ডা: শাহ মো: বুলবুল ইসলাম
ডা: শাহ মো: বুলবুল ইসলাম। নয়া দিগন্ত

২০২২, ২০২৪ ও ২০২৫ সাল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার টাইমলাইনে এক একটি স্বর্ণালি সম্ভাবনায় উজ্জ্বল। আশ্চর্যজনক যে, এই সম্ভাবনার নেতৃত্ব প্রচলিত রাজনীতির কোনো নেতার নেতৃত্বে হয়নি। হয়েছে তারুণ্যের দীপ্ত ছটায় আলোকিত ছাত্র এবং তরুণ প্রজন্মের সামষ্টিক নেতৃত্বে; যাদেরকে এক পরিভাষায় ডাকা হয় জেন-জি নামে। এই প্রজন্ম প্রতিবাদী; সংস্কারপন্থী। সংস্কার চায় দেশের, প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার এবং পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের। এরা সরাসরি প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী, বিশ্বাসী মেধায়, কোটা নামক কোন সুরক্ষিত সুবিধায় নয়। এই প্রজন্ম জনগণের ক্ষমতার প্রকাশ ও বাস্তবায়ন এবং বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আস্থাশীল আইনের শাসনে। এরা রাজনীতির কূটচালে অভ্যস্ত নয়। এদের প্রকাশ সরল ও সোজা। প্রতিবাদী ভাষা অত্যন্ত সংহত, সংগঠিত এবং লক্ষ্যভেদী। এই প্রজন্ম ঘোরতর দুর্নীতিবিরোধী, রাজনৈতিক চাটুকারিতার অপসংস্কৃতি সংশোধনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একই সাথে রাজনৈতিক লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হওয়াকে ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করে। এরা দেশকে নতুন আঙ্গিকে গড়তে চায়— বর্তমান এবং আগাম বিশ্বের প্রয়োজনের আলোকে। তাদের স্বপ্নের আলাকে পথ চলতে গিয়ে তাদেরকে অনেক মূল্যও দিতে হয়েছে। অনেক সম্ভাবনা অকালেই ঝরে পড়তে হয়েছে, রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে তাদের রক্তে। ক্ষতি হয়েছে জাতীয় সম্পদের। সব কিছুর বিনিময়ে কাঙ্ক্ষিত ¯¦প্নের দেখা মিলেছে উল্লিখিত তিনটি টাইমলাইনে যথাক্রমে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে প্রতিষ্ঠিত রাজশক্তি ধসে পড়ার মাধ্যমে। নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে তিনটি দেশেই। বিপ্লব শেষে জেন-জিরা ফিরে গেছে তাদের ঠিকানায়, তাদের কাজে। তিনটি ঐতিহাসিক রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর কেমন চলছে এই তিনটি দেশ— তা জানার আগ্রহ থাকাই স্বাভাবিক। এই কৌতূহলের কারণে দুটি প্রতিবেশী দেশ নেপাল ও শ্রীলঙ্কার অবস্থা দেখার অদম্য ইচ্ছা ছিল। সম্প্রতি দু’বার শ্রীলঙ্কা যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। নেপালে যাওয়ার ঠিক পূর্ব-মুহূর্তে প্রলয়ঙ্করী বন্যা ও ভূমিধসের কারণে নেপাল যাওয়া বাতিল করতে হয়েছে। ফলে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তাদের রাষ্ট্রীয় এবং সাধারণ জীবনাচারের পরিবর্তন দেখার সুযোগ হয়নি। তবে অকাল বন্যার তাণ্ডবে ছিন্নভিন্ন নেপালের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চিত্রটা স্পষ্ট উপলব্ধি করা যায়  সঙ্কট মোকাবেলায় তাদের দৃঢ় মনোবল দেখে। নেপালে বন্যা ত্রাণ সহযোগিতার একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশের মাননীয় হাইকমিশনারের মাধ্যমে। কিন্তু ত্রাণ গ্রহণে সবিনয় অস্বীকৃতি নেপাল সরকারের উঠে দাঁড়ানোর ইঙ্গিতবাহী। পরে যদিও তাদের বিদেশী সাহায্য নিতে হয়েছে কেবল কারিগরি বিষয়ে। একই সাথে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর বক্তব্য নেপালের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে। বাংলাদেশও পেরিয়েছে একই ধারাবাহিকতা। ২০২৪ এর অগ্নিগর্ভ জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশও নেপাল এবং শ্রীলঙ্কার মতো পেরিয়েছে নির্বাচনী বৈতরণী। প্রতিটি দেশেই ক্ষমতায় এসেছে নির্বাচিত সরকার। নেপাল ও শ্রীলঙ্কার নতুন সরকার বিপ্লবের আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। ধ্বংসের ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির মতো উঠে দাঁড়িয়েছে শ্রীলঙ্কা। শুধু ঘুরে দাঁড়ানোই নয়। এগিয়ে যাওয়ার প্রতিটি ক্ষেত্রে শক্তপোক্ত ভিত তৈরি করেছে ইতোমধ্যেই। যেখানে বাংলাদেশে দুর্নীতির জয়জয়কার, সেখানে শ্রীলঙ্কার কোথাও দুর্নীতির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া ভার। সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য সড়ক মহাসড়কে নেই যানজট। সড়কে নেই ট্রাফিক পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি। কেউ কোথাও কোনোভাবে নিয়ম ভাঙার প্রতিযোগিতায় নেই। প্রতিটি রাস্তা ঝকঝকে পরিষ্কার। কোথাও কোনো আবর্জনা দৃশ্যমান নয়। সড়ক মহাসড়কে অহেতুক খোঁড়াখুঁড়ি নেই। শ্রীলঙ্কায় প্রতিদিনই কয়েক দফা বৃষ্টি হয়। কিন্তু আমাদের দেশের মতো বর্ষা এলেই রাস্তা ভেঙে যাওয়া বা দেবে যাওয়ার নজির নেই। ভাবতেও অবাক লাগে, সাত দিনে কোথাও ভিক্ষুক চোখে পড়েনি।  যত রাতই হোক, যে কেউ রাস্তায় নিঃশঙ্কভাবে চলাফেরা করতে পারে। মজার ব্যাপার, আমার এক সহকর্মী সমুদ্রতীরে বেড়াতে গিয়ে মানিব্যাগ হারিয়ে ফেলেন। তিনি যখন এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় অস্থির তখন সমুদ্রতীরের পাহারাদার মানিব্যাগ হাতে এসে হাজির। সে খুঁজে খুঁজে ঠিক মালিককে বের করে ফিরিয়ে দিয়ে গেল কুড়িয়ে পাওয়া ম্যানিব্যাগ। 
বাংলাদেশে এমন ঘটনা বিরল। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শ্রীলঙ্কা আজ এ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো খাবার বা দ্রব্য বাজার থেকে উধাও হয়েছে আইনের কঠোর অনুশাসনে। অন্যদিকে ঢাকা আজ ছিনতাইকারীদের, কিশোর গ্যাংয়ের স্বর্গরাজ্য। এখানে মব সৃষ্টি করে রাজনীতির ছত্রছায়ায় চলে দখলবাজির মহোৎসব। লোহার রডের পরিবর্তে বাঁশ দিয়ে ব্রিজ তৈরির উদাহরণ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশেই। আঁতিপাঁতি, সিকি, দুয়ানি নেতার জ্বালায় অতিষ্ঠ সাধারণ জনগণ। ফুটপাথ প্রভাবশালীদের কল্যাণে হকারদের দখলে। বৈদ্যুতিক রিকশা দখল করে আছে মূল সড়ক। দিন দিন সড়ক দখল হচ্ছে এসব অবৈধ যানের কারণে। এসব দেখার কেউ কোথাও নেই। শ্রীলঙ্কার কলম্বো, বনতোতা, গল, ক্যান্ডি প্রভৃতি শহরে রয়েছে প্রচুর রিকশা যা স্থানীয়ভাবে টমটম নামে পরিচিত। এরা রাস্তায় অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে চলাচল করছে। নিয়ম ভাঙা, উল্টোদিকে চলার কথা এরা ভাবতেই জানে না। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে সর্বত্রই আইন অমান্য করার প্রবণতা। এখানে রাজনীতির মতিগতি দুর্বোধ্য। সরকার প্রথম থেকেই ২৪ এর বিপ্লবকে পাশ কাটিয়ে চলার কূটকৌশলে ব্যস্ত। ব্যস্ত পতিত ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন, প্রত্যাবাসনে। 
কয়েক দিন আগে হাসিনা আসার ব্যাপারে সরকারের একজন মন্ত্রী ঘোষণা দেন, কেউ পানি ঘোলা করার চেষ্টা করলে যথাযোগ্য ব্যবস্থা নেয়া হবে। এর দু’দিন পর প্রতিবেশী দেশের মাননীয় রাষ্ট্রদূত শেখ হাসিনার ব্যাপারে প্রকাশ্যে যেসব মন্তব্য করেছেন সে বিষয়ে সরকারের নীরবতা ধোঁয়াশা তৈরি করছে। বাজারে জোর গুজব, ইতোমধ্যে ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও ‘র’ প্রধান গোপনে ঘুরে গেছেন এদেশ। এ ব্যাপারে সরকার নীরব। এই মনোভাব জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধারণ করে না। যেখানে নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা তাদের নিজ নিজ এবহ-ত এর চেতনাকে ধারণ করে নতুন করে দেশ গড়ায় এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে আমরা চানক্যের উত্তরসূরির ভূমিকা পালনে ব্যস্ত। এজন্যই শ্রীলঙ্কার মাথাপিছু বার্ষিক আয় ৪৫০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম। আর বাংলাদেশ ঋণ সংগ্রহে ব্যস্ত। শ্রীলঙ্কার পক্ষে এটা সম্ভব হয়েছে জেন-জির  আকাঙ্ক্ষা ও উদ্দেশ্য ধারণ এবং দেশের আবালবৃদ্ধবনিতার শর্তহীন অংশগ্রহণে। বাংলাদেশ কবে পারবে এই উদাহরণ সৃষ্টি করতে? 
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ
shah.b.islam@gmail.com

Advertisement