাসে মাসে পাবেন পঞ্চাশ হাজার, এক লাখ টাকা!
কঠিন সত্যটা হলো, ফ্রিল্যান্সিং কোনো কাজ না, কাজের মাধ্যম। কাজ জানা থাকলে, সেই কাজটা কোন মাধ্যমে করা হবে, সেটি পরে বিবেচনার বিষয়। ফ্রিল্যান্সিং করে অনেকেই টাকা আয় করছেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে ডিজাইনের কাজ নিচ্ছেন, ঠিকঠাক ডেলিভারি দিচ্ছেন। আবার কেউ ঘরে বসে সফটওয়্যার বানিয়ে দিচ্ছেন; কিন্তু যারা কেবল ‘ঘরে বসে আয়ের সুযোগ’-এর মোহে দৌড়াচ্ছেন, কাজ শেখা তাদের পছন্দ না। তাদের এই মানসিকতা বুঝে অসাধুচক্র অনলাইনে নানা ধরনের ফাঁদ পেতে রাখে। এই ফাঁদে পড়ে আম-ছালা দুটোই হারাতে হয়। কখনো জড়িয়ে যেতে হয় ভুয়া ও অবৈধ কাজে। তাতেও দেখা যায় মাস শেষে অ্যাকাউন্টে জমা হয় মাত্র পাঁচ ডলার! অথচ এই কাজের পেছনে প্রতিদিন তাকে দিতে হয়েছে দশ থেকে বারো ঘণ্টা। ‘হুজুগে ফ্রিল্যান্সার’দের অবস্থাটা এমনই। 
যারা হুজুগে সাড়া দেন না, তাদের কী অবস্থা? তাদেরকেও থাকতে হয় চায়না আর মরিয়মের মতো অনিশ্চয়তায়। একদল তরুণ আছেন, তারা চায়নার মতো দক্ষ— ক্রিয়েটিভ ডিজাইন করেন, জটিল সফটওয়্যার বানিয়ে ফেলতে পারেন। হাই-ভ্যালু প্রজেক্টও নিখুঁতভাবে শেষ করতে জানেন। আন্তর্জাতিক ক্ল¬ায়েন্টদের কাছে তাদের কদর আছে। বিশ্বস্ততায়ও সেরা; কিন্তু তারা হুট করে ডেডলাইন মিস করেন। শুধু অজুহাত দেখান, কখনো অমুকের বিয়ে, তমুক হাসপাতালে থাকে। থাকে যান্ত্রিক সমস্যার অজুহাতও। এই খামখেয়ালি আচরণে ক্লায়েন্টরা বিরক্ত হন। বিকল্প বাজার খোঁজেন। ওই সময়টায় ক্লায়েন্টদের নক করেন মরিয়মের মতো ‘হাই-অ্যাভেলেবিলিটি’ কর্মীরা। এরা হাই-স্কিলড না। সাধারণ ডাটা এন্ট্রি, বেসিক ট্রান্সলেশন বা টেমপ্লেটভিত্তিক লো-স্কিল কাজ করতে পারেন। কিন্তু প্রজেক্টের নিরাপত্তা, মানসম্মত কোডিং কিংবা বিশ্বস্ত ডাটা হ্যান্ডলিংয়ের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো সামলাতে পারেন না। তৈরি হয় সাইবার ঝুঁকি। ডাটা লিক হওয়ার মতো দুর্ঘটনা ঘটে।
আমাদের দেশের বেশির ভাগ ফ্রিল্যান্সারই হয় চায়না ও মরিয়ম শ্রেণীর। অর্থাৎ ভোগান্তি থেকে ক্লায়েন্টদের মুক্তি নেই। ঘরের কাজের জন্য চায়না, মরিয়মের বিকল্প নেই। কিন্তু ফ্রিল্যান্সিংয়ের অধিকাংশ ক্লায়েন্ট তো আর আমাদের দেশের না। তাদেরকে চায়না আর মরিয়মের ওপর নির্ভর করে থাকতেই হবে, এমন নয়। তাদের সামনে খোলা আছে অবারিত ‘গিগ ইকোনমি’।
‘গিগ’ ইংরেজি শব্দ। ১৯২০-এর দশকে আমেরিকার জাজ মিউজিশিয়ানরা এর ব্যবহার শুরু করেন। এর শাব্দিক অর্থ অস্থায়ী বা খণ্ডকালীন কাজ। জাজ মিউজিশিয়ানরা তখন এক রাতের বা এক-দুই দিনের খেপে যেতেন, কারো সাথে বেশি দিনের চুক্তি করতেন না। পরে ‘গিগ’ শব্দের সোজাসাপটা অর্থ হয়ে যায় ‘খেপ’, মানে ছুটা কাজ। এ কারণেই ডিজিটাল ছুটা কাজগুলোকে ডাকা হয় ‘গিগ ইকোনমি’। এখানে মাসিক বেতন নেই, প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই। কাজেরও স্থায়িত্ব নেই। তবে আছে ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ। কিন্তু ঘরে সবসময় কাজের পরিবেশ থাকে না। পরিবারের লোকরা ডাকাডাকি করেন। হুট-হাট বাজার করার অর্ডার করে বসেন স্ত্রী। এতে কাজে নিয়মানুবর্তিতা থাকে না। এসব কারণেই ভিন দেশের ক্লায়েন্টরা বিরক্ত হন। বিরক্ত হয়ে অনেকে বেছে নেন বিকল্প। অথচ নিয়মের আওতায় আনতে পারলে আমাদের দেশে গিগ অর্থনীতির সম্ভাবনা দারুণ।
গবেষণা বলছে, গিগ ওয়ার্ক সরবরাহে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ বাংলাদেশ। এখানকার ১০ থেকে ১২ লাখ তরুণ ফ্রিল্যান্সিং করেন। তৈরী পোশাক খাতের বাইরে প্রতি বছর প্রায় ১ থেকে ১.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আনছেন তারা। বিদেশ থেকে মুদ্রা যারা আনছেন, তাদের বাইরেও একটা শ্রেণী আছে, যারা ফ্রিল্যান্সিং করেন। গৃহকর্মী চায়না আর মরিয়মকে যেমন কাজের জন্য ঘরের বাইরে বের হতে হয়, তেমনি যারা রাইড শেয়ার করেন, পণ্য ডেলিভারি দেন তাদেরকেও ঘর থেকে বের হতে হয়। তারাও চায়না মরিয়মের মতো ছুটা, কোথাও বাঁধা নন। এই তরুণদেরকে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা খাটতে হয় শহরের রাস্তায়। রোদে পুড়তে হয়, বৃষ্টিতে ভিজতে হয়। বিনিময়ে যে কয় টাকা পান, সেগুলো খরচ হয়ে যায় খেয়ে-বেঁচে থাকার পেছনেই। এদের পেশার ভবিষ্যৎ নেই, নিরাপত্তা নেই। নেই সঞ্চয় প্রকল্প। প্রথাগত পেশাগুলোতে শেষ বয়সের জন্য সম্বল রাখা হয়; কিন্তু গিগ ইকোনমি একজন বয়স্ক মানুষকে নিঃস্ব অবস্থায় ফেলে দেয়। এখানে শ্রমের কোনো শেষ নেই, আয়ের সামাজিক সুরক্ষা নেই।
মানুষের শরীর ও মন চলে জৈবিক নিয়মে। রাত হলে শরীর ক্লান্ত হয়, ঘুমুতে যাওয়ার জন্য ঢলে পড়ে; কিন্তু ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসের ক্লায়েন্টদের অধিকাংশ উন্নত দেশের। তাদের দেশে যখন দিন, আমাদের এখানে তখন রাত। তারা দিনের বেলা কাজ করবেন, এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু সেই কাজ নেয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রে রাত জেগে থাকতে হয় আমাদের তরুণদের। এতে শারীরিক ভারসাম্য থাকে না তাদের। চেহারায় নিশাচরের ছাপ লেগে যায়। চোখের নিচে কালো দাগ হয়, দৃষ্টি ঝাপসা হয়। কথা জড়িয়ে আসে। পিঠ কুঁজো হয়ে যায়। 
নিয়মিত প্রথাগত চাকরির পাশাপাশি বাড়তি আয়ের আশায় বহু তরুণ রাতে ফ্রিল্যান্সিং করেন। এতে চাকরিতে মন বসে না। গিগ মার্কেটেও ক্যারিয়ার গড়া হয় না। তা ছাড়া বেশির ভাগ তরুণ স্বল্পমেয়াদি আয় পেতে ডাটা এন্ট্রি, সাধারণ গ্রাফিক ডিজাইন বা কপি পেস্টের মতো লো-স্কিল কাজ নিয়ে পড়ে থাকছেন। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসে তাদের থেকে সেই কাজগুলোও কেড়ে নিচ্ছে। দক্ষতার অভাবে অন্য কোনো কাজ ধরতে পারছেন না তারা। বেশির ভাগ গিগ প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের কর্মীদের কর্মচারী হিসেবে স্বীকার করে না। শ্রম আইনের দায়দায়িত্ব নিতে হয় না তাদের। ফলে কাজের স্থায়িত্ব থাকে না। চিকিৎসার নিশ্চয়তা থাকে না। তা ছাড়া একটামাত্র বাজে রিভিউ একজন উবার-চালক বা ফুড ডেলিভারিম্যানের ক্যারিয়ারের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে। অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড হলে আপিল করার সুযোগ থাকে না তাদের। তাহলে কি গিগ ইকোনমি কেবলি হতাশায় ভরা?
বিশ্ববাস্তবতায় এই অর্থনীতিকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সুযোগ আছে একে শৃঙ্খলায় নিয়ে আসার। প্রচলিত শ্রম আইনে গিগ ওয়ার্কারদের আইনি স্বীকৃতি দিলে, তাদের অনেক অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে। স্বীকৃতিটা কোন পদ্ধতিতে দেয়া হবে, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। নেয়া যেতে পারে বিশেষজ্ঞদের মতামত। 
গিগ অর্থনীতির উপযোগী করে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা জরুরি। সরকারি খাতেও নিরাপদ গিগ মার্কেট গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে কেবল বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয় তরুণদের।
ইউরোপ-আমেরিকায় গিগ ওয়ার্কারদের সুরক্ষায় নীতিমালা করা হয়েছে। আইনি স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে কর্মীদের। আগে কোনো ঘটন-অঘটন প্রমাণ করার দায়িত্ব ছিল কর্মীদের। নীতিমালায় সেই দায়িত্ব এখন উল্টে গিয়ে কোম্পানির ওপর পড়েছে। আমাদের দেশেও গিগ ওয়ার্কারদের সুরক্ষা দিতে হবে। আর এই সুরক্ষা ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করা তরুণদের যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন গৃহকর্মী চায়না আর মরিয়মদের। 
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
smmoshahid@gmail.com

Advertisement