মহিউদ্দিন আহমেদ
মতামত লোগো। নয়া দিগন্ত

কানাডায় বসে ৪ নভেম্বর সকালে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের খবর দেখছিলাম। মিশিগানে আবদুল এল-সায়েদ নির্বাচনে জিতেছেন। দেশটির ইতিহাসে তিনি প্রথম মুসলিম সিনেটর। এই মানুষটির বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে মিশিগানে এসে জনসভায় বলেছেন, এল-সায়েদ জিহাদি, মুসলিম ব্রাদারহুডের লোক। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও একই সুরে আক্রমণ করেছেন। তবু মিশিগানের ভোটাররা তাকেই সিনেটে পাঠালেন।
প্রশ্নটা সোজা। টাকার জোর, পরিচয় নিয়ে অপপ্রচার আর ক্ষমতাবানদের বিরোধিতা দিয়ে কি মানুষকে সবসময় বিভ্রান্ত করা যায়? মিশিগান বলছে, যায় না। মানুষ নিজের কষ্টের আসল কারণ বুঝলে সব বাধা ডিঙিয়েই পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়ায়।

Advertisement

ব্যালটে মানুষের জবাব
৩ নভেম্বর আমেরিকার ভোটাররা ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা দিয়েছেন। কংগ্রেসের দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা। এতে আমেরিকার সব সমস্যা মিটবে না; কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশেও মানুষ হিমশিম খাচ্ছে নিত্যপণ্যের দাম, ঘরভাড়া, চাকরি, চিকিৎসার খরচ মেটাতে। মা তার অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসা করাতে পারছেন না, অথচ হাজার মাইল দূরের সঙ্ঘাতে খরচ হচ্ছে বিপুল অর্থ। ট্রাম্পের কট্টর অভিবাসনীতি, আগ্রাসী বাণিজ্যযুদ্ধ, ইরানের সাথে সামরিক সঙ্ঘাত, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে ডাকাতের মতো অপহরণ। এসবের জবাব মানুষ ব্যালটেই দিয়েছে।

এল-সায়েদ যা বুঝেছিলেন
মিসরীয় বংশোদ্ভূত এই চিকিৎসক একসময় মিশিগানের জনস্বাস্থ্য বিভাগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। প্রচারণার পুরো সময় তার ধর্মপরিচয়কে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র বানানো হয়েছে। দেশের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের বিরোধিতা, বিপুল অর্থের প্রচারণা এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ— সবকিছুর মুখোমুখি হয়েছিলেন এল-সায়েদ। এর চেয়ে বড় প্রতিকূলতা কল্পনা করা কঠিন। তবু জনগণ তাকেই বেছে নিলো। কেন? কারণ তিনি একটি সহজ সত্য বুঝেছিলেন। মানুষ নিজের উপকার না দেখলে কোনো কিছুতেই এগিয়ে আসে না। কার নাম কী, কে কোন ধর্মের, এসব নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো যায়; কিন্তু আতঙ্ক পেট ভরায় না। তিনি তাই ধর্মের বিতর্কে নামেননি। কথা বলেছেন মানুষের জীবনযাত্রার খরচ কমানো, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, রাজনীতিতে করপোরেট টাকার দাপট কমানোর প্রসঙ্গে। বলেছেন, চিকিৎসার খরচ কেন এত বেশি? এর সাথে রাজনীতির সম্পর্ক কী? সম্পর্কটা তিনি মানুষের ভাষায় খুলে বলেছেন। মানুষ শুনেছে, আর নিজের স্বার্থ চিনেছে। যদিও তার জয়ের পেছনে দলীয় সংগঠন আর দেশজুড়ে পরিবর্তনের হাওয়ারও ভূমিকা ছিল। তবু শিক্ষাটা পরিষ্কার। মানুষ যদি বোঝে তার লাভ কোথায়, তখন ভয় আর টাকা দিয়ে তাকে সবসময় আটকে রাখা যায় না।

Advertisement

মিশিগান থেকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
আমি ঊনসত্তরের ঢাকা দেখেছি। দেখেছি, মানুষ যখন বুঝে যায় সে কিসের জন্য রাস্তায় নেমেছে, তখন কোনো শক্তিই তাকে থামাতে পারে না। চব্বিশের জুলাইয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছে; কিন্তু সেই অভ্যুত্থানের রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা এখনো পূর্ণতা পায়নি। জুলাই জাতীয় সনদ সেই স্বপ্নের দলিল। গণভোটে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায়ও দিয়েছে। কিন্তু সংস্কার কিভাবে হবে, তা নিয়ে এখনো টানাটানি। সরকার চায় সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান নিজেদের মতো সংশোধন করতে। বিরোধী দলগুলো চায়, গণভোটে অনুমোদিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে। দুই পথের আইনগত ভিত্তি এক নয়। তাই বিরোধটি শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংবিধানিকও।
তবে এখানে আরো বড় প্রশ্ন আসে। এল-সায়েদ মানুষকে তাদের লাভের কথা বোঝাতে পেরেছিলেন। আমরা কি জুলাই সনদের ক্ষেত্রে তা পেরেছি? গ্রামের কৃষক, কারখানার শ্রমিক, চাকরির জন্য ঘুরতে থাকা তরুণ কি জানেন, এই সনদ তাদের জীবন কতটা বদলে দিতে পারে?

সনদ আমার কী কাজে লাগবে
সংস্কারের কথা শুনলে অনেকে ভাবেন, এ তো নেতাদের ব্যাপার। আমার চাল-ডালের হিসাবে এর সম্পর্ক কী? অথচ এর সাথে সাধারণ মানুষের জীবনের সম্পর্ক অনেক গভীর। আমরা তা কতটা বোঝাতে পেরেছি? মনে হয়, এখানেই জুলাই সনদ নিয়ে চলমান বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তার বড় কারণ লুকিয়ে আছে।
যে মানুষের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, প্রভাবশালী কারো সুপারিশ নেই, তিনিই প্রায়ই সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েন থানায় গেলে। পুলিশ ও বিচার বিভাগের সংস্কার কার্যকর হলে তিনি আশা করতে পারেন, তার পরিচয় নয়, তার অভিযোগের গুরুত্বই বিবেচিত হবে। 
নির্বাচন কমিশন দলীয় প্রভাবমুক্ত হলে জনগণের ভোটাধিকার সুরক্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রে ব্যালট গণনার জন্য স্ক্যানিং মেশিন এবং সিসি ক্যামেরার নজরদারি থাকলে ভোট গ্রহণ ও গণনায় অনিয়মের সুযোগ কমে। তবে এসব প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও যথাযথ তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে। 
ক্ষমতার দাপট সামলাতে, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত হলে আর সংসদে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা থাকলে সরকার যা খুশি করতে পারে না। সরকারি দলের পরিচয়ে আগের মতো চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করা কঠিন হবে। অন্যায় হলে জবাব আদায়ের জায়গা থাকবে। 
আজ যিনি ক্ষমতার বাইরে, কাল তিনিই ক্ষমতায় আসতে পারেন। নিয়ম পাকা থাকলে সে দিন তার ওপরও সেই নিয়মই চলবে। সংস্কার তাই কোনো দলের নয়, সবার সুরক্ষার জন্য। এই কয়টি কথা সবাইকে সততার সাথে সহজভাবে বলা দরকার। তবে সনদ পাস হলেই এসব ফল আপনা-আপনি আসবে না। চাই কার্যকর আইন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান আর বাস্তব প্রয়োগ। মানুষ সেটি বুঝলে শুধু সনদ চাইবেন না, বাস্তবায়নের ওপর নজরও রাখবেন।
রোডমার্চে জনতার ভিড়ই কি যথেষ্ট
বিরোধী দলগুলো সংস্কারের দাবিতে সভা, মিছিল আর রোডমার্চ করছে। গণতন্ত্রে এসবের গুরুত্ব আছে; কিন্তু মাঠ ভরে গেলেই কি আন্দোলন সফল? সমাবেশ শেষে মানুষ ঘরে ফিরে কী নিয়ে যায়? সে কি বুঝল, নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতাও কেন সীমাবদ্ধ থাকা দরকার? স্বাধীন আদালত ছাড়া গণতন্ত্র কেন নিরাপদ নয়?
আমাদের রাজনীতিতে ভিড় দেখানোর অভ্যাস পুরনো। মানুষকে বোঝানো কঠিন, ধৈর্যের কাজটি পড়ে থাকে অবহেলায়।

সনদ মানুষের কাছে পৌঁছাবে কিভাবে
শুধু প্রশ্ন তুললে চলবে না, পথও দেখাতে হবে। প্রথমত, জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্র সংস্কারের মোট ৮৪টি প্রস্তাব রয়েছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে সবগুলোর বিস্তারিত জানা সহজ নয়। তাই গুরুত্বপূর্ণ ১০-১২টি সংস্কার বেছে নিয়ে সহজ ভাষায় বোঝাতে হবে, কেন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য দরকার, কেন বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা জরুরি, কেন পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে এবং কেন সংসদে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। প্রতিটি বিষয়ের সাথে একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে : এতে আমার জীবনে কী পরিবর্তন আসবে? ভাষা হতে হবে সাধারণ মানুষের, জটিল আইনি পরিভাষার নয়। যাতে প্রত্যেকে নিজের জীবনের বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে এসব সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ও সুফল বুঝতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, মানুষের কাছে যেতে হবে। সমাবেশে ডাকা সহজ; কিন্তু উঠানে, বাজারে, কারখানার গেটে, কলেজের মাঠে গিয়ে বসা কঠিন। বোঝানোর কাজটা হয় সেখানেই। সাথে চাই ছোট ভিডিও, অডিও বার্তা, গান, পথনাটক। যিনি লম্বা লেখা পড়েন না, তিনিও গান শুনে বা ছোট ভিডিও দেখে বিষয়টা ধরতে পারেন। আর গুজবের জবাব আগেই তৈরি রাখতে হবে। চুপ থাকলে গুজব জায়গা দখল করে। তৃতীয়ত, সাফল্যের মাপকাঠি বদলাতে হবে। জনসভায় কত মানুষ এলো, তা দিয়ে নয়। কতজন বুঝল, তা দিয়ে। নিয়মিত সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞেস করতে হবে : সনদের তিনটি প্রধান প্রস্তাব কী, আপনি জানেন?
সময়সূচিও দরকার। প্রথম ৩০ দিনে এক পাতার ভাষ্য আর পুস্তিকা। পরের ৯০ দিনে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে বৈঠক ও প্রচার। তারপর ১৮০ দিনে জনমত যাচাই করে ঘাটতি পূরণ।
এসবের কোনোটিই ব্যয়সাপেক্ষ নয়। দরকার ইচ্ছা আর ধৈর্য। যে দল এই কাজ আগে শুরু করবে, জনগণ তাকেই বিশ্বাস করবে। কারণ সে মানুষকে ভিড়ের অংশ ভাবেনি, বোঝার যোগ্য নাগরিক ভেবেছে।

সরকার বদল আর রাষ্ট্র সংস্কার এক নয়
আমাদের দেশে বহুবার সরকার বদল হলেও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, প্রশাসনের দলীয়করণ, বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, এসব পুরনো দুঃখ রয়ে গেছে। কারণ আমাদের প্রতিযোগিতা প্রায়ই থেমে থাকে একটি প্রশ্নে : ক্ষমতায় কে থাকবে? প্রশ্নটা হয় না, ক্ষমতা কিভাবে চলবে।
আমেরিকায় প্রেসিডেন্টের দল কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও তার মেয়াদ শেষ হয় না; কিন্তু আইন, বাজেট আর তদারকিতে ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়। আমাদের সংসদীয় ব্যবস্থা ভিন্ন, ওই কাঠামো হুবহু নেয়ার প্রশ্ন নেই। কিন্তু সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা আর স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রয়োজন দুই দেশেই সমান। 
সংস্কার সরকারকে দুর্বল করে না; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি আরো মজবুত করে। তবে সেই শক্তির সাথে জবাবদিহিও বাড়ায়। আর জবাবদিহিই সুশাসনের প্রধান শর্ত। একটি সরকার যত বেশি নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানের কাছে দায়বদ্ধ থাকে, তার সিদ্ধান্ত তত বেশি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
আমেরিকার গণতন্ত্রও নিখুঁত নয়। টাকার দাপট, করপোরেট স্বার্থ, বৈষম্য, সবই সেখানে আছে। সেই ত্রুটিগুলোই মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্র শুধু ভোটের দিনে শেষ হয় না।
জুলাই সনদ নিয়ে আজকের বিতর্ককে শুধু সরকার বনাম বিরোধী দলের ঝগড়া ভাবলে ভুল হবে। এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের চরিত্র ঠিক করার প্রশ্ন। যারা জুলাইয়ে প্রাণ দিয়েছেন, রক্ত ঝরিয়েছেন, তারা নিশ্চয়ই কেবল একটি সরকার বদলের জন্য নামেননি। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে আমাদের প্রশ্নটি সরল। আপনারা কি মানুষকে কেবল নিজেদের পক্ষে জড়ো করতে চান? নাকি সনদটা তাদের হাতে তুলে দিতে চান, বুঝিয়ে বলতে চান, আর তাদেরই জাগিয়ে তুলতে চান?
কারণ মানুষ যে দিন নিজের অধিকার বোঝে, নিজের কষ্টের কারণ চেনে আর বদলের পথ দেখতে পায়, সে দিনই গণতন্ত্র তার আসল শক্তি খুঁজে পায়। 
লেখক : রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক