
২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিরোনাম ‘এমএ সাঈদ ও সফিউর রহমানের বিদায় আসন্ন’– এ উঠে এসেছিল আগাম নির্বাচনের প্রস্তুতি ও নির্বাচন কমিশনের কার্যকারিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের বয়সসীমা নির্ধারণ এবং কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে কমিশনের অধিকাংশ সদস্যকে পদ থেকে সরানোর সম্ভাবনা থাকলেও বিষয়টি নিয়ে সরকারের মধ্যে মতপার্থক্য ও অনিশ্চয়তা ছিল।
আজ নয়া দিগন্তের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রতিবেদনটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো—
এমএ সাঈদ ও সফিউর রহমানের বিদায় আসন্ন
শাহীন রাজা
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং কমিশনের অন্য সদস্যদের বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে সংশোধনী আনা হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে যদি আগাম নির্বাচন ঘোষণা করতে হয় তার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে নতুন করে সাজানোর লক্ষ্যে এই সংশোধনী আনা হচ্ছে। এ বছরের কোনো এক সংসদ অধিবেশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং কমিশনের অন্য সদস্যদের বয়সসীমা ৬২ থেকে ৬৫'র মধ্যে রাখা হতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া একই সাথে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধিরও সম্ভাবনা আছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনের অন্য সদস্যদের পদ সাংবিধানিক হওয়ায় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে তাদের সরানো যায় না। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনারের প্রতি প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের মতো জোট সরকারও সন্তুষ্ট নয়।
বয়সসীমা নির্ধারণ করা হলে তারা আর পদে বহাল থাকতে পারবেন না বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়া সরকার মনে করছে, নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। নির্বাচন সংক্রান্ত অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েই সদস্যদের পরস্পরের মধ্যে মতবিরোধ দেখা গেছে। এতে সরকার যেমন বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে তেমনি জনগণের কাছেও নির্বাচন নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারণে বয়সসীমা নির্ধারণী সংশোধনীর মাধ্যমে গোটা কমিশনের কাঠামো পরিবর্তন করার চিন্তাভাবনা করছে সরকার।
জানা গেছে, জোট সরকার এ ব্যাপারে যুক্তি হিসেবে দেখাবে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনের অন্য সদস্যরা ছাড়া সাংবিধানিক সব পদেরই বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদমর্যাদার দিক থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নিযুক্ত বিচারপতিদের সমপর্যায়ের। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বয়সসীমা সম্প্রতি পুনর্নির্ধারণ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের বয়সসীমা নির্ধারণের এটাও অন্যতম কারণ বলে জানা যায়।
সরকার মনে করছে, বর্তমানে ভোটার সংখ্যা বহুগুণে বেড়ে যাওয়ার কারণে নির্বাচনী প্রক্রিয়া অনেক বেশি জটিল রূপ নিয়েছে। গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে হলে কমিশনে সুস্থ এবং কর্মক্ষম লোকের প্রয়োজন। কেননা নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় ও পাশাপাশি প্রত্যেক জেলায় জেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে আদেশ ও নির্দেশের মাধ্যমে কাজ করাতে হলে কর্মক্ষম লোকের খুবই প্রয়োজন।
বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এমএ সাঈদ গত ২০০০ সালের ২৩ মে শপথ নেন এবং তার মেয়াদকাল শেষ হবে আগামী বছরের ২৩ মে। ইতোমধ্যে তার বয়স ৬৭ বছর অতিক্রম করেছে। এছাড়া কমিশনের সদস্য সফিউর রহমানের মেয়াদ ২০০৫ সালের ২৪ জুন এবং মুসেফ আলী ও মোহাম্মদ আলীর মেয়াদ শেষ হবে ২০০৬ সালের ১৮ এপ্রিল।
বয়সসীমা সংশোধনীর পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়াও সরকার ইতোমধ্যে শুরু করে দিয়েছে। এই ক্ষমতা বাড়ানোর মধ্যে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের জনবল বৃদ্ধি, রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনকরণ এবং নির্বাচনে যাতে কালো টাকা ব্যবহার না হয় তার জন্য ব্যাপক ব্যবস্থা নেওয়া। এর মধ্যে আরও রয়েছে, ব্যাংক হিসাব পরীক্ষার পাশাপাশি আয়করের রিটার্ন দাখিল, পরিবার-পরিজনের হিসাব দাখিল এবং আয়ের উৎস বিবরণী নির্বাচন কমিশনের কাছে পেশ বাধ্যতামূলক করা।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বয়সসীমা নির্ধারণ এবং কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি সম্পর্কে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ নয়া দিগন্তকে জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি জানেন না। তবে যদি সংশোধনের ব্যবস্থা হয়েই থাকে তবে তা এই মুহূর্তে হচ্ছে না বলে তিনি জানান।
তবে এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, এ ধরনের বড় সিদ্ধান্ত মওদুদ সাহেবের জানার কথা নয়। সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদের সভায় আসা কয়েকটি বিলের কথা মওদুদ সাহেব আগে থেকে জানতেন না যে, বিল হিসেবে তা মন্ত্রিপরিষদ সভায় উপস্থাপন করা হবে।
বিএনপির একজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা বিষয়টি সম্পর্কে বলেন, এ ব্যাপারে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই মুহূর্তেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বয়সসীমা নির্ধারণের সংশোধনী আনা হচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের (১)-এ উল্লেখ করা হয়েছে, 'প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া এবং রাষ্ট্রপতি সময়ে সময়ে যেরূপ নির্দেশ করিবেন, সেইরূপ সংখ্যক অন্যান্য কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন। ১১৮(২)-এ বলা হয়েছে, 'একাধিক নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া নির্বাচন কমিশন গঠিত হইলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাহার সভাপতিরূপে কার্য করিবেন। ১১৮ অনুচ্ছেদের (৩)-এ বলা হয়েছে, "এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে কোনো নির্বাচন কমিশনারের পদের মেয়াদ তাহার কার্যভার গ্রহণের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসরকাল হইবে এবং (ক) প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এমন কোনো ব্যক্তি প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ লাভের যোগ্য হইবেন না; (খ) অন্য কোনো নির্বাচন কমিশনার অনুরূপ পদে কর্মাবসানের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনাররূপে নিয়োগ লাভের যোগ্য হইবেন, তবে অন্য কোনোভাবে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ লাভের যোগ্য হইবেন না। ১১৮ অনুচ্ছেদের (৪) ও (৫)-এ বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন এবং কেবল এই সংবিধান ও আইনের অধীন থাকিবেন। সংসদ কর্তৃক প্রণীত যে কোনো আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশনারদের কর্মের শর্তাবলী রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা যেরূপ নির্ধারণ করিবেন, সেইরূপ হইবে: তবে শর্ত থাকে যে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হইতে পারেন, সেইরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত কোনো নির্বাচন কমিশনার অপসারিত হইবেন না। ১১৮-এর অনুচ্ছেদ (৬) অনুযায়ী, সংবিধানের উপরোল্লিখিত বিধানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের বয়সের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বা অন্যান্য সাংবিধানিক সংস্থার প্রধানের জন্য নির্ধারিত বয়সসীমা প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের ক্ষেত্রে নির্ধারণ করা হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নির্বাচন কমিশনের অধিকাংশ সদস্য পদে বহাল থাকতে পারবেন না।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সৃষ্টির পর প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগ পান বিচারপতি এম ইদ্রিস (৭ জুলাই ১৯৭২ থেকে ৭ জুলাই ১৯৭৭ পর্যন্ত)। তিনি পূর্ণ পাঁচ বছর কাজ করেন। এরপর বিচারপতি একেএম নুরুল ইসলাম (৮ জুলাই ১৯৭৭ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫) আট বছর, বিচারপতি এটিএম মাসুদ (১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯০) পাঁচ বছর, বিচারপতি সুলতান হোসেন খান (১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ থেকে ২৮ ডিসেম্বর ১৯৯০) মাত্র ৮ মাস, বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ (২৫ ডিসেম্বর ১৯৯০ থেকে ১৮ এপ্রিল ১৯৯৫) পাঁচ বছর এবং বিচারপতি একেএম সাদেক (২৭ এপ্রিল ১৯৯৫ থেকে ৬ এপ্রিল ১৯৯৬) মাত্র এক বছর কাজ করার সুযোগ পান। এরপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে বিচারপতির বাইরে সরকারি আমলারা স্থান করে নেন। আমলাদের মধ্যে প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান আবু হেনা (৯ এপ্রিল ১৯৯৬ থেকে ৮ মে ২০০০)। তিনি প্রায় পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর আসেন বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এমএ সাঈদ।
বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এমএ সাঈদ বিগত সরকারের আমলে নিয়োগ লাভ করেন। তার আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বর্তমান জোট সরকার ক্ষমতায় আসে। এই নির্বাচন পক্ষপাতমূলকভাবে পরিচালনার অভিযোগ এনে অবশ্য আওয়ামী লীগ প্রধান নির্বাচন কমিশনার এমএ সাঈদকে বিশ্বাসঘাতক বলে উল্লেখ করে এবং তার পদত্যাগ দাবি করে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








