সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে ফের পতন সূচকের

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
এক দিন ভালো কাটার পর ফের পতন ঘটল পুঁজিবাজার সূচকের। গতকাল বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সবগুলো সূচকের কমবেশি পতন ঘটে। তবে বিপরিত চিত্র দেখা গেছে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) । এখানে সবগুলো সূচকেরই উন্নতি ঘটে। তবে উভয় বাজারেই হ্রাস পেয়েছে লেনদেন। 
ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনের শুরুটা ছিল বেশ ভালো। প্রথম আধঘণ্টায় ডিএসইর প্রধান সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় প্রায় ৩৫ পয়েন্ট। পাঁচ হাজার ৫৯৬ দশমিক ২১ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা করা সূচকটি সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৬৩১ দশেিমক ৫৯ পয়েন্টে। এখান থেকেই বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে বাজারটি। শুরুতেই বিক্রয়চাপের মুখে পড়ায় বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থান নিলে দিনের বাকি সময় বাজার আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। দিনশেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৭ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট হারায়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৫৫ ও ৩ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট। 
অপর দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই এ দিন ৪১ দশমিক ৫০ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ১৪ হাজার ৮৭০ দশমিক ৬৮ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা করা সূচকটি বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে স্থির হয় ১৪ হাজার ৯১২ দশমিক  ১৮ পয়েন্টে। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৪২ দশমিক ২৪ ও ১৭ দশমিক ৮৯ পয়েন্টে। 
সূচকের আচরণ দুই বাজারে দুই রকম হলেও গতকাল উভয় বাজারেই লেনদেনের অবনতি ঘটে। ঢাকা স্টক গতকাল ৭৫৬ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করেছে যা আগের দিনের চাইতে ৮৮ কোটি টাকা কম। গত বুধবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৮৪৪ কোটি টাকা। লেনদেন শুরুর আধঘণ্টার মাথায় বিক্রয়চাপ তৈরি হলে গতি হারায় বাজারটি। দিনের বাকি সময়টিতে সূচকের আচরণ না পাল্টালে আর গতি ফেরেনি বাজারে। আবার সূচকের উন্নতি সত্ত্বেও লেনদেনের অবনতি ঘটে সিএসইর। এখানে ১৬ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়। বুধবার সিএসইর লেনদেন ছিল ২৪ কোটি টাকা।  
এ দিকে বুধবার দুই পুঁজিবাজার সূচকের বড় ধরনের উন্নতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা উচ্ছ্বাস তৈরি করলেও তাতে ভাটা পড়ে গতকাল। ঢাকা শেয়ারবাজারে দিনের শুরুটা ভালো হলেও পরবর্তিতে টানা বিক্রয়চাপের ফলে বিনিয়োগকারীরা হাত গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। কয়েকটি ব্রোকার হাউজে বিনিয়োগকারিদের সাথে বাজার আচরণ নিয়ে জানতে চাইলে তারা নয়া দিগন্তকে এ হতাশার কথা জানান। নয়া দিগন্তকে তারা বলেন, ডিএসই কর্তক বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি বাজার উন্নয়নে যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা বাজার নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছেন। তাই তাদের প্রত্যাশা ছিল কয়েকদিন ভালো আচরণ করবে বাজার। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা না যেতেই আবার নতুন করে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হওয়ায় তারা হতাশ। 
তবে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে কিছুটা বিক্রয়চাপ তৈরি হতেই পারে। তা ছাড়া বুধবার বেশ কিছু কোম্পানি সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ দরে লেনদেন হয়েছে। গতকাল এসব কোম্পানিতে সংশোধন ঘটে। তা ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলো সপ্তাহের শেষদিকে বড় বিনিয়োগে যেতে চায় না। এ সময় তারা বিক্রয় মুডেই থাকেন। তবে তারা আশাবাদি আগামী সপ্তাহে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে বাজার। তবে এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের ভূমিকাই হবে মুখ্য। কারণ যেকোনো পরিস্থিতিতে বিক্রয়চাপটি আসে বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকেই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো বিনিয়োগকারি বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো কোনো শেয়ারে ভালো মুনাফা তুলে নেয়ার সুযোগ পেয়ে শেয়ার বিক্রি করছেন। এ ক্ষেত্রে একই শেয়ারধারীরা যদি ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি সামাল দেন তা হলে বিক্রয়চাপ প্রলম্বিত হয় না। কিন্তু তা না করে যদি আতঙ্কে নিজের লোকসানে থাকা শেয়ার বিক্রয় করে দেন তাহলে তা বিক্রয়চাপকে প্রলম্বিত করে। 
ঢাকায় গতকাল ১২টি খাতের মধ্যে পাঁচটি ভালো পারফর্ম করলেও সাতটিতে ছিল নেতিবাচক আচরণ। দিনের শুরুতে মিউচুয়াল ফান্ডের আচরণ নেতিবাচক থাকলেও শেষদিকে তা সামলে নেয় খাতটি। দিনের সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে খাতটির। এর পরই ছিল বীমা খাত। এ খাতটিতে মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৩ শতাংশ। এ ছাড়া ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ৩ শতাংশ, ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে দশমিক ৩৫ শতাংশ ও জ্বালানি খাতে দশমিক ১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। 
অপর দিকে এ দিন সর্বোচ্চ ১ দশমিক ১৬ শতাংশ দরপতনের শিকার ছিল আইটি খাত। অন্য খাতগুলোর মধ্যে খাদ্য ও আনুসঙ্গিক ১ দশমিক ৫ শতাংশ, টেক্সটাইলস ১ দশমিক ২ শতাংশ প্রকৌশল দশমিক ৮৯ শতাংশ, ব্যাংক দশমিক ৬২ শতাংশ, সেবা ও আবাসন খাত দশমিক ৫৯ শতাংশ ও বিবিধ খাতে দশমিক ৪৩ শতাংশ দরপতন ঘটে। তবে কোনো খাতেই গতকাল বড় ধরনের দরপতনের ঘটনা ঘটেনি। 
গতকাল ঢাকায় লেনদেনের শীর্ষে উঠে এসেছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি ফাইন্যান্স। ২৩ কোটি ৬১ লাখ টাকায় ৬৮ লাখ ৬৫ হাজার শেয়াপর হাতবদল হয়েছে গতকাল। ২১ কোটি ২১ লাখ টাকায় তিন লাখ ৩৫ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল জিকিউ বলপেন ইন্ডাস্ট্রিজ। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, এনভয় টেক্সটাইলস, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, মার্কেন্টাইল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স, ব্র্যাক ব্যাংক, সায়হাম টেক্সটাইলস, সেনা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ও ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস। 
ঢাকা শেয়ারবাজারে  গতকাল মোট ৩৮৮টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের লেনদেন নিষ্পত্তি হয়। এদের মধ্যে ১৫৫টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ১৮৫টি। অপরিবর্তিত ছিল ৪৪টির দর। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ১৮৭টি কোম্পানি ও ফান্ডের মধ্যে ৮৬টির দাম বাড়ে, ৭১টির কমে এবং ৩০টির দর অপরিবর্তিত থাকে।