মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে ওয়েস্টমিনস্টার ধারার সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয়। এ ব্যবস্থার মূলকথা শুধু এটুকু নয় যে, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে অধিকাংশ মন্ত্রী নিয়োগ করা হবে। সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাণ— সরকার সংসদ থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করবে। সেই সাথে নিজের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সংসদের কাছে জবাবদিহি করবে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৫(৩) অনুচ্ছেদেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে— মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়ী থাকবে।
কিন্তু সংবিধানের পাতায় দায়বদ্ধতার কথা লিখে রাখলে সরকার জবাবদিহিমূলক হয়ে ওঠে না। সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা কার্যকরে সংসদের হাতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও কার্যকর প্রক্রিয়া থাকতে হয়। প্রশ্নোত্তর পর্ব, জরুরি আলোচনা, মুলতবি প্রস্তাব, বাজেট বিতর্ক এবং অনাস্থা প্রস্তাব সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কয়েকটি স্বীকৃত পদ্ধতি। তবে সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকারের কাজ নিয়মিত, গভীর ও প্রমাণভিত্তিকভাবে পর্যবেক্ষণের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় সংসদকে সরকারের ওপর কার্যকর নজরদারির প্রতিষ্ঠান হিসেবে খুব কম সক্রিয় দেখা গেছে। বেশির ভাগ সময় সংসদে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এতটা প্রভাবশালী ছিল যে, সংসদ কার্যত সরকারের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সংসদ সদস্যদের স্বাধীন ভূমিকা, বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ এবং মন্ত্রীদের জবাবদিহি— সবকিছু দুর্বল থেকেছে।

স্থায়ী কমিটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
সংসদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, ব্যয়, প্রকল্প, প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা অনিয়ম বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। সংসদের সময় সীমিত, অথচ সরকারের কাজের পরিধি বিস্তৃত। তাই সংসদের ছোট ও বিশেষায়িত কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নীতি, ব্যয় ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে অনেক সময় সংসদের ‘চোখ ও কান’ বলা হয়। সংসদের অধিবেশনে রাজনৈতিক বক্তব্য ও নীতিগত বিতর্ক হয়; কিন্তু কমিটির বৈঠকে নথিপত্র, পরিসংখ্যান, সাক্ষ্য এবং বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে কোনো বিষয় গভীরভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব। সংসদে বক্তৃতা গণতন্ত্রকে দৃশ্যমান করে; কিন্তু কমিটির অনুসন্ধান গণতন্ত্রকে কার্যকর করে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সাংবিধানিক ভিত্তি দিয়েছে। এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সরকারি হিসাব কমিটি, বিশেষ অধিকার কমিটি এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য স্থায়ী কমিটি গঠন করবে। খসড়া বিল ও অন্যান্য আইন প্রণয়নের প্রস্তাব পরীক্ষা, আইনের প্রয়োগ পর্যালোচনা এবং সংসদ অর্পিত জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম বা প্রশাসন তদন্ত করার দায়িত্বও এসব কমিটিকে দেয়া যায়।
একই অনুচ্ছেদে সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শপথ বা অন্যভাবে সাক্ষ্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র উপস্থাপনে বাধ্য করার ক্ষমতা আইন দ্বারা কমিটিকে দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সংবিধান স্থায়ী কমিটিকে শুধু আলোচনার ফোরাম হিসেবে দেখেনি; বরং প্রয়োজন হলে অনুসন্ধান ও তদন্ত পরিচালনাকারী শক্তিশালী সংসদীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কল্পনা করেছে।
সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ২৪৬ থেকে ২৪৮ বিধি এ কাঠামোকে আরো স্পষ্ট করেছে। প্রত্যেক নতুন সংসদকে তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি স্থায়ী কমিটি গঠন করতে হয়। প্রতিটি কমিটিতে সভাপতিসহ সর্বোচ্চ ১০ জন সদস্য থাকতে পারেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী কমিটির সভাপতি হতে পারেন না, যদিও তিনি সংসদ সদস্য হলে পদাধিকারবলে কমিটির সদস্য থাকেন।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো কার্যপ্রণালী বিধির ২৪৮ বিধান। এতে প্রতিটি স্থায়ী কমিটিকে মাসে অন্তত একটি সভা করার নির্দেশ দেয়ার পাশাপাশি বিল পরীক্ষা, মন্ত্রণালয়ের কাজ পর্যালোচনা, কোনো কার্যক্রমে অনিয়ম বা গুরুতর অভিযোগ অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।
অতএব, বাংলাদেশের মূল সমস্যা আইনি ক্ষমতার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নয়। কোনো মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, অনিয়ম বা গুরুতর অভিযোগ অনুসন্ধানের ক্ষমতা মোটেই সামান্য নয়। যথাযথভাবে ব্যবহার করা গেলে একটি স্থায়ী কমিটি বড় প্রকল্পের অস্বাভাবিক ব্যয়বৃদ্ধি, সরকারি ক্রয়ে অনিয়ম, নীতিগত ব্যর্থতা, নাগরিকের অধিকার লঙ্ঘন কিংবা কোনো আইনের দুর্বল বাস্তবায়ন নিয়ে কার্যকর অনুসন্ধান করতে পারে।
কিন্তু কাগজে-কলমে ক্ষমতা থাকা এবং বাস্তবে ক্ষমতা প্রয়োগ করা এক বিষয় নয়। সভাপতির নির্বাচন যখন সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিয়ন্ত্রণে থাকে, কমিটির কর্মসূচি যখন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক অস্বস্তি এড়ানোর বিবেচনায় নির্ধারিত হয় এবং কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করলেও মন্ত্রণালয়কে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিতে হয় না, তখন শক্তিশালী বিধানও কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে।
মাসে একটি বৈঠক করলে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয় না। বৈঠকে কী প্রশ্ন করা হলো, কোন নথি চাওয়া হলো, কী তথ্য পাওয়া গেল, কী সুপারিশ করা হলো এবং সরকার তার কী জবাব দিলো— তা-ই আসল বিষয়।

মন্ত্রী একই সাথে তদারককারী ও তদারকির বিষয় হতে পারেন না
বাংলাদেশের মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সদস্য হিসেবে থাকেন, যদিও তিনি কমিটির সভাপতি হতে পারেন না। এখানে একটি মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক অসঙ্গতি আছে।
একটি স্থায়ী কমিটির দায়িত্ব হলো মন্ত্রণালয়ের কাজ পরীক্ষা করা, প্রশ্ন করা এবং প্রয়োজনে ব্যর্থতা বা অনিয়ম চিহ্নিত করা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সেই মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক প্রধান। তার নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং তার অধীন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম কমিটির পর্যবেক্ষণের বিষয়। যার কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কমিটি গঠিত, তিনি নিজেই যদি তার সদস্য হন, তাহলে স্বার্থের সঙ্ঘাত সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক।
মন্ত্রীকে অবশ্যই কমিটির সামনে আসতে হবে। তাকে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে এবং মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার দায় নিতে হবে। কিন্তু তার অবস্থান হওয়া উচিত জবাবদিহির জন্য উপস্থিত ব্যক্তি বা সাক্ষীর— তদারককারী কমিটির সদস্যের নয়। কমিটি মন্ত্রণালয়কে পর্যবেক্ষণ করবে; মন্ত্রণালয় কমিটির ভেতরে বসে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করবে না।

যুক্তরাজ্যের অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশের বর্তমান সংসদীয় ব্যবস্থার ঐতিহাসিক ভিত্তি ওয়েস্টমিনস্টার মডেল। যুক্তরাজ্যের হাউজ অব কমন্সে সরকারি বিভাগগুলোর কাজ, নীতি ও ব্যয় পর্যবেক্ষণে বিভাগীয় সিলেক্ট কমিটি আছে। এসব কমিটিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ব্যাকবেঞ্চ সংসদ সদস্যরা থাকেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী কমিটির সদস্য হিসেবে নিজের মন্ত্রণালয়কে তদারক করেন না; বরং প্রয়োজন হলে কমিটি তাকে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সামনে ডেকে প্রশ্ন করে।
যুক্তরাজ্যের বিভাগীয় সিলেক্ট কমিটিগুলো মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য শুনানিতে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। কোনো বিষয়ে তদন্ত শুরু করলে তারা বিশেষজ্ঞ, পেশাজীবী, নাগরিক সংগঠন, সেবাগ্রহীতা এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও লিখিত ও মৌখিক সাক্ষ্য নিতে পারে।
মৌখিক সাক্ষ্যগ্রহণ সাধারণত প্রকাশ্যে হয়। তা সরাসরি সম্প্রচার করা হয় এবং পরে ভিডিও ও লিখিত ট্রান্সক্রিপ্ট সংরক্ষণ করা হয়। ফলে জনগণ দেখতে পারেন, একজন মন্ত্রী বা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কী প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন। কিভাবে তার উত্তর দিচ্ছেন।
তবে কমিটির সব কার্যক্রম প্রকাশ্যে হয় না। তদন্তের পরিকল্পনা, সদস্যদের অভ্যন্তরীণ আলোচনা, প্রাপ্ত সাক্ষ্য মূল্যায়ন এবং খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সাধারণত গোপন রাখা হয়। অর্থাৎ সেখানে জনসম্মুখে জবাবদিহি এবং স্বাধীন ও কার্যকর অনুসন্ধানের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সব কমিটি সরকারের বিরোধিতা করে— বিষয়টি এমন নয়। সুপারিশও সাধারণত সরকারের ওপর আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু প্রকাশ্য জিজ্ঞাসাবাদ, তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন, বহুদলীয় অংশগ্রহণ এবং সরকারের আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি এসব কমিটিকে অত্যন্ত শক্তিশালী করেছে।

ভারতের অভিজ্ঞতা 
ভারতও ওয়েস্টমিনস্টার ধারার সংসদীয় সরকারব্যবস্থা অনুসরণ করে। দেশটির সংসদে ২৪টি ডিপার্টমেন্টালি রিলেটেড কমিটি আছে। প্রতিটি কমিটিতে লোকসভার ২১ জন এবং রাজ্যসভার ১০ জন— মোট ৩১ জন সদস্য থাকেন। এসব কমিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বাজেট ও অনুদানের দাবি, বিল, বার্ষিক প্রতিবেদন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিপত্র পরীক্ষা করে।
ভারতীয় ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— কোনো মন্ত্রী বিভাগ-সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটির সদস্য হতে পারেন না। কোনো কমিটির সদস্য পরে মন্ত্রী নিযুক্ত হলে তিনি কমিটির সদস্যপদ হারান। লোকসভার কার্যপ্রণালী বিধির ৩৩১-ডি বিধিতে এ নীতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে ভারতীয় ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। সরকার ও সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এক হলেও তদারককারী সংসদীয় কমিটি এবং তদারকির অধীন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব থাকা প্রয়োজন।
তবে স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে ভারতের মডেল যুক্তরাজ্যের মতো উন্মুক্ত নয়। ভারতীয় সংসদীয় কমিটির বৈঠক সাধারণত গোপনীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং সব সাক্ষ্যগ্রহণ সরাসরি সম্প্রচার করা হয় না। ফলে বাংলাদেশের সংস্কারের ক্ষেত্রে ভারতের মন্ত্রীবিহীন কমিটি কাঠামো এবং যুক্তরাজ্যের প্রকাশ্য সাক্ষ্যগ্রহণ— এ দুই ব্যবস্থার কার্যকর দিকগুলো সমন্বয় করা যেতে পারে।

বাংলাদেশে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন
প্রথমত, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য রাখার বিধান পরিবর্তন করা উচিত। মন্ত্রী কমিটির সামনে নিয়মিত উপস্থিত হবেন; কিন্তু একজন জবাবদিহিকারী হিসেবে— তদারককারী সদস্য হিসেবে নয়।
দ্বিতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতিত্ব বিরোধী দল এবং অন্যান্য সংসদীয় দলের মধ্যে আনুপাতিকভাবে বণ্টন করা প্রয়োজন। সরকারি হিসাব কমিটির পাশাপাশি অর্থ, স্বরাষ্ট্র, আইন, জনপ্রশাসন এবং প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত কয়েকটি কমিটির সভাপতিত্ব বিরোধী দলের সদস্যদের দেয়া যেতে পারে।
বিরোধী দলের নেতৃত্বাধীন কমিটি সরকারের বিকল্প সরকার নয় এবং তার কাজ প্রশাসনকে অচল করে দেয়া নয়। তার কাজ হলো প্রশ্ন করা, নথিপত্র পরীক্ষা করা, ভুল ও দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং জনস্বার্থে সংশোধনের পথ দেখানো। একটি সরকার নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার অর্জন করে; কিন্তু সেই বিজয় তাকে সংসদীয় নজরদারি থেকে অব্যাহতি দেয় না; বরং সরকার যত শক্তিশালী হবে, তার ওপর সংসদীয় তদারকিও তত শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, কমিটির সাক্ষী তলব এবং নথিপত্র চাওয়ার ক্ষমতাকে কার্যকর ও প্রয়োগযোগ্য করতে হবে। কোনো মন্ত্রী, কর্মকর্তা বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান যৌক্তিক কারণ ছাড়া কমিটির সামনে উপস্থিত হতে অথবা প্রয়োজনীয় নথি দিতে অস্বীকার করলে তার জন্য সুস্পষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা থাকতে হবে। শুধু অনুরোধ করার ক্ষমতা দিয়ে কার্যকর তদারকি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
চতুর্থত, জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কমিটির সাক্ষ্যগ্রহণ উন্মুক্ত ও সরাসরি সম্প্রচার করা উচিত। কোনো বড় প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্ঘটনা, দুর্নীতির অভিযোগ, ব্যাংকিং সঙ্কট, মানবাধিকার লঙ্ঘন, সরকারি প্রকল্পের অস্বাভাবিক ব্যয়বৃদ্ধি কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতা নিয়ে কাউকে কমিটির সামনে ডাকা হলে জনগণের জানার অধিকার আছে— তাকে কী প্রশ্ন করা হচ্ছে। তিনি কী উত্তর দিচ্ছেন।
তবে সব বৈঠক সরাসরি সম্প্রচার করা যুক্তিযুক্ত হবে না। জাতীয় নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, বিচারাধীন বিষয় কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ সাক্ষীর নিরাপত্তার প্রশ্ন থাকলে কমিটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করতে পারবে। কমিটির সদস্যদের অভ্যন্তরীণ আলোচনা, প্রাপ্ত তথ্য মূল্যায়ন এবং প্রতিবেদন প্রণয়নের বৈঠকও গোপন থাকতে পারে। কিন্তু জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ সাধারণভাবে প্রকাশ্য হওয়াই উচিত।
পঞ্চমত, প্রতিটি কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের পর সরকারকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বাধ্য করতে হবে। কোন সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছে, কোনটি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এবং প্রত্যাখ্যানের কারণ কী— সবকিছু জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট কমিটিকে একটি ‘গৃহীত ব্যবস্থা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন’ বা অ্যাকশন টোকেন রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে। তা না হলে কমিটির প্রতিবেদন সংসদের তাকেই পড়ে থাকবে; কিন্তু প্রশাসনের আচরণে কোনো পরিবর্তন আনবে না।
ষষ্ঠত, কমিটিগুলোর নিজস্ব গবেষক, আইনজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, পলিসি বিশেষজ্ঞ এবং প্রয়োজনীয় বাজেট থাকতে হবে। শুধু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে সেই মন্ত্রণালয়ের কার্যকর তদারকি করা সম্ভব নয়। কমিটিকে স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই, তুলনামূলক গবেষণা এবং বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণের সক্ষমতা দিতে হবে।
সপ্তমত, কমিটির সভার সময়সূচি, সদস্যদের উপস্থিতি, আলোচ্যসূচি, প্রকাশযোগ্য কার্যবিবরণী, গৃহীত সিদ্ধান্ত, প্রতিবেদন এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি জাতীয় সংসদের ওয়েবসাইটে নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। জনগণ যদি কমিটির কাজ সম্পর্কে জানতেই না পারে, তাহলে সেই কমিটির মাধ্যমে জনসম্পৃক্ত জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।

সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের দায়িত্ব
শক্তিশালী কমিটি গঠনের পাশাপাশি এর সদস্যদের রাজনৈতিক আচরণেও পরিবর্তন প্রয়োজন। বিরোধী দলকে বুঝতে হবে, কমিটির সভাপতিত্ব শুধু একটি পদমর্যাদা নয়; এটি কঠোর পরিশ্রম, নিরপেক্ষতা এবং প্রমাণভিত্তিক কাজের দায়িত্ব। সভাপতি যদি কমিটিকে দলীয় সংবাদ সম্মেলনের সম্প্রসারিত মঞ্চে পরিণত করেন, তাহলে প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে।
অন্য দিকে সরকারি দলের সদস্যরা যদি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা না করে প্রতিটি ক্ষেত্রে তার পক্ষ সমর্থনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তাহলে স্থায়ী কমিটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। সংসদীয় কমিটিতে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের প্রথম আনুগত্য হওয়া উচিত সংসদ, সংবিধান এবং জনস্বার্থের প্রতি। দলীয় পরিচয় থাকবে, রাজনৈতিক মতপার্থক্যও থাকবে; কিন্তু তথ্য, নথি ও জনস্বার্থের প্রশ্নে কমিটিকে দলীয় সীমার ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে।

সরাসরি সম্প্রচার যেন প্রদর্শনী না হয়
কমিটির প্রকাশ্য শুনানি চালুর সময় একটি সতর্কতাও প্রয়োজন। সরাসরি সম্প্রচারের উদ্দেশ্য যেন রাজনৈতিক নাটক, ব্যক্তিগত অপমান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছোট ভিডিও তৈরির প্রতিযোগিতায় পরিণত না হয়। প্রশ্ন হতে হবে সংক্ষিপ্ত, প্রাসঙ্গিক এবং প্রমাণভিত্তিক। সাক্ষীকে যথাযথ সম্মান দিতে হবে এবং উত্তর দেয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ রাখতে হবে। কমিটির সভাপতিকে দলীয় অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে শুনানি পরিচালনা করতে হবে।
কার্যকর সংসদীয় কমিটির লক্ষ্য কাউকে প্রকাশ্যে হেয় করা নয়। এর লক্ষ্য হলো— সত্য উদ্ঘাটন, নীতির দুর্বলতা চিহ্নিত করা, প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করা এবং সরকারকে তার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য করা।
নির্বাচন একটি সরকারকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ক্ষমতা দেয়; স্থায়ী কমিটি প্রতিদিন সেই ক্ষমতার ব্যবহার পরীক্ষা করে। প্রশাসনিক ব্যর্থতা সঙ্কটে পরিণত হওয়ার আগে, অপচয় বড় কেলেঙ্কারিতে রূপ নেয়ার আগে এবং ত্রুটিপূর্ণ আইন নাগরিকের ক্ষতি করার আগে সরকারকে সতর্ক করার প্রতিষ্ঠানই হলো সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশে ওয়েস্টমিনস্টার ধারার সংসদীয় ব্যবস্থা আছে। কিন্তু তিন দশকের বেশি সময় পরও আমরা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো শক্তিশালী তদারকি প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে পারিনি। আমরা কি স্থায়ী কমিটিগুলো ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রিত আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রেখে দেবো, নাকি নির্বাহী বিভাগের ওপর সংসদের সত্যিকারের নজরদারির প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করব? 
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

mwtanvir@gmail.com