
রাজপথে পুলিশের গাড়িতে আগুন, কারখানা ভাঙচুর এবং পুলিশের সাথে শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষের যে চিত্র আমরা গত কয়েক দিনে দেখেছি, তা কেবল একটি শিল্প খাতের অস্থিরতা নয়; বরং সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক অশনিসঙ্কেত। শ্রমিকদের দাবি— ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকায় উন্নীত করতে হবে। এই দাবি নিয়ে যখন তিন শতাধিক কারখানা বন্ধের মুখে, তখন স্বভাবত প্রশ্ন ওঠে, এ অস্থিরতার মূল কারণ কী? এটি কি নিছক পেটের ক্ষুধার তাগিদ, নাকি এর পেছনে আছে গভীর কোনো রাজনৈতিক ইন্ধন? বৈশ্বিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে শিল্পের সক্ষমতা ও শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে কিভাবে একটি টেকসই ভারসাম্য আনা সম্ভব?
প্রথমে যে বিষয়টি সামনে আসে— শ্রমিকের জীবন ধারণের নির্মম বাস্তবতা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যখন পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখন থেকে বাজারে মূল্যস্ফীতির আগুন জ্বলছে। বিবিএসের তথ্যমতে, বিগত কয়েক বছর ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেছে।
ঢাকা বা এর আশেপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে ঘরভাড়া, চাল-ডাল-তেলের মতো নিত্যপণ্যের দাম, যাতায়াত এবং চিকিৎসা ব্যয় যে হারে বেড়েছে, তাতে সাড়ে ১২ হাজার টাকায় একটি চার সদস্যের পরিবারের টিকে থাকা রীতিমতো জাদুকরি ব্যাপার। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘গ্লোবাল লিভিং ওয়েজ কোয়ালিশনের’ গবেষণা বলছে, ঢাকায় চারজনের একটি পরিবারের ন্যূনতম জীবন ধারণে অন্তত ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা প্রয়োজন। অর্থাৎ শ্রমিকরা যে ৩০ হাজার টাকা দাবি করছেন, তা কোনো আকাশকুসুম বিলাসিতা নয়; বরং আন্তর্জাতিক গবেষণার সাথে হুবহু মিলে যাওয়া বেঁচে থাকার এক ন্যূনতম গাণিতিক হিসাব। মজুরি যদি এক মাসের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করতে না পারে, তবে ওই মজুরি কাঠামোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তবে মুদ্রার অপর পিঠে রয়েছে কারখানা মালিকদের নিদারুণ বাস্তবতা, যা কোনোভাবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, শ্রমিক বাঁচলে যেমন শিল্প বাঁচবে, তেমনি শিল্প টিকলে শ্রমিকের কর্মসংস্থান থাকবে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, রাশিয়া-ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের ক্রয়াদেশ ব্যাপক হারে কমে গেছে। সাথে যুক্ত হয়েছে দেশের অভ্যন্তরে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কট। উচ্চমূল্যে জ্বালানি কিনেও কারখানাগুলো নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন করতে পারছে না। ব্যাংক ঋণের সুদহার এবং কাঁচামাল আমদানির বাড়তি ব্যয় মালিকদের মুনাফার মার্জিনকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে।
এ পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে শ্রমিকের মজুরি দ্বিগুণের বেশি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করা হলে দেশের ছোট ও মাঝারি আকারের শত শত কারখানা বিপদে পড়বে। তখন বেতন বাড়ার বদলে লাখো শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বেন, যা আরেক সামাজিক বিপর্যয়ের জন্ম দেবে।
আন্তর্জাতিক ক্রেতা বা বায়ারদের দ্বিমুখী নীতিও এক্ষেত্রে বড় একটি বাধা। তারা একদিকে কমপ্লায়েন্স ও মানবাধিকারের বুলি আওড়ায়, অন্য দিকে পোশাকের ন্যায্য মূল্য বাড়াতে রাজি হয় না। এ টানাপড়েনের মাঝে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক সমীকরণ। মিরপুর ও গাজীপুরের সাম্প্রতিক সহিংসতা, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং উদ্দেশ্যমূলক কারখানা ভাঙচুরের ধরন দেখে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করছে, এর পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধন আছে। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শ্রমমন্ত্রী জানিয়েছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী একটি গোষ্ঠী এবং সীমান্তের ওপার থেকে একটি মহল ডিসেম্বর মাস সামনে রেখে দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ডিবির হাতে মিরপুরে গ্রেফতার হওয়া বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ও এ দাবির পালে হাওয়া দিচ্ছে।
এটি সত্য যে, পেটের দায়ে রাস্তায় নামা শ্রমিকরা কখনো নিজেদের রুটিরুজির জায়গা— কারখানায় আগুন দেন না। সুযোগসন্ধানী রাজনৈতিক গোষ্ঠী আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা করছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সরকার এর মধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, যেখানে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরাও আছেন। এরপর কেন শ্রমিকরা ভাঙচুর চালাচ্ছেন, সেটি রাজনৈতিক উসকানির তত্ত্বকে জোরালো করে। তবে কেবল ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে পেটের ক্ষুধা মেটানো যায় না। রাজনৈতিক ইন্ধন তখনই সফল হয়, যখন সেখানে অসন্তোষের বারুদ আগে থেকে জমা থাকে। মজুরি বৈষম্য ও জীবনযাত্রার জাঁতাকল হলো সেই বারুদ, আর সুযোগসন্ধানীরা সেখানে শুধু দিয়াশলাইয়ের কাঠিটি ছুড়ে দেয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতির এই পরিস্থিতিতে আমাদের মত— কেবল আবেগ বা রাজনৈতিক দোষারোপ দিয়ে এ খাতের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর পোশাক খাতে সরকারিভাবে কোনো নগদ প্রণোদনা দিতে পারবে না। তখন সস্তা শ্রম বিক্রি করে বিশ্ববাজারে টিকে থাকার দিন ফুরিয়ে যাবে। আমাদের প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম সস্তা শ্রমের বদলে প্রযুক্তির ব্যবহার, উচ্চ মূল্য সংযোজন এবং দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পণ্য বাণিজ্যের আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে গেছে। অথচ আমরা এখনো সস্তা শ্রমিকের ওপর ভর করে টিকে থাকার অবাস্তব স্বপ্ন দেখছি। অর্থনীতিবিদ জর্জ আকারলফ ও জোসেফ স্টিগলিৎসের ‘দক্ষতা মজুরি’ (এফিসিয়েন্সি ওয়েজ) তত্ত্ব আমাদের শেখায়, শ্রমিককে ভালো মজুরি দিলে তার উৎপাদনশীলতা বাড়ে। কারখানার সার্বিক অপচয় কমে। তাই মালিকদের এখন সস্তা শ্রমের মোহ ত্যাগ করে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনবল তৈরির দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
এই বহুমুখী সঙ্কট সমাধানে সরকার, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক— সবাইকে সমানভাবে তিনটি বিষয় অনুধাবন করার অনুরোধ করছি। প্রথমত, নবগঠিত মজুরি বোর্ডকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। বাজারের প্রকৃত মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি যৌক্তিক মজুরি কাঠামো ঘোষণা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মালিকদের মনে রাখতে হবে, শুধুু সরকারের প্রণোদনায় নির্ভর করে ব্যবসা করা যায় না। মুনাফার একটি নির্দিষ্ট অংশ শ্রমিকের কল্যাণে ব্যয় করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে, যা শ্রমিককে কারখানার প্রতি দায়বদ্ধ করবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ওপর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে হবে, যাতে তারা পণ্যের ন্যায্য মূল্য পরিশোধে বাধ্য হয়
তৃতীয় পরামর্শটি হলো— রাষ্ট্র বা সরকারের ভূমিকা নিয়ে। অমর্ত্য সেনের ভাষায় যাকে ‘পাবলিক অ্যাকশন’ বলা হয়, সরকারকে এখন সেই পথে হাঁটতে হবে। সব দায়ভার শুধু মালিকের ওপর চাপালে শিল্প বাঁচবে না। মজুরি হিসেবে মালিক হয়তো ১৬-১৮ হাজার টাকা দিতে পারবেন; কিন্তু বাকি ঘাটতি পূরণে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। পোশাক শ্রমিকদের জন্য সরকার বিশেষ রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে পারে, যার মাধ্যমে তারা ন্যায্যমূল্যে চাল, ডাল, তেল ও অন্যান্য নিত্যপণ্য পাবেন। শিল্পাঞ্চলগুলোতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ডরমিটরি বা শ্রমিক কলোনি নির্মাণ করা যেতে পারে, যাতে শ্রমিকের আয়ের একটি বড় অংশ অস্বাভাবিক বাড়িভাড়ার পেছনে চলে না যায়। পাশাপাশি বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও শ্রমিকের সন্তানের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করা। শ্রমিকের জীবনযাত্রার পরোক্ষ ব্যয় যখন সরকার নিজ কাঁধে তুলে নেবে, তখন কারখানার ওপর মজুরি বৃদ্ধির সরাসরি চাপ অনেকটা কমে আসবে।
পরিশেষে বলা যায়, যে মানুষগুলোর ঘামের বিনিময়ে দেশের রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি অর্জিত হয়। যাদের শ্রমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ টিকে থাকে। তাদের ক্ষুধার্ত রেখে দেশের অর্থনীতি টেকসই হতে পারে না। তাই পোশাক কারখানায় ভাঙচুর বা সহিংসতা যেমন কঠোর হস্তে দমন করতে হবে, তেমনি রাজনৈতিক ইন্ধনের নামে শ্রমিকের ন্যায্য দাবি অবদমিত করার চেষ্টাও আত্মঘাতী হবে। শিল্পমালিক, শ্রমিক সংগঠন এবং সরকারকে আজ এক টেবিলে বসতে হবে গভীর সংবেদনশীলতা ও দূরদর্শিতা নিয়ে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintuanowar.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








