স্মরণসভা
বরেণ্য সাংবাদিক আতাউস সামাদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিএজ‘র উদ্যোগে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। সংগৃহীত

সাংবাদিক আতাউস সামাদ কী করবেন, সে সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নিতেন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তাকে দিয়ে কোনো কিছু করাতে পারেনি। আপাতদৃষ্টিতে নরম-সরম মানুষ হলেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা। নিজের বিশ্বাস ও নীতির জায়গা থেকে তাকে সরানো সম্ভব ছিল না। দেশের নষ্ট রাজনীতিও কখনো তাকে স্পর্শ বা প্রভাবিত করতে পারেনি—এমন মন্তব্য করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আবদুস সালাম।

Advertisement

শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে বরেণ্য সাংবাদিক আতাউস সামাদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টস (বিএজে) আয়োজিত স্মরণসভায় তিনি এসব কথা বলেন।

আবদুস সালাম বলেন, ‘নষ্ট রাজনীতির’ মধ্যে থেকেও রাজনীতি ও গণতন্ত্রকে এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচ্যুতি ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে। তবে সাংবাদিকদের একটি অংশও রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। এর ফলে সমাজ ও গণতন্ত্রের প্রত্যাশিত বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশ আবার গণতান্ত্রিক পথে হাঁটা শুরু করেছে। এ পথে ভুল-ত্রুটি থাকবে। তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধরে রাখা এবং সরকার পরিবর্তন যেন নিয়মতান্ত্রিকভাবে হয়, সে বিষয়ে সবাইকে কাজ করতে হবে।

সাংবাদিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে সংবাদ ও সাংবাদিকতা অবিচ্ছেদ্য অংশ। আতাউস সামাদের মতো নীতিনিষ্ঠ ও স্বাধীনচেতা সাংবাদিক বিরল। সমাজ ও মানুষের স্বার্থে নিজ নিজ পেশাগত অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার মতো মানুষ সাংবাদিকতায় প্রয়োজন।

রাজনীতিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবন ও আদর্শ অনুসরণের কথা উল্লেখ করে আবদুস সালাম বলেন, অল্প সময়ের রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিভিন্ন সংস্কারমূলক কাজ করেছেন। তার নীতি ও আদর্শ অনুসরণ করতে পারলে দেশকে এগিয়ে নেয়াসম্ভব।

বিএজের সভাপতি এম আবদুল্লাহর সভাপতিত্বে স্মরণসভা সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বুরহান উদ্দিন ফয়সাল। এতে বক্তব্য দেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, এনটিভির সাবেক বার্তা প্রধান খায়রুল আনোয়ার মুকুল, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও টাইমস অব বাংলাদেশের উপদেষ্টা সম্পাদক ইলিয়াস খান, লেখক ও টকশো ব্যক্তিত্ব সাখাওয়াত হোসেন শায়ন্ত, ডিইউজের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, বিএফইউজের সহকারী মহাসচিব এহতেশামুল হক শাওন, ডিইউজের সাবেক নেতা বেলায়েত হোসেন, আমিরুল ইসলাম অমর ও বিটিভির সাংবাদিক মোরশের আলম প্রিন্সসহ অনেকে।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, আতাউস সামাদের সাংবাদিকতার অন্যতম বড় গুণ ছিল তথ্যের নির্ভুলতা ও সত্যতা। সাবেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিসিআইসি ভবন পরিদর্শনের সময় কর্মচারীদের এরশাদবিরোধী স্লোগানের খবর সঠিকভাবে বিবিসিতে প্রচার করায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি নিজের প্রতিবেদনের সত্যতা নিয়ে আপস করেননি।

তিনি বলেন, পাকিস্তান অবজারভারে কাজ করার সময় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা কাভার করা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনামা গোপন চিরকুটের মাধ্যমে মাওলানা ভাসানীর কাছে পৌঁছে দেয়াএবং ১৯৭০ সালের শেষ দিকে প্রেস ক্লাব থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্লোগান নিয়ে মিছিলের নেতৃত্ব দেয়ার মতো ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে আতাউস সামাদ যুক্ত ছিলেন। সংবাদমাধ্যমের প্রায় সব শাখায় কাজ করা এই সাংবাদিকের নীতিনিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের কারণে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারাও তাকে সম্মান করতেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিএজের সভাপতি এম আবদুল্লাহ বলেন, আতাউস সামাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় ছিল তার। তিনি জুনিয়র সাংবাদিক ও সহকর্মীদের সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করতেন। তার সঙ্গে কাজ করার সময় বয়সের ব্যবধানও যেন দূর হয়ে যেত। সাংবাদিকদের সঙ্গে তিনি আন্তরিকভাবে মিশতেন এবং তাঁদের কাজ শেখাতেন।

আতাউস সামাদের ভাতিজা ও জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত বলেন, আতাউস সামাদ শুধু একজন প্রখ্যাত সাংবাদিকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন সৎ, সাহসী ও সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত মানুষ। কাজের প্রতি তার আন্তরিকতা ও সততা ছিল অকৃত্রিম। গভীর রাতেও তাকে সংবাদ ও পত্রিকার কাজে ব্যস্ত দেখা যেত। জ্যেষ্ঠ ও শিক্ষকদের প্রতি তার শ্রদ্ধা এবং সাহসিকতা তরুণ সাংবাদিকদের জন্য অনুকরণীয়।

সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, নব্বইয়ের দশকের পর দলীয় মেরুকরণের সময় আতাউস সামাদ স্বাধীন ও পেশাদার সাংবাদিকতার একটি বিরল দৃষ্টান্ত ছিলেন। সরকারি সুযোগ-সুবিধার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তিনি কখনো নিজের পেশাগত স্বাধীনতার সঙ্গে আপস করেননি। তথ্যের নির্ভুলতা ও প্রত্যক্ষ সূত্রের ওপর নির্ভরতা ছিল তার সাংবাদিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট খায়রুল আনোয়ার মুকুল বলেন, শিক্ষক এবং পরবর্তী সময়ে ‘আমার দেশ’ ও এনটিভিতে সম্পাদক হিসেবে আতাউস সামাদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল অনন্য। সাংবাদিকতায় তিনি ছিলেন নিখুঁত। ‘অজ্ঞাত সূত্র’ বা ‘সংশ্লিষ্ট মহল’-এর মতো অস্পষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে অনুমাননির্ভর প্রতিবেদন তিনি পছন্দ করতেন না। সুনির্দিষ্ট তথ্য, নাম ও দলিলের ভিত্তিতে সংবাদ পরিবেশনের ওপর তিনি গুরুত্ব দিতেন।

‘আমার দেশ’-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জাহেদ চৌধুরী বলেন, ‘আমার দেশ’কে জনপ্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ সংবাদপত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠায় আতাউস সামাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আমৃত্যু তিনি পত্রিকাটির সঙ্গে ছিলেন। তার কাছ থেকে সাংবাদিকতার অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে। সাংবাদিকতায় তথ্যের নির্ভুলতা ও পেশাগত মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে তার নিষ্ঠা সবার জন্য অনুপ্রেরণার।

টাইমস অব বাংলাদেশের উপদেষ্টা সম্পাদক ইলিয়াস খান বলেন, আতাউস সামাদ ছিলেন একজন পারফেকশনিস্ট। প্রতিবেদনে অসতর্কতা বা ফাঁকি তিনি সহজেই ধরে ফেলতেন। সংবাদে সূত্রের স্বচ্ছতার ওপর তিনি জোর দিতেন। শিক্ষক, সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে তিনি সহকর্মীদের অনেক কিছু শিখিয়েছেন। তার মতো নীতিনিষ্ঠ সাংবাদিকের প্রয়োজন রয়েছে।