উপসম্পাদকীয়
মতামত লোগো। নয়া দিগন্ত

জাকার্তায় প্লেন থেকে নেমে একসাথেই যাচ্ছিলাম। ইমিগ্রেশন কাউন্টারে গিয়ে পথ আলাদা হয়ে গেল। অন্য দেশের সহযাত্রীরা মেশিনে পাসপোর্ট স্ক্যান করে মিনিট দুয়েকে বেরিয়ে গেল। আর বাংলাদেশী আমি লাইনে দাঁড়ালাম। সামনে অন্তত ১০০ মানুষ। সহযাত্রীরা বাইরে দাঁড়িয়ে আমার ইমিগ্রেশন ক্লিয়ার হওয়ার অপেক্ষায় আছে, আর কিছুক্ষণ পরপর হাত নাড়ছে। ইমিগ্রেশনে অনেক কাউন্টার থাকলেও মাত্র দু’টি কাউন্টার চালু আছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ইমিগ্রেশন অফিসারের সামনে গেলাম। পাসপোর্টে চোখ বুলিয়ে নিয়ে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন আমি এলিয়েন অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছি। 
পরদিন জাকার্তায় দু’টো মিটিং সেরে রাতের ফ্লাইটে সুরাবায়া পৌঁছলাম। ডমেস্টিক ফ্লাইট তাই ইমিগ্রেশনের কোনো ঝামেলা নেই। নিজেকে হালকা লাগছে। সেটি হলো ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়েও জাকার্তার মিটিংগুলো নির্বিঘ্নে সম্পূর্ণ করতে পারা। ঘণ্টা দুয়েকের মিটিংয়ের পুরোটাজুড়েই কাজের কথা হলো। ট্যুরিস্ট ভিসায় বিজনেস মিটিং করছি। কেউ জানুক আমি তা চাইছিলাম না। 
ক’দিন আগে সস্ত্রীক গেলাম ইস্ট মালয়েশিয়ার কোটা কিনাবালু। মালয়েশিয়ার ভিসা থাকলেও এই শহরে ঢুকতে চিফ মিনিস্ট্রারের অফিস থেকে আলাদা পারমিশন নিতে হয়। লজ্জাজনক ব্যাপার হলো— বাংলাদেশ ছাড়া আর একটি দেশকে এই বাড়তি পারমিশনের লিস্টে রাখা হয়েছে তা হলো— নাইজেরিয়া। আলাদা পারমিশন নিয়েও সবার মতো ইমিগ্রেশনের নিয়মিত লাইন দিয়ে বের হতে পারলাম না। পাসপোর্ট দিতেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে অফিসারটি পাসপোর্ট নিয়ে বলল, ‘কাম উইথ মি’। ওর বলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে, এ শহরে পা ফেলে বোধ হয় কোনো অন্যায় করেছি। আমাদেরকে অফিসের বাইরে বসিয়ে ভেতরে গেল। আধা ঘণ্টা পর এসে পাসপোর্ট দিয়ে লাইনে দাঁড়াতে বলল। 
২৫ বছরের চাকরিজীবনে অনেক দেশে গেছি। ভিসা পাওয়া-না পাওয়ার অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা লিখে সব শেষ করা যাবে না। আমি একা না, সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে উন্নত বিশ্বে ভ্রমণ করা দেশের প্রতিটি নাগরিকই বেইজ্জতির শিকার হচ্ছেন। গন্তব্য ভেদে এই বেইজ্জতি কারো ক্ষেত্রে একটু কম আর কারো ক্ষেত্রে একটু বেশি। সম্প্রতি কানাডা থেকে দেশে ফেরার পথে ইতালির রোমে আটকেপড়া বিমান যাত্রীদের বেহাল দশার কথা নিশ্চয় সবার মনে আছে। পাসপোর্ট সবুজ হওয়ার কারণেই তাদেরকে দুই দিন বিমান বন্দরে থাকতে হয়েছে। পাসপোর্টের মানের ক্রমাগত অধঃপতনই মূলত এই বেইজ্জতির কারণ। একজন নাগরিক আগাম ভিসা ছাড়াই পৃথিবীর মোট কতটি দেশে যেতে পারে তার উপরই রাংকিংটা করা হয়। আন্তর্জাতিক মানের সূচকে একনম্বর স্থানে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাগরিকরা আগাম ভিসা ছাড়া মোট ১৮২টি দেশে পারে। আর দ্বিতীয় স্থানে আছে সিঙ্গাপুরের পাসপোর্ট। একজন সিঙ্গাপুরিয়ান আগাম ভিসা ছাড়া ১৭৫টি দেশে পারে। সেখানে সবুজ পাসপোর্টের অবস্থান ৯৪তম। আমাদেরকে ১৫০টি দেশে যেতে ভিসা নিতে হয়। আর যে ৪৮টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়া যাওয়া যায় সেগুলো যাওয়া না যাওয়া তেমন কোনো গুরুত্ব বহন করে না। এমনকি আফ্রিকার অনেক দেশ যেমন— উগান্ডা, সিয়েরা লিওন, কঙ্গো, জিবুতি, গিনি, এ্যাঙ্গোলার অবস্থানও বাংলাদেশের উপরে। 
সূত্র : https://www.passportindex.org/byRank.php
অথচ এই সবুজ পাসপোর্ট নিয়েই আগাম ভিসা ছাড়া ১৯৮৯ সালে হংকং গিয়েছিলাম, আর ১৯৯৬ সালে এসেছিলাম সিঙ্গাপুর। এখন এ দু’টো দেশের ভিসা পাওয়াই দুষ্কর। সিঙ্গাপুরের ভিসা যদিও বা পাওয়া যায় হংকংয়েরটা পেতে অনেক বেশি বেগ পেতে হয়। প্রশ্ন হলো— সংযুক্ত আরব আমিরাত এক নম্বরে, সিঙ্গাপুর দুই নম্বরে আর আমরা ৯৪-তে কেন? খুব সংক্ষেপে বললে এর মূল কারণ হলো— সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা সিঙ্গাপুরের একজন নাগরিক পৃথিবীর কোনো দেশে গেলে নিজ দেশে ফিরে আসে। ওই দেশে থেকে যাবে এমনটি চিন্তাও করে না। আর আমরা? আমাদের ধান্দাই হলো কোনোভাবে সে দেশে যেতে পারলে থেকে যাওয়া। অসুস্থ চিন্তাভাবনা। আমেরিকা ইউরোপ এখন আর সেই আশির দশকের আমেরিকা ইউরোপ নেই। এন্টি ইমিগ্রেশন পার্টিগুলো ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। বৈধ উপায়ে গিয়েও আর আগের মতো সুবিধা করা যায় না। তারপরও দেশের অনেক মানুষ লোভ সংবরণ করতে পারছে না। অবৈধ উপায়ে অনেক টাকা খরচ করে সেসব দেশে যেতে জীবন বাজি রাখছে। অনেকে ফিরছে লাশ হয়ে। 
একই বিষয় নিয়ে বারবার লেখার উদ্দেশ্য একটিই— সরকারের নীতিনির্ধারকদের ঘুম ভাঙানো। তবে তারা ঘুমিয়ে আছে, এটি মনে করার কোনো কারণ নেই। তারা জেগে জেগে ঘুমিয়ে থাকার ভান করছে। সে কারণেই আমরা কোনো কার্যকরী পদক্ষপ নিতে দেখি না। এই তো ক’দিন আগে জাল ভিসা নিয়ে মালয়েশিয়াগামী ফ্লাইটে উঠতে গিয়ে ছয়জন যাত্রী ধরা পড়ল। তারপর ৭৬ জন যাত্রী বোর্ডিং পাস নিয়েও এয়ারপোর্ট থেকে লাপাত্তা হয়ে গেল। এ রকম একটি ঘটনার পরও আমরা সরকারকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখলাম। কোনো তদন্ত হলো না। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হলো না। এই যদি হয় সরকারের ভূমিকা তাহলে সে দেশের নাগরিককে বহির্বিশ্ব কেন বিশ্বাস করবে আর কেনই বা ভিসা ফ্রি এন্ট্রি দেবে?  
আমাদের অসাধু আদম ব্যবসায়ীরা হাজারো অন্যায় অনিয়ম আর প্রতারণা করে কোনো শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছে না। এই একই কাজ যদি পাসপোর্টের সূচকে এক নম্বরে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা দুই নম্বরে থাকা সিঙ্গাপুরের কোনো আদম ব্যবসায়ী তাদের নাগরিকদের সাথে করে তাহলে নির্ঘাত মৃত্যুদণ্ড কিংবা যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করতে হবে। সরকার ভেদে আইন প্রয়োগের এই যে তারতম্য এটিও পাসপোর্টের মান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। তাই সরকারের মূলত তিনটি কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি— ১. অবৈধ বিদেশ গমন ঠেকাতে তদারকি; ২. বিদেশ গমনেচ্ছুদের সতর্কীকরণ; ৩. আইন প্রণয়ন আর তার যথাযথ প্রয়োগ। 
প্রবাসীদের হয়রানি বন্ধ এবং অসাধু আদম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে ইদানীং সংসদে কথাবার্তা হচ্ছে, এটা নিঃসন্দেহে ভালো খবর। তবে তা যেন কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কার্যকরী পদক্ষেপে রূপান্তরিত হয়। সরকারের উচিত হবে অনতিবিলম্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা। যে টাস্কফোর্সের অন্যতম কাজ হবে অবৈধ বিদেশ গমন ঠেকানো। আর যারা বিদেশে অবৈধভাবে আছে তাদেরকে দেশে এনে সুষ্ঠু তদন্ত করে যেসব অসাধু আদম ব্যবসায়ী এর সাথে জড়িত তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া। এটি করতে পারলে পাসপোর্টের মান একটি সম্মানজনক জায়গায় যেতে সময় লাগবে না। আর আমরা নাগরিকরাও বেইজ্জতি হওয়া থেকে অনেকটা রেহাই পাব। এতে করে বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের পথ আরো প্রশস্ত হবে। 
আমাদের তরুণরা শিক্ষা কিংবা চাকরির প্রয়োজনে, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণে কোনো প্রকার হয়রানি ছাড়াই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাবে। জীবিকার তাগিদে মেক্সিকোর জঙ্গল, ভূমধ্যসাগর কিংবা ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে গিয়ে আর লাশ হয়ে ফিরবে না। অন্য দিকে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা, ঘুমিয়ে থাকা পাসপোর্টের মান অদূর ভবিষ্যতে নর্থ কোরিয়া কিংবা আফগানিস্তানের সারিতে নামিয়ে আনলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। 
লেখক :  প্রবাসী
harun52000@yahoo.com

Advertisement