
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমালোচনা করলে কেউ সাম্প্রদায়িক হয়ে যাবেন? তার সাহিত্য, রাজনৈতিক চিন্তা কিংবা সাংস্কৃতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তাকে রাষ্ট্রবিরোধী বলা হবে? রবীন্দ্রনাথ তো মানুষ, তার কোনো সমালোচনা করা যাবে না কেন? বাংলাদেশে এখন এই প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো— একটি সাংস্কৃতিক বিতর্ককে যুক্তি দিয়ে মোকাবেলার বদলে রাষ্ট্র সেখানে ফৌজদারি আইন নিয়ে হাজির হয়েছে।
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালিমা লেপনের ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলেন— রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াস, মারজিয়া খন্দকার রিমি, সাকিবুল হাসান ও মোহাম্মদ সুজন মিয়া। গত ১২ অক্টোবর ২০২৬ রিমান্ড শেষে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১২০(খ), ১৫৩(ক) ও ২৯৫(ক) ধারায় মামলা হয়েছে। পুলিশের অভিযোগ, আসন্ন দুর্গাপূজাকে (পূজা শেষ হয়েছে) কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। তবে এগুলো এখনো অভিযোগ। আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হয়নি।
তিনটি ধারার গুরুত্বও কম নয়। ১২০(খ) ধারায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা যায়। ১৫৩(ক) ধারায় বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে শত্রুতা ছড়ানোর অপরাধের কথা বলা হয়েছে। আর ২৯৫(ক) ধারায় ধর্মীয় অনুভূতিতে ইচ্ছাকৃত ও বিদ্বেষপূর্ণ আঘাতের বিষয়টি আছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে এসব ধারায় কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো— গ্রাফিতিতে কালিমা লেপনের অভিযোগের সাথে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো বা ষড়যন্ত্রের সম্পর্ক কী? তার প্রমাণ কী? তদন্তে কী পাওয়া গেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া দরকার।
কারো প্রতিকৃতি বা শিল্পকর্ম নষ্ট করার অভিযোগ থাকলে তার আইনগত বিচার হতে পারে; কিন্তু সেই ঘটনা ব্যবহার করে রবীন্দ্রনাথের সমালোচনাকে সাম্প্রদায়িকতা বা রাষ্ট্রবিরোধিতার সাথে এক করে ফেলা বিপজ্জনক। অভিযোগের বিচার হতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে। সাহিত্যিক বিতর্কের বিচার হবে যুক্তি দিয়ে।
রবীন্দ্রনাথ কি সমালোচনার ঊর্ধ্বে
কোনো সন্দেহ নেই, রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের বিশাল ব্যক্তিত্ব। তার অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই; কিন্তু এসব কারণে তার প্রতিটি বক্তব্য, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা সাংস্কৃতিক চিন্তা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে চলে যায় না। পৃথিবীর কোনো সাহিত্যিক সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন।
কেউ রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসবেন। কেউ তার সাহিত্য পড়ে আনন্দ পাবেন। কেউ তার রাজনৈতিক চিন্তার সাথে দ্বিমত করবেন। কেউ তার সাংস্কৃতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। এটাই স্বাভাবিক। সংস্কৃতির জগতে মতের বৈচিত্র্য থাকবে। সেখানে রাষ্ট্রের নির্ধারণ করে দেয়ার কথা নয়, কে কাকে ভালোবাসবেন বা কার সমালোচনা করবেন।
শেখ হাসিনার আমলে শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে যে ধরনের প্রশ্নহীন আনুগত্যের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তার কথা আমরা ভুলে যাইনি। তখন শেখ মুজিবের সমালোচনাকে অনেকসময় মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতা বা রাষ্ট্রবিরোধিতার সাথে মিলিয়ে দেখা হতো। সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার কথা ছিল। অথচ এখন যদি রবীন্দ্রনাথের সমালোচনাকে অপরাধের সাথে এক করে দেখা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে, আমরা কি আবার একই ধরনের চিন্তার জগতে ফিরে যাচ্ছি?
বঙ্গভঙ্গের ইতিহাসও জানতে হবে
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিতর্কের ক্ষেত্রে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ সরকার প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের যুক্তি দেখিয়ে বাংলা ভাগ করেছিল। লাভবান হয়েছিল পূর্ববঙ্গ এবং আসামের মুসলমানরা। ঢাকা হয়ে উঠেছিল গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতার গুরুত্ব কমে যাচ্ছিল। একটা হিন্দু সম্প্রদায় মানতে পারিনি। তারা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছিল। বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথও। পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গকে নিজেদের শিক্ষা, চাকরি ও প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা পশ্চিমবঙ্গের অনেক শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্তের অবস্থানের সাথে এক ছিল না। ফলে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতাকে পুরো বাংলার মানুষের অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখানো যায় না। ১৯৪৭ সালে বাংলা আবার ভাগ হয়। তখন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা বাংলা ভাগের পক্ষে উঠেপড়ে লাগে। তারা ১৯০৫ সালের অবস্থান থেকে সরে আসে। রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তা, তার সময়ের সমাজদৃষ্টি কিংবা বাঙালি সংস্কৃতিতে তার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা জ্ঞানচর্চার দিকে থেকে স্বাভাবিক। তার কোনো বক্তব্যে সাম্প্রদায়িক পক্ষপাত ছিল কি না, তা নিয়েও গবেষণা হতে পারে; কিন্তু অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আপনি রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করলে রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে যাওয়া ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
রাষ্ট্র কেন বিতর্কের বিচারক হবে?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো— রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে একটি সাংস্কৃতিক বিতর্কে রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হওয়া উচিত। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ থেকে মানুষ যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য আশা করে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংযম এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা আশা করে; কিন্তু কোনো সাহিত্যিককে সমর্থন করা কিংবা তার সমালোচনা করা— এটিকে অপরাধের প্রশ্নে পরিণত করা হলে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় তৈরি হবে।
সরকারের কাজ কোনো সাহিত্যিককে প্রাশ্নাতীত করে তোলা নয়। কারো শিল্পকর্ম নষ্ট করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করা এক বিষয়, আর সেই ঘটনা ঘিরে ভিন্নমত দমনের চেষ্টা করা সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কালচারালি তর্ক করা যাবে না— করলে আপনি রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে যাবেন। কী ভয়ঙ্কর! আদালতে পিপি কিভাবে বলেন রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা করলে তারা সাম্প্রদায়িক।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিতর্ক হবে। হোক। এটাই তো স্বাভাবিক। সব সাহিত্যিককে নিয়ে তর্কবিতর্ক হয়; কিন্তু রাষ্ট্র ঢুকে পড়ে কেন? সরকারের সব লোকজনের কি বিবেচনাবোধ দুর্বল হয়ে পড়ছে? ক্ষমতায় থাকলে কি যা ইচ্ছা তাই করা যায়? শেখ হাসিনা তো তাই করেছিলেন। পরিণতি কী হয়েছে তা তো সবার জানা।
বাংলাদেশে ইন্ডিয়ান কালচারাল হেজিমনি তৈরিতে কারা কিভাবে কাজ করেন, তা সরকারের কেউ জানেন বা বুঝতে পারেন না, বিষয়টা কি এমন? সরকারের পক্ষ হয়ে টেলিভিশনে যারা কথা বলেন তাদের অনেকে বিতর্কিত, কালচারাল শব্দটার সাথে তাদের সম্পর্কটা মনে হয় বেশ ঢিলেঢালা। তাদের অনেকে আবার হাইব্রিড বিএনপি। তারা আছেন পদের সন্ধানে। সবমিলিয়ে একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থা।
আল নূর মোহাম্মদ আয়াসসহ চারজন এখন কারাগারে। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচার হবে আদালতে। তারা দোষী কি না, তা নির্ধারণ করবেন আদালত; কিন্তু এ মামলা আমাদের সামনে আরো বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বাংলাদেশ কি এমন একটি সমাজ হবে, যেখানে সাহিত্যিকের সমালোচনা করা যাবে না, ইতিহাসের প্রচলিত ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না, জাতীয় সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য নিয়ে বিতর্ক করা যাবে না। তাহলে কী দাঁড়াল? সেই পুরনো ব্যবস্থা। জন-আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করা। জনমতকে দমন করা। ভিন্নমতকে দমিয়ে রাখা। আর এ পথে হাঁটলে কী পরিণতি হয়— ভারতে পালিয়ে গিয়ে শেখ হাসিনা সেটি প্রমাণ করেছেন।
রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসার অধিকার যেমন আছে, তেমনি তাকে সমালোচনা করার অধিকারও থাকতে হবে। সমালোচনার জবাব সমালোচনা দিয়ে দিতে হবে। ইতিহাসের জবাব দিতে হবে ইতিহাস দিয়ে। নিশ্চয়, ধরে কারাগারে পাঠিয়ে দিয়ে নয়। ভিন্নমতকে অপরাধের তকমা দেয়া রীতিমতো শুভবুদ্ধির বিপরীত।
রবীন্দ্রনাথকে রক্ষা করার সবচেয়ে ভালো উপায় তাকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে বসানো নয়; বরং তার সাহিত্য ও চিন্তাকে মুক্ত আলোচনার মধ্যে রাখা। যে সমাজ তার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিককেও প্রশ্ন করতে ভয় পায়, সেই সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের চিন্তার স্বাধীনতাকে বিপন্ন করে।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








