গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

প্রায় প্রতিদিনই ফার্মগেটের একটি কলেজ এলাকা থেকে সরকারি হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করতে শ্যামলীর দিকে যান নুসরাত বিনতে আজিজ। তার ভাষ্য, ফুটপাথ থেকে হকার উচ্ছেদের পর কোনো ভোগান্তি ছাড়াই এখন নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারছেন। পারুল বেগম নামের এক নারী বলেন, ফুটপাথের হকারদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে ভয়ে বাসা থেকে বের হতেই মন চাইত না। নুসরাত ও পারুল বেগমের কথায় ফুটপাথ হকারমুক্ত হওয়ায় পথচারী থেকে শুরু করে যানবাহন-সব জায়গায় স্বস্তি ফিরেছে। তবে সাম্প্রতিক এই হকার উচ্ছেদের নেপথ্যে রয়েছে অন্য এক নাশকতা-অস্থিরতার ভয়ঙ্কর ছক।  

Advertisement

সম্প্রতি রাজধানীর ফুটপাথে অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে একের পর এক সংঘর্ষ কেবল নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্কট নয়। গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হকারের ছদ্মবেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ফুটপাথ ও সড়ককে ব্যবহার করে ডিসেম্বরকে সামনে রেখে একটা অস্থিরতা তৈরির ছক কষছে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে হকারদের সাথে কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকদের একাংশ সংগঠিতভাবে জড়ো হয়। 

সম্প্রতি করা গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসে আগামী ডিসেম্বরকে টার্গেট করে চলতি মাসের শেষে বা নভেম্বর মাসজুড়ে রাজধানীতে নানা ধরনের অস্থিরতা ও নাশকতার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য হকারের ছদ্মবেশে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চলছে। গোয়েন্দাদের এমন তথ্যের ভিত্তিতেই সরকার রাজধানীর ফুটপাথ হকার মুক্ত করার মিশনে নেমেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিসেম্বর মাসে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার যে ঘোষণা দিয়েছেন সেই ঘোষণার পর নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা গ্রাম থেকে ঢাকায় অবস্থান নিতে শুরু করে ছদ্মবেশে। যার একটি অংশ হলো হকারের ছদ্মবেশে রাজধানীতে সক্রিয় থাকা। আরেকটি হলো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের ঘিরে। 

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সরকার এরই মধ্যে ফুটপাথ থেকে হকার সরানোর কাজ শুরু করেছে। তবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার তথ্য সংগ্রহ এখনো শেষ হয়নি। তদন্ত শেষে গোয়েন্দা রিপোর্ট পেশ করার পর সরকার এই বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে মোকাবেলা করবে। ওই সূত্র জানায়, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বেশির ভাগই একটি মহল পরিচালনা করছে। ওই মহলের সাথে কারা সক্রিয় সেই তথ্য উদ্ধারেও গোয়েন্দারা মাঠে কাজ করছে।  

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ : গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে মিরপুর-১০ নম্বরের হোপ মার্কেট এলাকায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ফুটপাথ উচ্ছেদ অভিযানে গেলে হকাররা বিক্ষোভ শুরু করে। সংঘর্ষে তিনটি গাড়িতে আগুন ধরানো হয়। মিরপুর-১০ থেকে ১৪ নম্বর পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। সে সময় রাস্তায় লাঠি হাতে হকারদের দেখা যায় এবং পুলিশ এলাকা ঘিরে রাখে। ওই দিন দুপুরে মিরপুর থানার ওসি হাফিজুর রহমান জানান, পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ঘটনার পর ডিএনসিসি প্রশাসক মো: শফিকুল ইসলাম খান উচ্ছেদ অভিযান চলমান থাকবে বলে ঘোষণা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, ‘ফ্যাসিবাদের দোসররা’ হামলা চালাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, যেখানেই ফুটপাথ দখল হবে সেখানেই অভিযান চলবে এবং ফার্মগেটসহ অন্যান্য এলাকায়ও পর্যায়ক্রমে অভিযান চালানো হবে।

মিরপুর এলাকার সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ফেসবুকে উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তার বক্তব্য, আগে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করে তারপর এমন সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত এবং ভবিষ্যতে সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। 

এর দু’দিন  আগে, ২৮ সেপ্টেম্বর সাভারের আশুলিয়ায় ডিইপিজেড এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে আনসার সদস্যরা বাধার মুখে পড়েন। সেখানে আনসার ও হকারদের মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং হকাররা নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক অবরোধ করেন। গত বছরের ডিসেম্বরে মিরপুর-১ নম্বরে উচ্ছেদ চলাকালে হকারদের হামলায় ডিএনসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আহত হন এবং ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। সে সময় আহতের সংখ্যা ছিল ছয়। 

একই এলাকায় বারবার উত্তেজনা : এ বছরের ৫ মে সরকার ‘ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬’ জারি করে। পরে এই নীতিমালার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট হলে আদালত রুল জারি করেন। অর্থাৎ হকার পুনর্বাসনের আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো এখনো অনিশ্চিত। অন্যদিকে ৩০ আগস্ট মিরপুর ট্রাফিক বিভাগ অবৈধ রিকশা চার্জিংয়ের ৫০০টি পয়েন্ট বিচ্ছিন্ন করে। এতে ব্যাটারিচালিত যান চালকদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের মে মাসেও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধের ঘোষণার প্রতিবাদে মিরপুর-১০ নম্বরে লাঠিসোটা হাতে চালক ও ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ করেছিলেন।

ছদ্মবেশে সংগঠিত উপস্থিতি : গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, উচ্ছেদ অভিযানের দিনগুলোতে হকারদের জমায়েতে এমন কিছু ব্যক্তির উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে যারা পেশাগতভাবে হকার নন। তাদের একটি অংশ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ফুটপাথের দোকানকে আশ্রয় ও আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে তারা সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছেন এবং অভিযানের সময় উসকানি ও সহিংসতায় ভূমিকা রাখছেন। এ ছাড়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকদের একাংশ এই জমায়েতে যুক্ত হচ্ছে, যা কোনো নির্দিষ্ট স্থানে দ্রুত লোক জড়ো করার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে বলে আশঙ্কা গোয়েন্দাদের। 

মিরপুর-১০ এ সংঘর্ষের ঘটনার সময় রাজধানীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৪০ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। তবে এই গ্রেফতারের সাথে উচ্ছেদ-সংঘর্ষের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি পুলিশের পক্ষ থেকে। 

ডিসেম্বর কেন গুরুত্বপূর্ণ : নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক দিনপঞ্জিতে ডিসেম্বর মাস স্পর্শকাতর সময়। এ সময়কে কেন্দ্র করে নাশকতা, সড়ক অবরোধ ও জনজীবন অচল করার চেষ্টা হতে পারে। হকার ও পরিবহন শ্রমিকদের অসন্তোষকে কাজে লাগানো গেলে সহজেই বড় জমায়েত তৈরি করা যায়, কারণ তারা জীবিকার ঝুঁকিতে আছেন এবং ঘনবসতি এলাকায় সক্রিয়। 

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে উচ্ছেদ-পুনর্দখলের চক্রটি সবসময় সক্রিয়। অভিযানের পর ফুটপাথ অল্প সময় ফাঁকা থাকলেও দ্রুত আবার দখল হয়ে যায়। চাঁদাবাজ চক্র না ভাঙলে এই চক্র থামবে না, এমন মতও এসেছে। 

সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার আগে বিকল্প পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, হকারদের প্রকৃত তালিকা তৈরি করা, ফুটপাথ থেকে চাঁদা আদায়কারী চক্র শনাক্ত করা এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা জরুরি। একই সাথে প্রকৃত দরিদ্র হকারকে সন্দেহের তালিকায় ফেলার ঝুঁকিও এড়াতে হবে, নইলে জীবিকাহারা মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে অস্থির শক্তির হাতে ঠেলে দেয়ার আশঙ্কা থাকে।