
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে সাত মাস হলো। এই সাত মাস খুব দীর্ঘ সময় নয়; কিন্তু একটি নতুন সরকারের জন্য সাত মাস কম সময়ও নয়। এই সময়ের মধ্যে মানুষ সরকারের কাজের ধরন, অগ্রাধিকার এবং রাজনৈতিক চরিত্র সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করে ফেলে। আর সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠছে তা হলো— বিএনপি সরকার কি চাপের মধ্যে আছে? তারা কি বিরোধী দলকে ভয় পাচ্ছে? নাকি সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে নিজেদের দলকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায়?
মাঠে-ময়দানে, চায়ের দোকানে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন প্রশ্ন শোনা যাচ্ছে। কেন বিরোধী রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন— এমন ব্যক্তিদের সরকারি চাকরি থেকে ওএসডি করা হচ্ছে? প্রশাসনকে দলীয়করণ করলেই কি রাষ্ট্র পরিচালনার সমস্যা সমাধান হবে? যোগ্যতা ও দক্ষতার চেয়ে দলীয় পরিচয় কি বড় হয়ে উঠছে? সরকার কি প্রশাসন ও পুলিশের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে? এসব প্রশ্নকে নিছক বিরোধীদের প্রচারণা বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে। কারণ সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয় শুধু সরকারের বক্তব্যে নয়, সরকারের আচরণে।
দল আর সরকার— দুটো কি এক হয়ে যাচ্ছে?
একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করবে— এটিই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম; কিন্তু দল এবং রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। দল রাজনৈতিক সংগঠন। সরকার রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান। এই পার্থক্যটি যত বেশি অস্পষ্ট হয়, রাষ্ট্র তত বেশি দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। আজকের সঙ্কটের একটি বড় জায়গা এখানেই।
বিএনপির সামনে এখন দু’টি দায়িত্ব। এক দিকে দলকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাখা। অন্য দিকে রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করা। এই দুই দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে বিপদ তৈরি হয়। দলীয় কর্মীর অপরাধকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাধ্যমে আড়াল করা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি বিরোধী মতকে রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে চেপে ধরার চেষ্টাও বিপজ্জনক; বরং সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত ছিল— আইন সবার জন্য সমান; কিন্তু সেই জায়গাতেই এখন প্রশ্ন উঠছে। দলীয় কর্মীদের নিয়ন্ত্রণই কি সবচেয়ে বড় সমস্যা?
গত কয়েক মাসের ঘটনাগুলো দেখলে মনে হয়, বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজেদের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করা। মিরপুরের একটি পুরনো বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার পর সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগ করতে বলা হয় এবং তিনি পদত্যাগ করেন। বিভিন্ন কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কয়েকজনকে বহিষ্কারও করা হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অপকর্ম করলে ছাড় দেয়া হবে না। এগুলো অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ; কিন্তু প্রশ্ন হলো— এগুলো কি সমস্যার সমাধান, নাকি সমস্যার পর প্রতিক্রিয়া?
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ঘটনা ঘটার পর কিছু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে; কিন্তু সারা দেশে দলকে সামলানোর কার্যকর কৌশল দেখা যাচ্ছে না। অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হকও মনে করেন, দল ও সরকার মিলেমিশে যাওয়ার কারণে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি জটিল হচ্ছে।
এখানেই বিএনপির জন্য বড় সতর্কবার্তা। একটি সরকার যদি প্রতিটি ঘটনার পর একজনকে বহিষ্কার করে, একটি কমিটি ভেঙে দেয়, একজন এমপিকে পদত্যাগ করায়— তাহলে বোঝা যায় সরকার প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে; কিন্তু ভালো সরকার শুধু প্রতিক্রিয়া দেখায় না। আগেই ব্যবস্থা নেয়। অপরাধের পরিবেশ তৈরি হতে দেয় না।
রাজশাহীর ঘটনা আরো ভয়ঙ্কর সঙ্কেত
রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক জাওয়াদুল হককে ঘেরাওয়ের পর জোর করে একটি কাগজে স্বাক্ষর নেয়ার অভিযোগ উদ্বেগজনক। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে কাগজটি পড়তে দেয়া হয়নি। তার ব্যক্তিগত সহকারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। তাকে কার্যালয় থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। পরে তার অফিসের কম্পিউটারের সিপিইউ খুলে নেয়া, সিসিটিভি, ওয়াইফাই ও বিদ্যুৎ সংযোগ নষ্ট এবং বিভিন্ন দফতরে তালা দেয়ার অভিযোগও এসেছে।
এ ঘটনায় বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতির কথা প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এসেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী— রাজশাহী মহানগর কৃষক দলের সভাপতি শরফুজ্জামান শামীমের নেতৃত্বে ২০-২৫ জনের একটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে আসে। তাদের সাথে রাজশাহী মহানগর বিএনপির ৬ নম্বর ওয়ার্ড ইউনিটের সভাপতি আল মোস্তাক শাহীন, মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কামাল, জিয়া মঞ্চের সভাপতি বুলবুল ও সাধারণ সম্পাদক লাল্টু ছিলেন।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ভিসি সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘‘তারা খুব আগ্রাসীভাবে আমার রুমে ঢুকে পড়ে; বলে, ‘আপনি, আওয়ামী লীগের দোসর, আপনি রাজশাহীর মানুষকে কাজ দেন না, ঢাকার মানুষ কাজ করে। আপনি এই চেয়ারে থাকবেন না।’ আমি একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ়।’’ তারা আরো বলে ‘আপনি চেয়ার থেকে ওঠেন এবং আপনি এই মুহূর্তে বের হয়ে যান। আপনাকে এই চেয়ারে আর দেখতে চাই না।’
কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের লোকজন যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কাউকে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করায়, সেটি কোনোভাবেই আইনের শাসনের লক্ষণ নয়। স্রেফ মব।
সাংবাদিককে পেটানো হলে রাষ্ট্রের পরীক্ষা হয়
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে এনেছে। চার সাংবাদিককে পেটানোর ঘটনায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। ভিডিও ফুটেজে হামলাকারীদের শনাক্ত করার সুযোগ থাকার পরও অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার বিষয়টি আরো প্রশ্ন তৈরি করেছে। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস বা সিপিজে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে।
সিপিজে বলেছে, বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হলের সামনে একটি ঘটনার সংবাদ সংগ্রহের সময় ডেইলি স্টার, সমকাল, বিডিনিউজ ও আগামীর সময় পত্রিকার ক্যাম্পাস প্রতিনিধিদের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আহত করা হয়। ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এ হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। হামলায় আহত চার সাংবাদিককেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সিপিজে বলেছে, হামলাকারীদের স্পষ্ট ভিডিও ফুটেজ থাকার খবর পাওয়া গেলেও ৫ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে থানায় একটি মামলা করেছে। এমন পরিস্থিতিতে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বিশ্লেষণ করে হামলায় সরাসরি অংশ নেয়া কয়েকজনকে শনাক্ত করার তথ্যও এসেছে। তাদের কয়েকজন ছাত্রদলের বিভিন্ন পদে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে সরকারের জন্য একটি সহজ পরীক্ষা আছে। সাংবাদিককে মারল কে— সেটি বড় প্রশ্ন নয়। বড় প্রশ্ন হলো— সাংবাদিককে মারার পর সরকার কী করল? আইন কি দলীয় পরিচয় দেখবে, নাকি অপরাধ দেখবে? দল থেকে বহিষ্কার করেই কি সরকার দায়িত্ব শেষ করছে? তাহলে আর আইনের শাসন থাকল কোথায়?
বিরোধী কণ্ঠকে ভয় পাওয়ার রাজনীতি বিপজ্জনক
কুষ্টিয়ায় এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। এনসিপি ঘটনাটিকে ধারাবাহিক হামলার অংশ হিসেবে উল্লেখ করে তদন্ত ও জবাবদিহি দাবি করেছে। সরকারের উচিত এই অভিযোগকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে উড়িয়ে না দিয়ে তদন্ত করা। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। অসত্য হলে সেটিও পরিষ্কার করতে হবে। কারণ গণতন্ত্রে বিরোধী দলকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই; বরং শক্তিশালী বিরোধী দল সরকারকে শক্তিশালী করে। বিরোধী মত যত বেশি থাকবে, সরকারের ভুল তত দ্রুত ধরা পড়বে। বিরোধী কণ্ঠ বন্ধ করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সরকারের নিজের কণ্ঠও দুর্বল করে।
এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বিএনপি সরকার গঠনের পরে এটি পাটওয়ারীর ওপর ‘পঞ্চম হামলার ঘটনা’। তিনি বলেছেন, ‘একজন নেতাকে কতটা ভয় পেলে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা এতটা উন্মাদ হতে পারে?’
এ দিকে সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী নিয়ে সরকার ব্যস্ত। এত ব্যস্ততার কারণ কী? সরকার কি বিরোধী দলের মতামত দমন করতে চাইছে? প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন-২০২৬-এর মাধ্যমে সরকার পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পথেই হাঁটছে বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম। তিনি বলেছেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর নিপীড়নমূলক আইনি কাঠামো পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, প্রস্তাবিত সংশোধনী তার বিপরীত। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে নিরাপত্তার নামে যেভাবে ভিন্নমত দমন করা হয়েছিল, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে তারই পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। অপরাধের স্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকলে রাজনৈতিক স্বার্থে আইনের অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ে।
জুলাই বিপ্লবের পর মানুষের একটি বড় প্রত্যাশা ছিল— দমনমূলক আইন ও সংস্কৃতির অবসান হবে। সেই জায়গায় প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, অপরাধের স্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইনের অপব্যবহারের সুযোগ থেকে যায়। সরকারের মনে রাখা দরকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোনো সরকারের দয়া নয়; এটি নাগরিকের অধিকার। সরকারের সমালোচনা করা আর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ করা এক জিনিস নয়। এই পার্থক্যটি আইনে এবং প্রয়োগে স্পষ্ট না থাকলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভয় পাবে। আর ভয় পাওয়া নাগরিক গণতন্ত্রের শক্তি নয়। সচেতন ও স্বাধীন নাগরিকই গণতন্ত্রের শক্তি।
অর্থনীতিতে মানুষ স্বস্তি পাচ্ছে কোথায়?
রাজনৈতিক অস্থিরতার সাথে অর্থনৈতিক চাপ যুক্ত হলে সঙ্কট আরো গভীর হয়। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাংক খাতে বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে কমছে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা। অন্য দিকে সামাজিক সুরক্ষা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সার-সহায়তায় সরকার বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করলেও এর উল্লেখযোগ্য অংশ দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায় না। অনেক সচ্ছল পরিবার সুবিধা পেলেও দরিদ্রতম বহু পরিবার সামাজিক সুরক্ষার বাইরে থেকে যায়।
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। বেসরকারি ও সরকারি বিনিয়োগ কমেছে। রফতানিও দুর্বল হয়েছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। একই সাথে দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্যাংক খাতের চিত্র আরো উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণের হার ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধিও ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। অন্য দিকে সাধারণ মানুষ বাজারে গিয়ে অন্য বাস্তবতা দেখছে। আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন ও রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ছে। আয় সেই হারে বাড়ছে না। ফলে মধ্যবিত্ত কম কিনছে, নিম্নবিত্ত ধার করছে, আর ছোট ব্যবসায়ী ক্রেতা হারাচ্ছে। এটিই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সতর্কসঙ্কেত। মানুষ যখন নিরাপত্তাহীন, তখন সরকারকে প্রশ্ন করে। মানুষ যখন বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারে না, তখনো সরকারকে প্রশ্ন করে।
এখনই ঘুরে দাঁড়াতে হবে
বিএনপি সরকারের সামনে তাই সঙ্কট একাধিক; কিন্তু সমাধানের পথও আছে। দল ও রাষ্ট্রের সীমারেখা পরিষ্কার করতে হবে। দলের পরিচয় নয়— অপরাধের পরিচয় হবে বিচারের ভিত্তি। বিএনপির কর্মী অপরাধ করলে তাকে বিএনপির কর্মী হিসেবে নয়, একজন অভিযুক্ত নাগরিক হিসেবে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। একইভাবে বিরোধী দলের কেউ অপরাধ করলে তাকেও ছাড় দেয়া যাবে না। প্রশাসনকে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়, দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ সাংবাদিককে ভয় দেখানো মানে শুধু একজন সাংবাদিককে ভয় দেখানো নয়; সমাজকে অন্ধকারে রাখা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে সরকারকে সতর্ক হতে হবে। সাইবার আইন যেন নতুন কোনো দমনমূলক আইনে পরিণত না হয়। অর্থনীতিতে রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে বাস্তব সংস্কার দরকার। বিশ্বব্যাংক খাত, জ্বালানি ও রাজস্ব ব্যবস্থাকে সংস্কারের অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— বিএনপিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি একটি দলীয় সরকার হবে, নাকি একটি রাষ্ট্রীয় সরকার? দলীয় সরকার নিজের লোককে বাঁচায়। রাষ্ট্রীয় সরকার আইনকে বাঁচায়। দলীয় সরকার বিরোধী কণ্ঠকে ভয় পায়। রাষ্ট্রীয় সরকার বিরোধী কণ্ঠকে সহ্য করে। দলীয় সরকার প্রশাসনে আনুগত্য খোঁজে। রাষ্ট্রীয় সরকার যোগ্যতা খোঁজে। আজ বিএনপির সামনে এই মৌলিক পরীক্ষাটিই দাঁড়িয়ে আছে।
জুলাই বিপ্লবের পর মানুষ শুধু সরকার পরিবর্তন চায়নি; মানুষ রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তন চেয়েছিল। সেই আকাঙ্ক্ষা যদি আবার দলীয়করণ, দখল, চাঁদাবাজি, হামলা, ভয় এবং মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আটকে যায়, তাহলে হতাশা তৈরি হবেই। সাত মাসে একটি সরকারকে চূড়ান্ত ব্যর্থ বলা যায় না; কিন্তু সাত মাসে সতর্কসঙ্কেত দেখা দিলে তা উপেক্ষা করাও যায় না। বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ বিরোধী দল নয়; সবচেয়ে বড় বিপদ হলো— নিজেদের দলের এমন একটি অংশ, যারা দলীয় ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত ক্ষমতা মনে করতে শুরু করে। সরকার যদি তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, রাষ্ট্র শক্তিশালী হবে। আর যদি না পারে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই— বিএনপি কি দেশ চালাচ্ছে, নাকি বিএনপির একটি অংশ সরকার চালাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








