মহিউদ্দিন আহমেদ
মতামত লোগো। নয়া দিগন্ত

২৮ অক্টোবর টোকিওতে প্রবাসীদের সাথে মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘সংস্কার অনেক ধরনের আছে, এয়ার কন্ডিশন রুমের সংস্কারও আছে, আর খেটে খাওয়া মানুষের লাইফ একটু বেটার করার জন্য সংস্কার আছে।’ (সূত্র : বিডি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম)
সে ভাষণে তিনি বলেছেন, তার কথাগুলোর গুরুত্ব যেন সবাই বোঝার চেষ্টা করেন। আমি চেষ্টা করেছি। আর যত বুঝেছি, উদ্বেগ তত বেড়েছে। আমি আন্তরিকভাবে চাই, আমার এ উদ্বেগ ভুল প্রমাণিত হোক।
‘এয়ার কন্ডিশন রুমের সংস্কার’ কোনটি প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেননি, কোন সংস্কারকে তিনি এ তকমা দিয়েছেন। কিন্তু প্রসঙ্গ থেকে জানতে ইচ্ছা করে, তার ইঙ্গিত কি জুলাই সনদের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে? এ সনদ কি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর শখের তালিকা? না। সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও দলগুলোর দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে এটি তৈরি। সই করেছে ২৪টি দল। বিএনপিও। গণভোটে দেশবাসী এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। বিএনপি নিজেও প্রচারে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বান জানিয়েছিল।
যে সংস্কারে নিজেদের স্বাক্ষর আছে, সেটিকে এখন ‘এসি রুমের’ বিষয় বলে হালকা করা হলে জনগণ ব্যাখ্যা চাইতে পারেন।

Advertisement

কথা আর কাজের ফারাক
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জুলাই সনদের ‘প্রতিটি শব্দ’ বাস্তবায়ন করা হবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেছেন, সনদ ‘অক্ষরে অক্ষরে’ মানা হবে। তাহলে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের দিনে বিএনপির এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের পৃথক শপথ নিলেন না কেন? গণভোটে অনুমোদিত বাস্তবায়ন আদেশে তো এই পরিষদ এবং ১৮০ কার্যদিবসের সময়সীমার কথা আছে।

গণভোটের রায়, না ক্ষমতাসীনদের ইশতেহার
বিএনপির যুক্তি, সংবিধানে সংস্কার পরিষদের আইনগত ভিত্তি নেই। তাই সংসদীয় বিশেষ কমিটির পথ বেছে নিয়েছে। আইনি প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন থাকলে তার সাংবিধানিক সমাধান খুঁজতে হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিকল্প ব্যবস্থা বসিয়ে দেয়া সমাধান নয়, এটি গণভোটের রায় পাশ কাটানো। আমাদের মতে, শপথ না নিয়ে বিএনপি ‘বড় রাজনৈতিক ভুল’ করেছে। এতে রায়ের প্রতি তাদের অঙ্গীকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, সদিচ্ছা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংস্কার আর সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন এক নয়। পরিষদের পেছনে গণভোটের সরাসরি সমর্থন আছে। কমিটির সংশোধনীর পেছনে সেটা নেই। তাই ভবিষ্যতে এ পথ আইনি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।
সরকার বলতে পারে, বিরোধী দল কমিটিতে যোগ দিচ্ছে না। কিন্তু বিরোধীরা সংস্কারের বিরোধিতা করছে না। তাদের আপত্তি, গণভোটে অনুমোদিত পরিষদের জায়গায় সরকার নিজের পছন্দের পদ্ধতি বসিয়েছে।
আরো উদ্বেগের বিষয়, বিশেষ কমিটি জুলাই সনদের পাশাপাশি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সাংবিধানিক প্রস্তাবও বিবেচনা করছে। এটি অনুমান নয়। প্রথম আলো (৫ আগস্ট) ও দ্য ডেইলি স্টার (৭ অক্টোবর ২০২৬) মন্ত্রী ও সরকারি দলের নেতাদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে স্পষ্ট জানিয়েছে, কমিটি বিএনপির ইশতেহারের সাংবিধানিক প্রস্তাবও বিবেচনা করছে। বাসসের প্রতিবেদনেও (২০ সেপ্টেম্বর) সনদের বাইরের অতিরিক্ত প্রস্তাব বিবেচনার কথা এসেছে।
সরকারের জবাব, ইশতেহারের অতিরিক্ত অঙ্গীকারেও জনগণ রায় দিয়েছে, আর সনদ বাস্তবায়ন হবে ‘ভিন্নমতসহ’। কিন্তু গণভোটের ব্যালটে প্রশ্ন ছিল সনদের সাংবিধানিক প্রস্তাব ও তার বাস্তবায়নপদ্ধতি নিয়ে, ইশতেহার নিয়ে নয়। বিএনপির ভিন্নমতগুলো গণভোটে পৃথক বিকল্প হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি। তাহলে সেই ভিন্নমতকে প্রাধান্য দিলে গণভোটের রায়ের কী থাকে?
বিএনপি নিজের ইশতেহার বাস্তবায়ন করতেই পারে। কিন্তু গণভোটের ম্যান্ডেট আর দলীয় অঙ্গীকার এক জিনিস নয়। সনদ ও ইশতেহার সাংঘর্ষিক হলে কোনটি প্রাধান্য পাবে, কে সেই সিদ্ধান্ত নেবে, তা জনগণের সামনে স্পষ্ট করতে হবে।
সরকার সংসদীয় কমিটির কাজ শেষ করার সময়সূচি দিয়েছে। কিন্তু গণভোটে অনুমোদিত সংস্কারগুলো কবে এবং কিভাবে বাস্তবায়ন হবে, তার নিশ্চয়তা কোথায়? ‘আলোচনা হবে’, ‘প্রক্রিয়া ঠিক করতে হবে’— এসব কথায় মাস গড়িয়ে যায়। জনগণ সময়সূচি চান।
প্রশ্নটি কে কমিটিতে যোগ দিলো বা দিলো না, তা নয়। জনগণ যে সংস্কারে ‘হ্যাঁ’ বলেছেন, সেটি বাস্তবায়ন হবে, নাকি ক্ষমতাসীনদের নিজস্ব সংস্করণ?

ক্ষমতা সীমিত করার পরীক্ষা
বিরোধী দলে থাকতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা সহজ। পরীক্ষা শুরু হয় ক্ষমতায় এসে। জুলাই সনদে সাংবিধানিক নিয়োগে একটি নিরপেক্ষ কাঠামোর প্রস্তাব আছে, যা নির্বাহী বিভাগের হাত থেকে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের একচ্ছত্র ক্ষমতা কমাবে। ন্যায়পাল, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে নিয়োগের প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত লিপিবদ্ধ আছে। অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমিত করা এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে বাছাই কমিটি গঠনের প্রস্তাবে কোনো দলের আপত্তি ছিল না। আসল পরীক্ষা সেখানে, যেখানে ক্ষমতাসীন দলের নিজের ক্ষমতা সীমিত করার প্রশ্ন আসে।
আরেকটি প্রশ্নও জাতি জানতে চায় : বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবের কী হলো? দলটি ২০২৩ সালের জুলাইয়ে এই ৩১ দফা ঘোষণা করেছিল। তাতে ছিল পরপর দুই মেয়াদের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, সংবিধান ও বিচার সংস্কারে কমিশন গঠন। সংসদে দলীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ৭০ অনুচ্ছেদ পর্যালোচনার কথাও ছিল।
বিএনপির নেতারা ২০২৫ সালে বলেছিলেন, তখনকার সরকার যেসব সংস্কারের কথা বলছে, তার প্রায় ৯৯ শতাংশই বিএনপি অনেক আগে জাতির সামনে এনেছিল। ৩১ দফার প্রচারণার একটি বড় অংশ তারেক রহমান নিজে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি করেছেন।
তাহলে এখন ক্ষমতায় এসে ৩১ দফার কোন দফা কতটা এগিয়েছে? কোনটির জন্য কোন আইন বা সংশোধনী সংসদে এসেছে? কোনটির সময়সীমা কী? এর একটি প্রকাশ্য হিসাব কোথায়? ৯৯ শতাংশ সংস্কার যদি আগে তৈরি থাকে, তবে বাস্তবায়নে এত দ্বিধা কেন?
প্রধানমন্ত্রীর নিজের ভাষাতেই প্রশ্ন করা যায় : ৩১ দফাও কি তবে ছিল শুধু ‘এয়ার কন্ডিশন রুমের সংস্কার?’ ক্ষমতার বাইরে থাকতে যা বলা সহজ ছিল, ক্ষমতায় বসে তা করে দেখানোই আসল পরীক্ষা।
সংস্কারে সবচেয়ে বেশি আপত্তি স্বভাবত তাদের থাকতে পারে, যাদের ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। এ সরকারের বেলায় সেই আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করার দায় তাদের।

কল্যাণ বনাম সংস্কার : ভুল বিভাজন
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে মনে হয়, রাষ্ট্র সংস্কার এক জিনিস, আর মানুষের জীবনমান আরেক জিনিস। এ বিভাজনই ভুল। হাসপাতাল চালাবে কে? সেই পুরনো প্রশাসন। নিয়োগ দেবে কে? সেই দলীয় প্রভাবের ব্যবস্থা। ক্রয় তদারকি করবে কে? সেই দুর্বল নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। এ কাঠামো না বদলে নতুন প্রকল্প ঘোষণা করলে সেই যেই লাউ, সেই কদু।
প্রধানমন্ত্রী উপজেলা হাসপাতালে শয্যা বাড়ানো ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কথা বলেছেন। ভালো কথা। কিন্তু কত টাকা লাগবে? কোথা থেকে আসবে? কোন প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করবে? ব্যর্থ হলে জবাব দেবে কে? ভাষণে এসবের উত্তর নেই। ঘোষণা থাকে, জবাবদিহি থাকে না। এটি আমাদের পুরনো অভিজ্ঞতা।
প্রধানমন্ত্রী টোকিওর পরিচ্ছন্নতার প্রশংসা করেছেন। ঢাকাকে তেমন করতে পারলে সেটি জনগণের জন্য বড় সংস্কার হবে, বলেছেন তিনি। ঠিক কথা। তাহলে প্রশ্ন একটিই : সেই সংস্কার হবে কিভাবে?
টোকিও কেবল নাগরিকদের ভালো অভ্যাসে পরিচ্ছন্ন নয়। নাগরিকরা সেখানে নিয়ম মানেন, কারণ নিয়মটি আছে, ব্যবস্থাটি কাজ করে। বর্জ্য আলাদা করার নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও নিষ্পত্তির আলাদা কাঠামো আছে। প্রতিটি ধাপে দায়িত্ব নির্ধারিত, ব্যর্থ হলে জবাব দিতে হয়। ঢাকার জন্য প্রধানমন্ত্রী কী দিয়েছেন? সিটি করপোরেশনের কর্মীদের আন্তরিক হওয়ার আহ্বান, নাগরিকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান। আহ্বান ব্যবস্থা নয়।
দক্ষতা আর ব্যবস্থা এক জিনিস নয়। দক্ষতা বাড়ানো মানে পুরনো ব্যবস্থাকে আরেকটু ভালোভাবে চালানো। ব্যবস্থা বদলানো মানে কে সিদ্ধান্ত নেবে, কার হাতে অর্থ ও ক্ষমতা থাকবে, ব্যর্থ হলে কে জবাব দেবে, সেই কাঠামো নতুন করে গড়া। যে ব্যবস্থায় নিয়োগ চলে রাজনৈতিক বিবেচনায়, ক্রয়ে অনিয়ম হয়, দায় এড়ানো যায়, সেখানে দক্ষ ব্যবস্থাপক বসালেও ফল প্রায় একই থাকে।
নতুন ট্রাক, নতুন নির্দেশ, নতুন অভিযান, এ সবই ব্যবস্থাপনা। সংস্কার হলো এমন কাঠামো, যেখানে ব্যর্থতার দায় কারো না কারো ঘাড়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই টোকিওর উদাহরণ টেনেছেন। সেই উদাহরণের শিক্ষা একটিই : টোকিও পরিষ্কার হয়েছে ব্যবস্থায়, ভাষণে নয়। ঢাকার জন্য সেই ব্যবস্থা কোথায়?
সফরসঙ্গী নিয়ে প্রশ্ন কি অযথা বিতর্ক
প্রধানমন্ত্রী সফরসঙ্গী নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমালোচনার প্রসঙ্গও তুলেছেন। প্রশ্ন করেছেন, দেশের বড় সমস্যা রেখে একজনকে নিয়ে এত আলোচনা কেন।
উত্তর সহজ। সরকারি সফরে কে যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন এবং ব্যয় কে বহন করছে, তা জানতে চাওয়া নাগরিকের অধিকার। তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিলে বিতর্ক এক দিনে শেষ হয়। উত্তর না দিয়ে প্রশ্নকারীকে ‘অন্য বড় সমস্যা’ মনে করিয়ে দেয়া পুরনো কৌশল। 
পুরনো গল্প নতুন মুখে
বাংলাদেশের প্রতিটি সরকার উন্নয়নের কথা বলেছে। সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাসপাতাল হয়েছে। তবু দুর্নীতি, দলীয়করণ, বিচারহীনতা আর ক্ষমতার অপব্যবহার ফিরে ফিরে এসেছে। কারণ সরকার বদলেছে, রাষ্ট্র বদলায়নি। যে কাঠামো আগের সরকারকে বেপরোয়া হতে দিয়েছে, সেই কাঠামো এখন নতুন সরকারের হাতে। ওপরে ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা না থাকলে নিচে সুশাসন আসে না। সে জন্য দরকার স্বাধীন বিচার বিভাগ, নিরপেক্ষ পুলিশ ও প্রশাসন, কার্যকর দুদক এবং শক্তিশালী স্থানীয় সরকার।
শেষ কথা
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির সাফল্য আমরা চাই। তার আগে কয়েকটি স্পষ্ট জবাব দরকার। প্রথমত, কমিটির সময়সূচির বাইরে, গণভোটে অনুমোদিত সংস্কারগুলো কবে ও কিভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা জাতির সামনে প্রকাশ করুন। দ্বিতীয়ত, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সরকারের বিকল্প পথ কী, তা পরিষ্কার করুন। তৃতীয়ত, সনদের যেসব প্রস্তাবে সরকারের আপত্তি আছে, সেগুলো কী এবং কেন তা জানান। সনদ ও ইশতেহারে সঙ্ঘাত হলে কোনটি প্রাধান্য পাবে, তাও বলুন। চতুর্থত, ৩১ দফার অগ্রগতিসহ প্রতি তিন মাসে একটি প্রকাশ্য প্রতিবেদন দিন। 
আমাদের সামনে প্রশ্ন একটিই। আমরা কি শুধু নতুন নতুন ঘোষণার বাংলাদেশ চাই, নাকি এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে সরকার বদলালেও নাগরিকের অধিকার অটুট থাকে?

লেখক : রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক