
বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনযাত্রায় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক সঙ্ঘাত ও পরিবেশগত বিপর্যয় ক্রমেই অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে মানুষেরই অপরিমিত ভোগস্পৃহা, লাগামহীন সম্পদ আহরণ এবং প্রকৃতির ওপর একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রবণতা। উন্নয়নের নামে বন উজাড়, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা, পাহাড়ের সবুজ আচ্ছাদন ধ্বংস এবং বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সঙ্কুচিত করার ফলে জলবায়ু পরিবর্তন তীব্র হচ্ছে, জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়ছে এবং বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। বাঘ, মেরু ভালুক থেকে শুরু করে বিরল উদ্ভিদ, পাখি ও কীটপতঙ্গসহ অসংখ্য প্রজাতির অস্তিত্ব আজ বিপন্ন।
গবেষক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই অবক্ষয় নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের বড় অংশ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এর ফলে শুধু প্রকৃতির বৈচিত্র্যই হারাবে না, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, উর্বর মাটি ও জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য প্রাকৃতিক ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হবে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ এখন শুধু জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয় নয়, মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ ও অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য শর্ত।
এই সঙ্কট মোকাবেলায় পরিবেশবিজ্ঞানীরা গুরুত্ব দিচ্ছেন ‘রিওয়াইল্ডিং’ বা প্রকৃতির স্বাভাবিক বন্য পরিবেশ পুনরুদ্ধারের ধারণার ওপর। বাংলায় যাকে বলা যায়, পুনর্বন্যকরণ। এটি শুধু বন সৃষ্টি বা বৃক্ষরোপণ নয়; বরং মানুষের হস্তক্ষেপে ক্ষতিগ্রস্ত বন, নদী, পাহাড়, জলাভূমি ও তৃণভূমির স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র এবং জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া।
ক্যারোলিন ফ্রেজার তার ‘রিওয়াইল্ডিং দ্য ওয়ার্ল্ড’ বইয়ে এ ধারনার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। এর মূল দর্শন হলো, অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল প্রযুক্তি বা নতুন অবকাঠামোর পরিবর্তে মানুষের অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ করে প্রকৃতিকে নিজের নিয়মে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেয়া। এ জন্য বনজঙ্গল নির্বিচারে পরিষ্কার না করা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে অপ্রয়োজনীয় বাঁধ অপসারণ, পাহাড়ের প্রাকৃতিক উদ্ভিদ আচ্ছাদন অক্ষুণ্ন রাখা এবং বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীকে উপযুক্ত আবাসস্থলে ফিরিয়ে আনা জরুরি। তবে প্রাণী পুনঃস্থাপনের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রজাতি, খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্রের ধারণক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে, যাতে নতুন সঙ্কট তৈরি না হয়।
রিওয়াইল্ডিংয়ের মূল শিক্ষা হলো, প্রকৃতি মানুষের একক সম্পত্তি নয়। মানুষ তার মালিক নয়; বরং জীব ও অজীব উপাদানের পারস্পরিক নির্ভরশীল বৃহত্তর বাস্তুতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রিওয়াইল্ডিংয়ের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক। ১৯৯৫ সালে প্রায় ৭০ বছর পর সেখানে নতুন করে নেকড়ে ছাড়া হয়। নেকড়ে বিলুপ্ত হওয়ায় হরিণের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়েছিল। তারা নদীতীরের গাছপালা ও চারা খেয়ে নিঃশেষ করছিল, বনভূমির বিকাশ ব্যাহত হচ্ছিল এবং পাখি, মাছসহ বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। নেকড়ে ফিরিয়ে আনার পর নদীতীরবর্তী এলাকায় হরিণের বিচরণ কমে যায়। এতে গাছপালা ও নতুন চারা বেড়ে ওঠার সুযোগ পায় এবং বনভূমি পুনরুজ্জীবিত হতে থাকে। দেখা যায়, কিছু গাছ মাত্র ছয় বছরে প্রায় পাঁচগুণ পর্যন্ত লম্বা হয়। গাছপালা ফিরে আসায় পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল উন্নত হয়, ভালুকসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর ফিরে আসার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয় এবং নদীতীরের ভূমিক্ষয় ও ভাঙন কমে। এ অভিজ্ঞতা দেখায়, একটি প্রজাতির অনুপস্থিতি পুরো বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, আবার তার পুনঃস্থাপন প্রকৃতির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে। সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাঘ বিলুপ্ত হলে শুধু একটি শিকারি প্রাণী হারাবে না, বিপন্ন হবে বনের খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য। হরিণের সংখ্যা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়লে বনজ উদ্ভিদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। তাই বাঘ সংরক্ষণ মানে শুধু একটি বিপন্ন প্রজাতিকে রক্ষা করা নয়, সুন্দরবনের সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষিত রাখা।
প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের গুরুত্ব শুধু বন্যপ্রাণী ও বনভূমি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নয়। মানুষের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও জীবনমানের সাথেও এটি গভীরভাবে সম্পর্কিত। সুস্থ বনভূমি কার্বন শোষণ, স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বৃষ্টির পানি ধারণ ও মাটির ক্ষয় রোধ করে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ জলজ প্রাণীর আবাসস্থল এবং মাছের প্রজনন ও বিচরণ নিশ্চিত করে। জলাভূমি বন্যার তীব্রতা কমায়, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে সহায়তা করে এবং অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। তৃণভূমি ও সুস্থ মাটির বাস্তুতন্ত্র কার্বন ধারণের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখে। সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন ও নানা চাপ মোকাবেলার সক্ষমতা বাড়ায়। কোনো প্রজাতি বিলুপ্ত হলে তার প্রভাব খাদ্যশৃঙ্খলের অন্যান্য স্তরেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে মানুষের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য প্রাকৃতিক সেবাগুলোও সুরক্ষিত থাকে। প্রকৃতির সান্নিধ্য মানসিক প্রশান্তি ও শারীরিক সুস্থতা বাড়ায়, চাপ কমায় এবং জীবনমান উন্নত করে। তাই প্রকৃতি পুনরুদ্ধার মানুষের সামগ্রিক কল্যাণেরও অপরিহার্য শর্ত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রিওয়াইল্ডিংয়ের আওতায় নদীর কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা অপসারণ, জলাভূমি পুনরুদ্ধার, বন ও তৃণভূমির স্বাভাবিক বিকাশ এবং বিলুপ্তপ্রায় বা স্থানীয়ভাবে হারিয়ে যাওয়া বন্য প্রাণীকে উপযুক্ত আবাসস্থলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এসব কার্যক্রমে সরকার, পরিবেশবিজ্ঞানী, কৃষক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, গবেষক ও পরিবেশবাদী সংগঠন অংশ নিচ্ছে। কারণ স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণ ছাড়া প্রকৃতি পুনরুদ্ধার টেকসই হয় না। তাদের জীবিকা ও ঐতিহ্যগত সম্পদ ব্যবহারের অধিকার অক্ষুণ্ন রেখে বিকল্প জীবিকা, পরিবেশবান্ধব কৃষি ও দায়িত্বশীল পর্যটনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি মাটি, পানি, জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় জীবনযাত্রা বিবেচনায় বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ও ফলাফল মূল্যায়ন জরুরি। এক অঞ্চলের সফল পদ্ধতি অন্য অঞ্চলে কার্যকর নাও হতে পারে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানুষের সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, নদীনির্ভর জীবনব্যবস্থা, বিস্তৃত জলাভূমি, উপকূলীয় বনভূমি ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের কারণে রিওয়াইল্ডিংয়ের গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। অথচ নদী দখল ও ভরাট, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, জলাভূমি ধ্বংস, পাহাড় কাটা, বনভূমি সঙ্কোচন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হওয়ায় প্রকৃতির পুনরুদ্ধার ক্ষমতা কমছে। সুন্দরবন, হাওর, পার্বত্য বনাঞ্চল, উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ ও নদীব্যবস্থায় এ নীতি প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। সুন্দরবনে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ সুরক্ষিত রাখতে হবে। হাওরে জলপ্রবাহ ও জলাভূমির সংযোগ অক্ষুণ্ন রাখতে হবে, যাতে মাছের প্রজনন, পাখির বিচরণ ও জলজ উদ্ভিদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত না হয়। পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় কাটা বন্ধ করে বনভূমির পুনর্জন্ম এবং উপকূলে ম্যানগ্রোভ ও প্রাকৃতিক উদ্ভিদ আচ্ছাদন পুনরুদ্ধার করতে হবে। এতে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ভূমিক্ষয় থেকে প্রাকৃতিক সুরক্ষা বাড়বে। পাশাপাশি নদীসংযুক্ত জলাভূমি, খাল ও বিল পুনরুদ্ধারে পানি ধারণ, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও বন্যা ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব। এসব উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি পরিবেশগত সমীক্ষা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন মূল্যায়ন জরুরি। কাগুজে প্রকল্প বা লোকদেখানো বৃক্ষরোপণ নয়, প্রকৃতির নিজস্ব পুনর্জন্মের ক্ষমতা ফিরিয়ে আনাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের রিওয়াইল্ডিংয়ের মূল লক্ষ্য।
পরিবেশ বিপর্যয়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সঙ্কোচন, হিমবাহ গলে নদী ও সমুদ্রের স্বাভাবিক ব্যবস্থা পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলীয় মানুষের বাস্তুচ্যুতি পৃথিবীর ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত করে তুলছে। তবে সচেতন উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃতির পুনর্জন্ম সম্ভব। এ জন্য উন্নয়ন সম্পর্কে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। সড়ক, সেতু, শিল্পকারখানা ও অবকাঠামোর বিস্তারের পাশাপাশি প্রকৃতির ধারণক্ষমতা ও জীববৈচিত্র্যের সাথে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করাই টেকসই উন্নয়নের শর্ত।
প্রকৃতিকে জয় নয়, তার সাথে সহাবস্থানের দর্শন গ্রহণ করতে হবে। সরকারকে পরিবেশবান্ধব নীতি বাস্তবায়ন, ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পরিবেশগত দায়বদ্ধতা গ্রহণ এবং কৃষক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজকে প্রকৃতি সংরক্ষণে অংশ নিতে হবে। একই সাথে অতিরিক্ত ভোগস্পৃহা ও প্রকৃতির সম্পদের ওপর সীমাহীন অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ জরুরি। ওয়াইল্ডার নেচারের প্রধান ক্যারোলিনা সোতো নাভারোর বক্তব্যের মর্ম হলো, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে বন্য প্রকৃতির মূল্য সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। কারণ প্রকৃতির সুস্থতার ওপরই মানুষের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তা নির্ভরশীল। প্রকৃতিকে নিজের নিয়মে বাঁচতে দেয়ার মধ্যেই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, সমৃদ্ধি ও নিরাপদ ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিহিত। তাই মানুষের প্রয়োজনেই প্রকৃতিকে ফিরতে দিতে হবে তার নিজের ঠিকানায়।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








