মীযানুল করীম
মীযানুল করীম। নয়া দিগন্ত

শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। এ মেরুদণ্ড দুর্বল হয়ে পড়লে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও দুর্বল হয়ে যায়। শিক্ষা শুধু সনদ অর্জন কিংবা চাকরি পাওয়ার মাধ্যম নয়; এটি নাগরিকের চিন্তা, নৈতিকতা, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রধান ভিত্তি। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের বর্তমান বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে আশাবাদী হওয়ার মতো উপাদান খুব বেশি কিছু কি পাওয়া যাবে? পরীক্ষার ফলে বিপর্যয়, শিক্ষার মানের অবনতি, শিক্ষক সঙ্কট, নিয়োগে অনিয়ম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈষম্য এবং শিক্ষা পরিকল্পনায় ধারাবাহিকতার অভাব— সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কটের চিত্র ফুটে উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষা খাতে অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়া হলেও প্রত্যাশিত পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। নতুন শিক্ষা কমিশন গঠনের দাবি যখন শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট মহলে জোরালো হচ্ছে, তখন শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ থেকে সে সম্ভাবনা নাকচ করে দেয়া হয়েছে। গত ২ নভেম্বর রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, আপাতত শিক্ষা কমিশন গঠনের কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। তার বক্তব্য, অতীতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন কমিশন গঠন করে ভবিষ্যতের পরিবর্তনশীল শিক্ষাব্যবস্থার দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা কঠিন।
প্রশ্ন হচ্ছে— শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তনশীল বলেই কি একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী শিক্ষা কমিশনের প্রয়োজন নেই? বরং পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা মোকাবেলা করতে তো দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা এবং বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিক্ষা কমিশন অতীতের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি করার প্রতিষ্ঠান নয়; অতীতের ব্যর্থতা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের জন্য একটি কার্যকর রূপরেখা তৈরির প্রতিষ্ঠান।
এবারের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল সেই প্রয়োজনীয়তা আরো স্পষ্ট করেছে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া এবং পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় শিক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ফলও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বিশেষ করে শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের ফলের ব্যবধান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য এবং শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রবণতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পাসের হার কমে যাওয়া শুধু শিক্ষার্থীদের অযোগ্যতা কিংবা আগের সরকারের ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে প্রকৃত সমস্যার সমাধান হবে না। দেখতে হবে, শিক্ষার্থীরা যথাযথ পাঠদান পেয়েছে কিনা, শিক্ষকেরা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও উপকরণ পেয়েছেন কি না, পাঠ্যক্রম বাস্তবসম্মত ছিল কি না এবং মূল্যায়নব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। পরীক্ষার ফল শিক্ষাব্যবস্থার মান যাচাইয়ের একটি সূচক, একমাত্র সূচক নয়। পাসের হার বাড়লেই শিক্ষার মান বাড়ে না। আবার পাসের হার কমলেই সব দায় শিক্ষার্থীর ওপর চাপানো যায় না। শিক্ষার প্রকৃত মান নির্ভর করে শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, কতটা বুঝছে, সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারছে কী না। সেই সাথে তাদের মধ্যে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি হচ্ছে কী না— তার ওপর। তাই ফল বিপর্যয়ের পর দায় এড়ানোর পরিবর্তে একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন জরুরি।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রসঙ্গ এসেছে। নিঃসন্দেহে অতীতের অনিয়ম, দলীয়করণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা এবং নীতিনির্ধারণে অদূরদর্শিতার দায় নিরূপণ করা প্রয়োজন। কিন্তু অতীত সরকারের ব্যর্থতা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব পালনের বিকল্প হতে পারে না। জনগণ সরকার পরিবর্তন করে কেবল পুরোনো সরকারের সমালোচনা শোনার জন্য নয়। পরিবর্তন, দক্ষতা ও কার্যকর সুশাসন দেখতে চান তারা। আগের সরকার কী করেনি, তার পাশাপাশি বর্তমান সরকার কী করছে, সেটি এখন বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের সঙ্কট বহুমাত্রিক। একদিকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষায় গবেষণার দুর্বলতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই, কোথাও থাকলেও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতি আছে। নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক জটিলতা শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত বৈষম্য। রাজধানী ও বড় শহরের অনেক শিক্ষার্থী যে সুযোগ পায়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছাত্র-ছাত্রীরা তার সামান্য অংশও পায় না।
এ বৈষম্যের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানদের ওপর। শিক্ষার ব্যয়, যাতায়াত, উপকরণ এবং পরিবারের আর্থিক চাপে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। অথচ শিক্ষা হওয়ার কথা ছিল সামাজিক বৈষম্য কমানোর সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। বাস্তবে শিক্ষার সুযোগ ও মানের বৈষম্য অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান সামাজিক বৈষম্যকে আরো শক্তিশালী করছে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার বলতে শুধু পাঠ্যবই পরিবর্তন কিংবা পরীক্ষাপদ্ধতি সংশোধন বোঝালে চলবে না; শিক্ষার সুযোগের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো শিক্ষা কার্যক্রমে ধারাবাহিকতার অভাব। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পাঠ্যক্রম, পাঠ্যবই, পরীক্ষা ও মূল্যায়নপদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রবণতা শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। শিক্ষা কোনো রাজনৈতিক দলের স্বল্পমেয়াদি কর্মসূচি হতে পারে না। এটি একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা। বিশ্বের যেসব দেশ শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, সেসব দেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষার মৌলিক লক্ষ্য ও কাঠামো পাল্টায়নি।  গবেষণা, মূল্যায়ন ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে উন্নয়ন করেছে।
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আগামী দিনের কর্মসংস্থানে শুধু মুখস্থবিদ্যা কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফল যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন প্রযুক্তিগত জ্ঞান, ভাষাগত দক্ষতা, সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী চিন্তা, কারিগরি সক্ষমতা ও নৈতিক মূল্যবোধ। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে সনদনির্ভর। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সামাজিক মর্যাদা ও কর্মসংস্থানের সাথে যথাযথভাবে যুক্ত করা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশ শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে শিক্ষিত বেকার বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প ও সেবা খাত প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তির সঙ্কটে পড়ছে।
এ অবস্থায় একটি স্বাধীন শিক্ষা কমিশনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকারের সুযোগ নেই। তবে কমিশন যেন আরেকটি আনুষ্ঠানিকতা কিংবা সুপারিশ তৈরির কারখানায় পরিণত না হয়, সে নিশ্চয়তাও থাকতে হবে। কমিশনে অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ, প্রযুক্তিবিদ, অভিভাবক এবং শিল্প ও শ্রমবাজারের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। কমিশনের কাজ হবে— প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা, শিক্ষার মানের বৈষম্য চিহ্নিতকরণ, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের সংস্কার, শিক্ষা বাজেটের যৌক্তিক বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা উন্নয়নের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন।
সেই সাথে অতীতের শিক্ষা কমিশনগুলোর সুপারিশ পর্যালোচনা করতে হবে। কোন সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনটি হয়নি এবং কেন হয়নি— তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে। সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারকে একটি সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। শিক্ষা খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও কম নয়। শিক্ষা সংস্কারের মৌলিক প্রশ্নে রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। সরকার বদলালেই যেন পাঠ্যক্রম, শিক্ষানীতি ও প্রশাসনিক কাঠামো নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার শিকার না হয়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়, জাতীয় সমঝোতা প্রয়োজন।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে একটি বাস্তবতা উঠে এসেছে— শিক্ষাব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু সেই বাস্তবতা শিক্ষা কমিশন না করার যুক্তি হতে পারে না। পরিবর্তনের গতি যত বাড়বে, তত প্রয়োজন হবে দূরদর্শী পরিকল্পনা, গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণ এবং দক্ষ প্রতিষ্ঠান। অতীতের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়— এ কথা সত্য। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা, বর্তমানের বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে তো সঠিক নীতি তৈরি করতে হয়।
সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষা খাতের বর্তমান পরিস্থিতিতে আশাবাদের চেয়ে উদ্বেগ বেশি। পরীক্ষার ফল বিপর্যয়, শিক্ষার মানের অবনতি, বৈষম্য ও দক্ষতার ঘাটতি— কোনোটি বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। এগুলো একটি অসুস্থ ব্যবস্থার লক্ষণ। এ অবস্থায় দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে কিংবা নতুন কমিশনের প্রয়োজনীয়তা নাকচ করে সমস্যার সমাধান হবে না।
সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়। তারা চান একটি স্থিতিশীল, মানসম্মত, বৈষম্যহীন ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা। তারা চান, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকদের অনিশ্চয়তা দূর হোক। তারা চান, শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় পাস নয়, জীবনে সফল হওয়ার মতো জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করুক।
শিক্ষা খাত অবহেলা করে কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে এগোতে পারে না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা বড় বড় প্রকল্পের সাফল্যও শেষ পর্যন্ত টেকসই হবে না, যদি না দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ তৈরি করা হয়। তাই এখনই প্রয়োজন শিক্ষা খাতের বাস্তবতা স্বীকার করে কার্যকর সংস্কার শুরু করা। কমিশন হোক বা অন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ— সেটি যেন হয় স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও বাস্তবায়নযোগ্য। শিক্ষা নিয়ে আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়; এবার প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও দৃশ্যমান পরিবর্তন। কারণ, একটি প্রজন্মের শিক্ষাজীবন নষ্ট হলে তার ক্ষতি শুধু একটি পরিবারের হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো জাতি। 
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Advertisement