
২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘প্রতিদিন খোয়া যাচ্ছে পাঁচ হাজার মোবাইল ফোন’ প্রতিবেদনে দেশে মোবাইল ফোনের ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে চুরি, ছিনতাই, পকেটমার ও হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে এবং প্রতিদিন পাঁচ হাজারেরও বেশি ফোন খোয়া যাচ্ছে বলে আলোকপাত করা হয়। সেইসাথে মোবাইল হারিয়ে গ্রাহকদের আর্থিক ক্ষতি ও নানা প্রশাসনিক ঝামেলা পোহাতে হয়, অন্যদিকে নতুন সিম ও সংযোগ নিতে গিয়ে মোবাইল কোম্পানিগুলোও আর্থিকভাবে লাভবান হয় বলে তথ্য উল্লেখ করা হয়।
আজ নয়া দিগন্তের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রতিবেদনটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো—
প্রতিদিন খোয়া যাচ্ছে পাঁচ হাজার মোবাইল ফোন
তৌহিদুল ইসলাম
প্রতিদিন খোয়া যাচ্ছে পাঁচ হাজারেরও বেশি মোবাইল ফোন। দেশের ৪টি মোবাইল কোম্পানীর গ্রাহক সংখ্যা ২০ লক্ষাধিক। প্রতিদিনই বাড়ছে মোবাইল ফোনের গ্রাহক। মোবাইলের ব্যবহার যেমনি বাড়ছে তেমনি মোবাইল ফোন নিয়ে মানুষের ভোগান্তিরও অন্ত নেই। ব্যবহারের ফাঁকে নানাভাবে খোয়া যাচ্ছে অসংখ্য মোবাইল ফোন। প্রতিদিন কত মোবাইল খোয়া যায় তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান কারো কাছেই নেই, তা দেওয়াও সম্ভব নয়। তবে ৪টি মোবাইল কোম্পানীর প্রতিদিনের রিকানেকশান বা সিম রিপ্লেসমেন্টের হিসাব রীতিমতো চমকপ্রদ। এই কোম্পানীগুলো থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আড়াই হাজার গ্রাহক মোবাইলের রিকানেকশান নিচ্ছেন। এর দ্বিগুণসংখ্যক মোবাইল প্রতিদিন খোয়া যায়। মোবাইল কোম্পানীগুলোর সাথে যোগাযোগ করে জানা যায়, খোয়া যাওয়া মোবাইলের বেশিরভাগ গ্রাহকই ঝামেলা এড়াতে রিকানেকশান না করে নতুন প্যাকেজের মোবাইল কিনে নেন। বিশেষ করে মফস্বলের গ্রাহকরা। ঢাকায় বা জেলা শহরে এসে রিকানেকশানের খরচের চেয়ে নতুন সংযোগ নেয়া অনেক সহজ।
সাধারণত হারিয়ে যাওয়া, পকেটমার হয়ে যাওয়া, চুরি এবং ছিনতাই এই ৪টি উপায়ে মোবাইল ফোন খোয়া যাচ্ছে। তা ছাড়াও সিমকার্ড রিজেক্ট হলেও নতুন সিম সংগ্রহের প্রয়োজন পড়ে। তবে পকেটমার, চুরি ও ছিনতাই এই তিন পন্থায় সর্বাধিক মোবাইল খোয়া যায়। মোবাইল ফোন খোয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হন গ্রাহক। শুধু ক্ষতিই নয়, তার ঘাড়ে এসে চাপে খরচ ও ঝামেলার বিরাট বোঝা। মোবাইল খোয়া যাওয়ার সাথে সাথেই যেতে হয় থানায়। সেখানে পুলিশী ঝামেলার গণ্ডি পেরিয়ে জিডি করে সেই নম্বরটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়ার জন্য জিডির কপিসহ মোবাইল কোম্পানীকে অবহিত করতে হয়। লাইন অফ করা না হলে মোবাইলটি যার হস্তগত হয় তারতো পোয়াবারো। শুরু হয়ে যায় পাইকারি হারে কল করা। এতে গ্রাহকের ক্ষতির মাত্রা আরো বেড়ে যায়। মাস শেষে বিল দেয়ার হাত থেকেও আর নিস্তার নেই। এরপর শুরু হয় নতুন মোবাইল সেট ও সিমকার্ড সংগ্রহের যুদ্ধ। বর্তমান বাজারদর যাচাই করলে দেখা যায়, খোয়া যাওয়ার পর সেই নম্বরটি নতুন করে অ্যাকটিভ করতে হলে গ্রাহককে কমপক্ষে ব্যয় করতে হয় ৫ হাজার ৩৭৫ টাকা। ব্রেকআপে দেখা যায়, নতুন একটি মোবাইল ফোন সেটের দাম প্রায় ৪ হাজার ৫০' টাকা, থানায় জিডি করতে ঘুষ দিতে হয় ১শ' টাকা, নতুন সিমকার্ড তুলতে ব্যাংকে জমা দিতে হয় ৫৭৫ টাকা এবং থানায় ও মোবাইল কোম্পানিতে যাতায়াত খরচ কমপক্ষে ২শ' টাকা।
মোবাইল খোয়া গেলে গ্রাহকের ক্ষতিাতো হয়ই কিন্তু লাভবান হয় দুটি পক্ষ। একটি পক্ষ হলো যার হাতে মোবাইল সেটটি গেছে সে এবং অপরপক্ষ সংশ্লিষ্ট মোবাইল কোম্পানি। যতবার মোবাইল খোয়া যাবে কোম্পানি ততবার ৫৭৫ টাকা করে পাবে।
বর্তমানে গ্রামীণ ফোনের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। ঢাকায় গ্রামীণ ফোনের ২টি কাস্টমার সার্ভিস সেন্টার রয়েছে। একটি গুলশান এভিনিউতে ইনফো সেন্টার নামে পরিচালিত এবং অপরটি মতিঝিলে সেনাকল্যাণ ভবনের ২০ তলায় অবস্থিত। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিন এই দুটি সার্ভিস সেন্টারে কমপক্ষে ৫ হাজার গ্রাহকের সমাগম ঘটে। এদের একটি বড় অংশই আসেন সিমকার্ড রিপ্লেসমেন্টের জন্য। ইনফো সেন্টারে বিগত এক সপ্তাহের রেজিস্টার থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, প্রতিদিন নতুন সিমকার্ড সংগ্রহ করতে আসেন ৫ থেকে ৭শ' গ্রাহক। সেনাকল্যাণ ভবনের সার্ভিস সেন্টারে সর্বোচ্চ রেকর্ড ১ হাজার ৩৩টি।
একটেলের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। গুলশান দুই নম্বর গোল চত্বরের ল্যান্ডমার্ক টাওয়ারের দোতলায় রয়েছে একটেল মোবাইল কোম্পানির কাস্টমার সার্ভিস সেন্টার। সেখানেও গ্রাহকদের লাইন ধরে সিমকার্ড সংগ্রহ করতে দেখা যায়। তাদের হিসাবে গত এক সপ্তাহে একদিনে সর্বোচ্চ নতুন সিমকার্ড রিপ্লেস করতে এসেছেন ৩৮৮ জন গ্রাহক।
সেবা টেলিকমের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় দুই লাখ। গুলশান দুই নম্বর গোল চত্বরের ল্যান্ড বিউটি টাওয়ারের ৯মে তলায় সেবা টেলিকমের কাস্টমার সার্ভিস সেন্টার। সেখানেও অন্যান্য সমস্যার চেয়ে মোবাইল হারানোর গ্রাহকের সংখ্যাই বেশি। তাদের হিসাব মতে, গত এক সপ্তাহে সর্বমোট ১১শ' ৭২ জন গ্রাহক তাদের হারিয়ে যাওয়া মোবাইলের জন্য নতুন সিমকার্ড কিনতে এসেছেন।
সিটিসেলের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। মহাখালীর প্যাসিফিক সেন্টারে সিটিসেলের কাস্টমার সার্ভিস সেন্টারে মোবাইল রিপ্লেসমেন্টের জন্য আসা লোকের ভিড় তুলনামূলক কম। যেহেতু সিটিসেল মোবাইলে সিমকার্ড ব্যবহার হয় না সেহেতু অধিকাংশ গ্রাহকই মোবাইল সেট খোয়া গেলে নতুন সেট কিনে আগের লাইন সংযোগ দেয়ার পরিবর্তে নতুন করে সেটসহ লাইন নিয়ে নেন। তথাপিও প্যাসিফিক সেন্টারে প্রতিদিন লাইন রিপ্লেসমেন্টের জন্য গড়ে ২শ' জন করে আসছেন।
এ হিসাব থেকেই বোঝা যায় প্রতিদিন খোয়া যাওয়া মোবাইলের সংখ্যা কত।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








