
(শেষ কিস্তি)
রাজনীতিতে মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য জনগণের কল্যাণের মাধ্যমে দেশের সর্বাঙ্গীণ উন্নয়ন। অতীতে রাজনীতিতে আইনজীবীদের প্রাধান্য ছিল। বর্তমানে ব্যবসায়ীদের আধিক্য বেশি। একটি প্রবণতা লক্ষণীয়, একজন ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ রাজনীতিকে ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অবলোকন করে থাকেন।
আইন একটি মহান পেশা। একজন ব্যক্তির সম্পদ ও জীবন যখন বিপদাপন্ন হয়, তখন তিনি আইনজীবীর শরণাপন্ন হন। অতীতে আইনজীবীরা মক্কেলের সাথে কথাবার্তা বলে ও তার কাগজপত্র পরীক্ষা করে যদি দেখতেন মামলা দায়ের করলে প্রার্থিত প্রতিকারের পরিবর্তে অহেতুক কালক্ষেপণ হবে— তখন তারা মক্কেলকে মামলার কাগজপত্র ফেরত দিয়ে মামলা দায়ের করা থেকে নিবৃত্ত করতেন; কিন্তু বর্তমানে দেখা যায়, মামলা দায়েরের বস্তুনিষ্ঠ কারণ থাকুক বা না থাকুক, তা করিয়ে দিতে পারবেন— এ নিশ্চয়তায় মামলা গ্রহণ করছেন এবং দীর্ঘদিন মামলা চলার পর যখন প্রতিকার প্রদানে ব্যর্থ হন, তখন বলেন— ম্যাজিস্ট্রেট/জজ আইন বোঝেন না অথবা ম্যাজিস্ট্রেজ/জজ অন্যপক্ষ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মামলায় সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
আমাদের দেশে বিচারকদের অতি উচ্চ নৈতিকার মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয়। একজন বিপদগ্রস্ত মানুষের ধারণা অন্য সব স্থান থেকে ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বঞ্চিত হলেও বিচারালয় তাকে নিরাশ করবে না; কিন্তু বিগত দিনে ও বর্তমানে উচ্চাদালত ও নিম্ন আদালতে বিচারকদের আসনে এমন কিছু ব্যক্তির আগমন ঘটেছে, যারা নিরাশ হওয়ার বহু ঘটনার জন্ম দিয়েছেন।
সুশীলসমাজকে বলা হয় সমাজের জাগ্রত বিবেক। সমাজে মানুষের শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসে যা কিছু অন্তরায় হিসেবে দেখা দেয়, তার অবসানে পৃথিবীর সর্বত্র সুশীলসমাজ সোচ্চার ভূমিকা রেখে থাকে। উন্নত দেশের সুশীলসমাজ একটি অন্যায়কে কখনো দুই ধরনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না। এ ক্ষেত্রে আমাদের সুশীলসমাজের মধ্যে ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয়। আমাদের সুশীলসমাজ তিনটি ধারায় বিভক্ত। ডান, বাম এবং মধ্যমপন্থায় বিভক্ত। সুশীলসমাজের কেউ প্রত্যক্ষ, কেউ পরোক্ষভাবে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। উন্নত দেশের সুশীলসমাজ সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বলা চলে। আমাদের সুশীলসমাজ যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে যেকোনো জাতীয় সমস্যায় একপেশে বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত না থাকবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত জনগণের শ্যেন দৃষ্টি থেকে তারা নিজেদের মুক্ত রেখে মর্যাদাবান হিসেবে সমাজে অভিষিক্ত হতে পারবেন না।
একজন ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শেষে নবীনভাবে যখন চাকরিতে প্রবেশ করে, তখন তার মধ্যে নীতিবোধ ও নৈতিকতার উপস্থিতি দৃঢ়ভাবে পরিলক্ষিত হয়। নবীন চাকরিজীবী যখন দেখে তার চাহিদার তুলনায় বেতনভাতা অপ্রতুল; কিন্তু এর বিপরীত নীতিভ্রষ্ট হলে তার পক্ষে নিজের ও ভাইবোনসহ মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনের চাহিদা মেটানো সম্ভব, তখন সে দুর্নীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। একজন নবীন চাকরিজীবী একবার দুর্নীতির দিকে ঝুঁকে গেলে দিন দিন তার জীবনধারণের ব্যয় ও চাহিদা বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে তার পক্ষে দুর্নীতি থেকে বেরিয়ে আসা দুরূহ হয়ে দাঁড়াবে। তাই বেসামরিক বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রারম্ভিক বেতন এমন হওয়া উচিত, যাতে একজন নবীন চাকরিজীবী স্বকর্মে নিয়োজিত থেকে তার প্রাপ্য বেতনভাতা দিয়ে পরিমিতির মধ্যে অভাবমুক্ত জীবন-যাপন করতে পারেন। একজন ব্যক্তি যখন দুর্নীতি করে তখন মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে তাকে দুর্নীতির হাতেখড়ি নিতে হয়।
ব্রিটিশ ভারতে ও পাকিস্তান আমলে বিভিন্ন ক্যাডারের বেসামরিক কর্মকর্তারা চাকরিজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবপর্যায়ে যে বেতনভাতা পেতেন, তা দিয়ে সংসারের ব্যয় সুন্দরভাবে নির্বাহ করার পরও বেশ কিছু অবশিষ্ট থাকত। বর্তমানে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ সৎ ও ন্যায়পরায়ণ কর্মকর্তা চাকরির বেতন দিয়ে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতে পারেন না। তাদের কেউ কেউ পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করেন, কেউবা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা অথবা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে পাঠদান করে আবার কেউবা পরামর্শক হিসেবে কাজ করে কিছু বাড়তি আয় করে সংসারের ব্যয় নির্বাহের চেষ্টা করেন।
বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে শীর্ষ পদে কর্মরত কর্মকর্তাদের অবস্থা সে বিবেচনায় অনেক ভালো। তারা বিদেশ ভ্রমণ এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, করপোরেশন ও শিল্প-কারখানার পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থিত হয়ে প্রতি মাসে বেতনের বাইরে বিপুল অর্থ আয় করে থাকেন। অর্থের লোভ এদের এমনভাবে পেয়ে বসেছে যে, দেখা যায় অফিসে কাজ করার চেয়ে ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভায় যোগদানে অধিক আগ্রহী।
বিংশ শতাব্দীর শেষ দু’দশকে মানুষের জীবনধারণ প্রণালীতে দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। অতীতে মানুষ সামর্থ্য থাকলেও সাধারণ জীবন-যাপনকে বেশি পছন্দ করতেন। তখন গাড়ি, টিভি, ফ্রিজ, এয়ারকুলার প্রভৃতিকে বিলাসসামগ্রী হিসেবে গণ্য করা হতো এবং একজন ব্যক্তির সামর্থ্য থাকলেও এগুলো ক্রয় করার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখাতেন না।
বর্তমানে একজন সামর্থ্যবান ব্যক্তির কাছে গাড়ি, টিভি, ফ্রিজ, এয়ারকুলার প্রভৃতি মোটেও বিলাসসামগ্রী নয়; বরং এগুলো স্বাভাবিক সুন্দর ও সাবলীল জীবনযাপনে অনেকটা অপরিহার্য। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে— ‘হ্যাপিনেস কনসিস্ট ইন কনটেন্টমেন্ট’— এর অর্থ সুখ পরিতৃপ্তির মধ্যে নিহিত। সুখের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। একজন ব্যক্তিকে অল্প কিছুতেই পরিতৃপ্ত হতে দেখা যায়। আবার এমন অনেক ব্যক্তি আছেন যারা অনেক কিছু পেয়েও পরিতৃপ্ত নন। একজন ব্যক্তিকে সুখী হতে হলে তার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। সেই সাথে সৎপথে অর্জিত আয় নিয়ে অবশ্যই তাকে তুষ্ট থাকতে হবে। তুষ্টিতে ঘাটতি দেখা দিলেই কেবল মূল্যবোধের ওপর আঘাত আসার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
পেশা নির্বিভেদে একজন ব্যক্তির মাসিক আয় যদি তার যুক্তিসঙ্গত চাহিদা পূরণে সক্ষম হয়, সে ক্ষেত্রে তার পক্ষে নীতিভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ যা মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে সহায়ক হতে পারে। সবার মধ্যে বিশেষ করে সমাজে যাদের ইতিবাচক ভূমিকা আছে তাদের মধ্যে মূল্যবোধের অনুশীলন সমাজ থেকে যেকোনো ধরনের গ্লানি ও অন্যায় দূর করে সবার মধ্যে স্বস্তিরভাব ফিরিয়ে দিতে পারে।
লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
iktederahmed@yahoo.com







