
শাহেদ মতিউর রহমান
দেশব্যাপী বই পড়া কর্মসূচির পাইলট কার্যক্রম নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে সরকারি অর্থে বিপুলসংখ্যক বই কেনা হলেও কোনো প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি বা দরপত্র ছাড়াই বই নির্বাচন ও কেনার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন প্রকাশক। সূত্রমতে গত ৯ ও ১০ আগস্ট প্রাথমিক ও গণশিা মন্ত্রণালয় এবং শিা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিা বিভাগের সাথে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ‘দেশব্যাপী বই পড়া কর্মসূচির পাইলট কার্যক্রম ২০২৬’-এর একটি সমঝোতা স্মারক স্বারিত হয়। ছয় মাসব্যাপী এ পাইলটিং কার্যক্রমে অংশ নেবে দেশের দুই হাজার শিাপ্রতিষ্ঠানের শিার্থী। কার্যক্রমের আওতায় থাকবে দেশের ৫০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও এক হাজার ৫০০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এই প্রকল্পে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ানো হবে ২৫টি শিরোনামের বইÑ যার পরিমাণ এক লাখ ৮০ হাজার কপি। এসব বই বিভিন্ন সময়ে সরকারি উদ্যোগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে পড়ানো হয়েছে। তবে বইগুলোর যথাযথ সংখ্যক মুদ্রিত কপি না থাকায় তা পুনর্মুদ্রণ করা হয়েছে। বইগুলোর পুনর্মুদ্রণ করেছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’।
অভিযোগ উঠেছে, বইগুলোর বড় একটি অংশ নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা হয়েছে এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নিজস্ব প্রকাশনা থেকেও ২৯টি শিরোনামের বই নেয়া হয়েছে; অথচ অনেক প্রকাশক দাবি করেছেন এ বিষয়ে তারা কোনো বিজ্ঞপ্তি বা বই চাওয়ার তালিকা পাননি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাথে এ বিষয়ে কথা বলে জানা যায়, ছয় মাসব্যাপী এই প্রকল্পের সাকুল্য খরচ ধরা হয়েছে ছয় কোটি টাকা। এতে ৫০০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে বই পড়ানো হবে তার মুদ্রণ খরচ এক কোটি ২৬ লাখ টাকা। আর এক হাজার ৫০০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ানোর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮টি শিরোনোমের বই; যার পরিমাণ এক লাখ ৮০ হাজার কপি। এসব বইয়ের ক্রয় মূল্য দুই কোটি ৮৮ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির সাথে কথা বলে আরো জানা গেছে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত ৪৮টি বই কেনা হয়েছে দেশের মোট আটটি প্রকাশনা সংস্থা থেকে। একেকটি বই কেনা হয়েছে তিন হাজার ৭৫০ কপি করে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের (বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র) নিজস্ব প্রকাশনা থেকে কেনা হয়েছে ২৯টি শিরোনামের বই।
অবশ্য অন্য প্রকাশকরা প্রশ্ন তুলেছেনÑ বই নির্বাচন করেছে কারা, কী নীতিমালা বা মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে, কোনো বিশেষজ্ঞ কমিটি ছিল কি না এবং বই নির্বাচনের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কর্মকর্তারা অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এটি ছয় মাসের পাইলট প্রকল্প। দ্রুত বই নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল এবং কর্মসূচি সফল হলে ভবিষ্যতে বড় পরিসরে সারা দেশের বিদ্যালয়ে এটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মকর্তাদের দাবি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নিয়মিত ‘দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রমের’ আওতায় ইতোমধ্যে এক হাজার ৩০০টির বেশি স্কুলে বই পড়ানো হচ্ছে। সেই কার্যক্রমের তালিকা থেকেই ৪৮টি বই নির্বাচন করা হয়েছে।
তবে প্রকাশকদের অভিযোগ, সরকারি অর্থ ব্যয়ের েেত্র বই নির্বাচন ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় আরো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। পাইলট প্রকল্প হলেও বিজ্ঞপ্তি ছাড়া বিপুল অর্থের বই কেনার সিদ্ধান্ত কেন নেয়া হলোÑ এ প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো মেলেনি। সরকারি অর্থায়নে বিপুলসংখ্যক বই বিজ্ঞপ্তি ছাড়া কেনার বিষয়টিতে ােভ প্রকাশ করেছেন দেশের স্বনামখ্যাত সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশকরা। এ ছাড়াও দরপত্রবিহীন বই কেনার তালিকায় স্থান দেয়া হয়েছে ফ্যাসিস্ট আমলে সুবিধাপ্রাপ্ত প্রকাশকের বইকে। সূচীপত্র প্রকাশনীর প্রকাশক সাঈদ বারী এ প্রসঙ্গে বলেন, এই কর্মসূচির জন্য বই বাছাইয়ের দায়িত্বে কারা ছিলেন? কোন নীতিমালা আর কী কী নির্দিষ্ট মানদণ্ড মেনে বইগুলো নির্বাচন করা হয়েছে? তালিকায় থাকা প্রতিটি বইয়ের লেখক ও প্রকাশক কারা? বই বাছাইয়ের জন্য কিÑ মানে বই বাছাইয়ের জন্য কি কোনো কমিটি বা বিশেষজ্ঞ প্যানেল করা হয়েছিল? হয়ে থাকলে সেখানে কারা ছিলেন? তাদের যোগ্যতা কী ছিল? তাদের দায়িত্ব কী ছিল? সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়াটাই বা কেমন ছিল? এ বিষয়ে তার মতো অনেক প্রকাশকেরই ােভ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে দিব্য প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবের বলেছেন, আমার প্রকাশনা থেকে বই ক্রয় করা হয়নি। যদিও নেয়ার মতো অনেক বই আছে। তালিকাও চাওয়া হয়নি।
সময় প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ রকম কোনো প্রজেক্টে আমার প্রকাশনা থেকে কোনো বই কেনা হয়নি। আমি এ রকম কোনো বিজ্ঞপ্তি দেখিনি। দেশব্যাপী কোনো কর্মসূচি হলে তো তার একটি প্রচার থাকে। কোনো প্রচার বা বিজ্ঞপ্তি আমার চোখে পড়েনি। কলি প্রকাশনার প্রকাশক এস এম মহির উদ্দিন কলি জানিয়েছেন, এই প্রকল্পে শুধু প্রকাশকরা তিগ্রস্ত হননি, একই সাথে বাংলাদেশের লেখকরাও বঞ্চিত হয়েছেন। কেননা তালিকায় ভারতীয় লেখকদের বইও রয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক খোন্দকার মো: আসাদুজ্জামান অবশ্য তার যুক্তি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, এটি ছয় মাসের একটি পাইলট কার্যক্রম। সরকারের প থেকে দ্রুত বই নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। এ মুহূর্তে আলাদা করে বই নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করবে না সরকার। এটি জাস্ট পাইলট প্রকল্প। উদ্দেশ্য হচ্ছে এই কর্মসূচি সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা দেখে পরে বৃহৎ আকারে দীর্ঘমেয়াদের কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয়া। তখন সারা দেশের সব স্কুলে এ প্রকল্প পরিচালিত হবে। এখন মূলত দু’টি মন্ত্রণালয়ের প থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সারা দেশে হলে তখন সরকারের প থেকে বই সংগ্রহ করা হবে।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের যুগ্ম পরিচালক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ সহযোগী একটি দৈনিক পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একটি নিয়মিত কর্মসূচি আছে। যার নাম ‘দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রম’। এই প্রোগ্রামে এক হাজার ৩০০টির বেশি স্কুলে ৯৬টি শিরোনামের বই পড়ানো হয়। তাই ওই চলমান প্রোগ্রাম থেকে ৪৮টি বই সরকারের প থেকে নির্বাচন করা হয়েছে।
প্রকাশকদের প থেকে উত্থাপিত অভিযোগ ফ্যাসিস্ট আমলে সুবিধাপ্রাপ্ত প্রকাশকদের বই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত প্রসঙ্গে মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ দাবি করেন, একজন প্রকাশক তার ব্যক্তিগত কারণে বা পার্সোনাল চয়েস বা কোন মতাদর্শে বিশ্বাসী, সেটা আমাদের পে নির্ধারণ করা কঠিন। তিনি আরো বলেন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বই নির্বাচন করে, প্রকাশক নির্বাচন করে না। বইটা প্রোগ্রামের জন্য যথাযথ কি না, সেটা দেখা হয়, বইটি প্রকাশ করেছেন কে বা কোন ব্যক্তি, তার ব্যক্তিগত চরিত্র কী, তার রাজনৈতিক বিশ্বাস কী, এগুলো তো জানা সম্ভব হয় না। এই যে ভারতীয় লেখকের বইয়ের (অশোক কুমার মুখোপাধ্যায়ের লেখা সূর্য সেন) কথা বলা হচ্ছে, এসব বই তো পড়ানো হচ্ছে ২৫ বছর ধরেই।
এ বিষয়ে জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন অনুবিভাগ) ড. সরদার মো: কেরামত আলীকে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল ও খুদেবার্তা দিলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি বা ফোন ব্যাকও করেননি।







