মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

দেশের সেনাবাহিনী ও উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চলছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় মহলবিশেষ এমন অপতৎপরতা চালাচ্ছে। সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর ভাবমর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ করার এমন আয়োজন নতুন নয়। তবে নতুন করে জোরদার করা হয়েছে। নামে-বেনামে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হচ্ছে অপতথ্য। তাদের লক্ষ্য সামরিক বাহিনীর ভাবমর্যাদা বিনষ্টের মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি। এ লক্ষ্যে সেনাবাহিনী ও এর শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিশানা করা হচ্ছে। চেষ্টা চলছে বাহিনীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির।  সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি। নকল, অসত্য, কাটপিস বা খণ্ডিত তথ্য মেশানো কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে ধূর্ততার সাথে। তথ্য যাচাইকারী একাধিক প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণে যা প্রতীয়মান হয়েছে। 
রিউমর স্ক্যানারের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ৯৬টি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করা হয়। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৭৪। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে এ ধরনের অপতথ্যের মাত্রা বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। একই সময়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে লক্ষ্য করে ২১টি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে। সামগ্রিকভাবে সশস্ত্রবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়ে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ১৯৫টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমার স্ক্যানার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা ও সামরিক বাহিনীকে ঘিরে ছড়ানো অপপ্রচারের এ হার বেড়েছে প্রায় ৭১ শতাংশ। অপপ্রচারকারীদের কাল্পনিক দাবির সাথে প্রকৃত পরিস্থিতির কোনো সম্পর্ক নেই। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধান যে ধৈর্য, পেশাদারত্ব ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেন তা দেশে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়।
চব্বিশের ৫ আগস্ট তৎকালীন সরকারপ্রধানের পদত্যাগের পর দেশে যখন এক গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তখন সেনাবাহিনী অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। এরপরও গুজব পিছু ছাড়েনি। 
সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে নানা প্রচারণা সম্প্রতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। দেশের ভেতরে বা বাইরের কিছু কুচক্রী মহল যারা দেশে গণতান্ত্রিক বা স্থিতিশীল পরিবেশ দেখতে চায় না, তারাই সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করার মাধ্যমে পানি ঘোলা করার চেষ্টা করে। এটি সাধারণ জনগণ বা রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। সচেতন জনমনে প্রশ্ন জাগছে, সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করে আসলে লাভ কার? এতে মোটাদাগে লাভবান হবে রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি। ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্র, জনগণ এবং দেশের ভবিষ্যৎ। 
সেনাবাহিনীকে নিয়ে রাজনীতি বা সেনাবাহিনীকে দিয়ে রাজনীতির চেষ্টা এ দেশে টেকেনি। যারা সেই চেষ্টা করেছেন তাদের বরণ করতে হয়েছে করুণ পরিণতি। পতিত ও বিতাড়িত হতে হয়েছে। দেশান্তরিও হতে হয়েছে। 
বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, রাজনীতিবিদদের বিকল্প রাজনীতিবিদরাই। সেনাবাহিনী নয়। 
সেনাবাহিনীর প্রাথমিক দায়িত্ব দেশের অখণ্ডতা রক্ষাসহ বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করা। পাশাপাশি যেকোনো জরুরি অবস্থায় বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় এগিয়ে আসতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সাংবিধানিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই এই বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচারণায় বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। এটি কোনোভাবে কাম্যও নয়। 
চব্বিশের ৫ আগস্টের স্পন্দন সাধারণ মানুষের মনোজগতে একটা পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে। প্রকারান্তরে এটিও এক ধরনের সংস্কার। সশস্ত্রবাহিনী কেবল সার্বভৌমত্বের প্রতীক নয়, দেশের স্থিতিশীলতায়ও কত কার্যকর জুলাই বিপ্লবে তার নজির রেখেছে সেনাবাহিনী। 
বিচারিক ক্ষমতা নিয়ে মাঠে থাকা সেনাসদস্যরা কোথাও শো আপ করেননি। বলপ্রয়োগ করেননি। পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর সহায়কের মতো কাজ করেছেন। সেনাসদস্যরা মাঠে না থাকলে সে সময় আইনশৃঙ্খলার কী দশা হতো,  জনগণ তা যথার্থই উপলব্ধি করেন।    
সশস্ত্রবাহিনীকে বিতর্কিত করলে তাদের মনোবলে টোকা পড়ে। বহিঃশত্রুরা উল্লসিত হয়। তারা সুযোগ নেয়ার সাহস পায়। যা দেশের জন্য আত্মঘাতী। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ববিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা সেই অপেক্ষাই করছে। 
বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত পেশাদার, দক্ষ, প্রত্যয়ী।  তার সমালোচনার অধিকার সবার আছে। কখনো কখনো সমালোচনায় উপকারও হয়। শুদ্ধি আসে। তাই বলে বেলাগাম সমালোচনা কাম্য হতে পারে না। 
সেনাবাহিনীর ইমেজে আঘাত করা কতটা অপরিণামদর্শী তা রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজনীতিতে সম্পৃক্তরা ভালো বোঝেন। তাই সেনাবাহিনী নিয়ে সাম্প্রতিক প্রচারণা বুমেরাং হতে বাধ্য।
জাতিসঙ্ঘ মিশনে সেনাদের সাফল্য মূলত সঙ্ঘাত নিরসন, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক সহায়তা প্রদানের মধ্যে নিহিত। এসব সাফল্য বিশ্বমঞ্চে শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসঙ্ঘের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। জাতিসঙ্ঘ মিশনে সেনাদের অংশগ্রহণের ফলে কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, মোজাম্বিক এবং নামিবিয়াসহ অনেক দেশে সঙ্ঘাতের অবসান হয়েছে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ১৯৮৮ সাল থেকে অবদান রাখা শুরু করে। এর পর থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন সঙ্কটপূর্ণ অঞ্চল, যেমন কঙ্গো, দারফুর, লিবিয়া, হাইতি, সিয়েরা লিওন, দক্ষিণ সুদান, মালিসহ আরো অনেক দেশে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষী সদস্যরা কঠিন পরিবেশে কাজ করার সময় মানবিকতার মহত্ব বজায় রেখে সংহতি, বন্ধুত্ব ও নিরাপত্তার বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে। 
যুদ্ধ-বিধ্বস্ত অঞ্চলে বেসামরিক নাগরিকদের জীবন, সম্পত্তি এবং মানবাধিকার রক্ষায় সেনারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। দুর্যোগ বা সঙ্ঘাতের সময় মানবিক সহায়তা, যেমন খাদ্য, পানি এবং চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে তারা সাহায্য করে। বাংলাদেশী সেনা কর্মকর্তারা বিভিন্ন মিশনে ফোর্স কমান্ডার ও ডেপুটি ফোর্স কমান্ডার হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্বে শান্তি সুরক্ষার এই সুদীর্ঘ পথে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটি নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার ফলে কেবল সামরিক দক্ষতা বৃদ্ধি পায়নি, বাংলাদেশের কূটনৈতিক শক্তি ও মানবিক ভাবমূর্তিও আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত হয়েছে। 
সেনাবাহিনী তার ‘দেশপ্রেমিক’ বিশেষণের সম্মান অক্ষরে অক্ষরে রাখতে পেরেছে এবং তা বিশ্বব্যাপী আলোচিত ও প্রশংসিত। সেই অর্জনকে অপপ্রচারের মাধ্যমে বরবাদ করা যাবে না। 
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট